এটাকে হ্রদের পানিতে প্রায় ছুঁড়েই দিয়েছিলাম। এখন আমি জানি কিছু একটা এটা নিতে অপেক্ষা করছে। পানির তলে দানবীয় ঘূর্ণী দেখার কথা মনে পড়ে গেল ওর। সেটা কুমীর বা মাছ যাই হয়ে থাকুক, বাস্তবে ওটা তারই আরেকটা প্রকাশ। মনে হচ্ছে, তুচ্ছ কণিকায় অনেক গুরুত্ব দিয়েছে সে। আমিও সমান গুরুত্বই দেব।
মাদুলির লকেটের ঢাকনা খুলে লস্ত্রিসের দুই জীবনের চুলের গোছোর পাশে রেখে দিল ও রুবি পাথরটা। এখন অনেক বেশি শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী মনে হলো নিজেকে। এখন ওর বিরুদ্ধে নামবার জন্যে অনেক ভালোভাবে অস্ত্রে সজ্জিত হতে পেরেছি আমি।
*
সকালে ওর সাহস ও সিদ্ধান্ত অটল রইল। ওরা নাশতা সারার পরপরই হান্নাহ হাজির হলো মেরেনের নতুন চোখ পরখ করতে। ভুরুর রঙ আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে, আসলটার সাথে মিলে গেছে প্রায়। হান্নাহর আঙুল একপাশ থেকে অন্য পাশে বা উপর নিচে নড়ানোর সময় দৃষ্টি স্থির করার সময় দুটো চোখেই নড়াচড়াটা ধরতে পারল মেরেন।
সে চলে যাওয়ার পর ধনুক আর এম্বস করা চামড়ার তুন তুলে নিল মেরেন। তারপর হ্রদের পাশে খোলা মাঠে চলে এলো। একটা নিশানা স্থির করে দিল তাইতা, একটা ছোট খুঁটির উপর একটা রঙ করা চাকতি; তারপর ধনুকের জন্যে মেরেন নতুন তীর বাছার সময় ওর পাশে দাঁড়িয়ে রইল। সামঞ্জস্য আর ভারসাম্য পরখ করার জন্যে দুই হাতের মাঝখানে নিয়ে ঘোরাল ওটাকে।
তৈরি! বলে উঠল ও। নিশানা স্থির করল। ছিলা টেনে ধরে ছেড়ে দিল। শূন্যে ওড়ার পথে হ্রদ থেকে ধেয়ে আসা বাতাসে বেশ খানিকটা বেঁকে গেলেও লক্ষ্যবস্তুর মাঝখান থেকে মাত্র বুড়ো আঙুলের সমান দূরে গিয়ে আঘাত করল ওটা।
বাতাসের কথা মাথায় রেখো, বলে উঠল তাইতা। নেফার সেতির সাথে লালপথে চলাচলের সময় থেকেই এই তরুণকে তীর চালনা শিক্ষা দিয়েছে ও। মাথা দুলিয়ে সায় দিল মেরেন। তারপর দ্বিতীয় তীরটা টেনে ছেড়ে দিল। এটা ঠিক জায়গামতো বিধল।
পেছন ফেরো, নির্দেশ দিল তাইতা। নির্দেশ পালন করল মেরেন। লক্ষ্যবস্তু বিশ কদম কাছে নিয়ে এলো তাইতা। এবার সামনে ফিরে সাথে সাথে তীর ঘেঁড়ো।
বিশালদেহী মানুষ হিসাবে পায়ের উপর হালকা চালে ঘুরে ওর নির্দেশ পালন করল মেরেন। চোখ অন্ধ থাকার সময় খোয়ানো ভারসাম্য আর স্থিরতা আবার ফিরে পেয়েছে ও। হাওয়ার টানে খানিকটা বেঁকে গেল তীরটা, কিন্তু লক্ষ্য স্থির করার সময়ে সেটা মাথায় রেখেছিল ও। ওর ওঠানোটা ছিল নিখুঁত। ফের তীরটা গিয়ে ঠিক জায়গামতো বিধল। আস্তে আস্তে লক্ষ্যবস্তুকে দুই শো কদম দূরে সরিয়ে নিয়ে গেল তাইতা। এমনকি এই দূরত্বেও চারটে তীরের মধ্যে তিনটাই একজন মানুষের চোখের সমান এলাকায় বিদ্ধ করতে সক্ষম হলো মেরেন। পরিচারকদের নিয়ে আসা মামুলি খাবার খেতে যখন বিরতি দিল, তাই বলল, আজকের মতো যথেষ্ট হয়েছে। হাত আর চোখকে এবার বিশ্রাম নিতে দাও। একটা ব্যাপার দেখতে হবে আমাকে।
ছড়ি তুলে নিল ও, লস্ত্রিসের মাদুলিটা চেইনের মাথায় গলায় ঝুলছে নিশ্চিত হয়ে তারপর দ্রুত পায়ে বাগানের গেটের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল। আগের পদক্ষেপ অনুসরণ করে শয়তানের গুহার দিকে এগোল ও। যতই কাছাকাছি হচ্ছে, আগ্রহের অনুভূতি ততই তীক্ষ্ণ হয়ে উঠতে লাগল। অনুভূতিগুলো এতটাই অপ্রত্যাশিত যে তাইতা বুঝতে পারছে, বাইরের প্রভাবের কারণে দেখা দিচ্ছে। এত তাড়াতাড়ি গুহায় পৌঁছে গেছে দেখে অবাক মানল ও। এই বিস্ময় বাগানে ওটাকে ওর কাছ থেকে গোপন রাখা হবে, ভেবেছিল ও। কিন্তু শেষ বার যেভাবে রেখে গিয়েছিল তেমনই আছে সব।
ঘেসো তীরে বসে পড়ল ও, তারপর অপেক্ষা করতে লাগল, জানে না কীসের জন্যে। সবকিছু শান্ত, স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। একটা সোনালি সানবার্ডের কাকলি শুনতে পেল ও। চোখ তুলে দেখল একটা লক্তলাল ফুলের চারপাশে উড়ে বেড়াচ্ছে ওটা, মধু টেনে নিতে খুব হিসাব করে দীর্ঘ বাঁকা ঠোঁটটা পাঁপড়ির পাত্রে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। তারপরই রোদের ঝলকের মতো সাঁই করে উধাও হয়ে গেল ওটা। নিজেকে স্থির করে অপেক্ষা করতে লাগল তাইতা, ওর দিকে যাই এগিয়ে আসুক না কেন তার মোকাবিলা করতে সব শক্তি এক করছে।
একটা নিয়মিত টিপটিপ আওয়াজ শুনতে পেল ও, পরিচিত শব্দ, যদিও চট করে চিনে উঠতে পারল না। পেছনের রাস্তা থেকে আসছে ওটা। সেদিকে তাকাল ও। আওয়াজটা থেমে গেল, কিন্তু অল্প সময় বাদেই ফের শুরু হলো।
লম্বা একটা ছড়ি হাতে দীর্ঘ, কুঁজো একটা অবয়ব এগিয়ে আসছে রাস্তা ধরে। পাথুরে পথের উপর ওটার শব্দই শুনতে পাচ্ছিল তাইতা। লোকটার মুখে দীর্ঘ রূপালি দাড়ি, কিন্তু কুঁজো ও প্রবীন হলেও অনেক কম বয়সী তরুণের মতো ক্ষিপ্রতার সাথে চলাফেরা করছে। পুকুরের কিনারে চুপচাপ বসে থাকা তাইতাকে লক্ষ করেছে বলে মনে হলো না, পথ ধরে হ্রদের উল্টোদিকে চলে গেল। দূর প্রান্তে যাবার পর বসল। কেবল তখনই চোখ তুলে তাইতার দিকে সরাসরি তাকাল সে। নীরবে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। মুখ থকে সব রক্ত সরে যাচ্ছে বলে মনে হলো, লস্ত্রিসের মাদুলিটা আঁকড়ে ধরল ও। বিস্ময়ে বাকহারা হয়ে গেছে। পরস্পরের চোখের গভীরে দৃষ্টি দিল দুজন। দুজনই তার হুবহু যমজ চেহারা দেখতে পেল সামনে।
কে তুমি? অবশেষে ফিসফিস করে জানতে চাইল তাইতা।
