তুমি জিতেছ, ভাবল ও। শুরুর আগেই অবসান ঘটেছে লড়াইয়ের। তোমার কাছে আত্মসমর্পণ করছি আমি। এবার তার প্রভাব বদলে যাচ্ছে, টের পেল ও। এখন আর তাকে সম্পূর্ণ অশুভ ও বৈরী মনে হচ্ছে না, বরং দয়াময়, উদার ঠেকছে। ওর মনে হলো ওকে বেদনা আর অবেগসঞ্জাত যুদ্ধ থেকে মুক্তি দিতে চাইছে সে। ইচ্ছা করল বাগানে গিয়ে তার কাছে আত্মসমর্পণ করতে, নিজেকে তার করুণায় সমর্পণ করতে। অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়াল ও, নিজের কাজ আর ভাবনার অসামঞ্জস্যতায় অবাক মানল। পিঠ সোজা করে চিবুক ওঠাল। উঁহু! জোরে ফিসফিস করল ও। এটা আত্মসমর্পণ নয়। এখনও যুদ্ধে জেতেনি তুমি। মাত্র প্রথম আঘাত দিয়েছ। লস্ত্রিসের মাদুলির দিকে হাত বাড়াল ও, নিজের ভেতর শক্তির প্রবাহ টের পেল। মেরেনের চোখ নিয়েছে সে। আমার পুরুষাঙ্গ নিয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে সমস্ত সুবিধা রয়েছে তার হাতে। শুধু যদি তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করার মতো তার কোনও কিছু হাতে পেতাম, তার হামলার পাল্টা আক্রমণ শানাতে একটা অস্ত্র। তেমন কিছু পেলেই আবার তার বিরুদ্ধে নামব। রঙিন ক্লিফের নিচে বাগানের আকাশছোঁয়া ফুল গাছগুলোর দিকে তাকাল। নিজেকে সামলে নেওয়ার আগেই সেদিকে পা বাড়াল। অনেক চেষ্টায় সরে এলো ও। এখনই নয়। আমি তৈরি নই।
স্যানেটোরিয়ামে ফেরার সময় দৃঢ় হয়ে উঠল ওর পদক্ষেপ। দেখল মেরেনকে অন্ধকার সেল থেকে ওদের আগের অনেক প্রশস্ত ও আরামদায়ক কামরায় নিয়ে গেছে হান্নাহ। তাই ঘরে পা রাখতেই লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল মেরেন, ওর টিউনিকের হাতা আঁকড়ে ধরল। মহিলার খুলে দেওয়া একটা হিরোয়েগ্লাফিকের গোটা স্ক্রোল পড়েছি, নিজের সাম্প্রতিক সাফল্যে গর্বে ফেটে পড়ে বলল সে। কাল চিরকালের মতো ব্যান্ডেজ খুলে ফেলবে সে। তখন এটার রঙ অন্যটার মিলে গেছে আর কত নিপূণভাবে নড়াচড়া করে সেটা দেখিয়ে আপনাকে তাক লাগিয়ে দেব। আইসিসের মিষ্টি নিঃশ্বাসের দোহাই, শিগগিরই বরাবরের মতো তীরের গতি আন্দাজ করতে পারার ঘোষণা করছি। ওর বাঁচালতা উত্তেজনারই নিশ্চিত লক্ষণ। তারপর এই নারকীয় জায়গা থেকে পালাব আমরা। জায়গাটা আমি ঘৃণা করি। এখানে বাজে, বিতৃষ্ণা জাগানোর মতো একটা কিছু আছে। লোকজনও তাই।
কিন্তু ওরা তোমার কত উপকার করেছে ভেবে দেখ, যুক্তি দেখাল তাই।
কিছুটা হতচকিত দেখাল মেরেনকে। বেশির ভাগ কৃতিত্ব আমি আপনাকেই দিই, ম্যাগাস। আপনিই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন, এই বিপদে আমাকে সাহায্য করেছেন।
সেরাতে নিজের মাদুরে লম্বা হয়ে শুয়ে ছোট শিশুর মতো ঘুমে ঢলে পড়ল মেরেন। ওর নাক ডাকার শব্দ আনন্দময় ও বেপরোয়া। দশকের পর দশক তাই তাতে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে যে ওর কাছে একে ঘুমপাড়ানি গানের মতো লাগে।
চোখ বন্ধ করল ও, সাথে সাথে ওর মনে বপন করে দেওয়া নারকীয় শয়তানের স্বপ্নগুলো ফিরে আসতে লাগল। নিজেকে সচেতনতার স্তরে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করল ও। কিন্তু স্বপ্নগুলো বড়ই জোরাল। মুক্ত হতে পারল না। উষ্ণ নারীদেহের সৌরভ অনুভব করতে পারছে। ওর শরীরের সাথে মিলে যাওয়া রেশমী স্ফীতি আর গহ্বরগুলো টের পাচ্ছে। নিমন্ত্রণের মিষ্টি কণ্ঠস্বর কানে আসছে। দুষ্টু আঙুলের ছোঁয়া টের পাচ্ছে। উত্তপ্ত মিষ্টি মুখ গ্রাস করে নিচ্ছে। ওর হারানো অঙ্গে অসম্ভব শিহরণ কাড়াকাড়ার মতো বেড়ে উঠল। শেষ সীমায় পৌঁছে গেল। তারপর মিলিয়ে গেল। ওগুলোর প্রত্যাবর্তন চাইল ও। ওর গোটা শরীর নিস্তার পেতে চাইছে। কিন্তু ওর নাগালের বাইরে রয়ে গেল তা, ওকে পীড়ন ও ক্ষতবিক্ষত করে চলল।
আমাকে ছাড়ো! প্রবল প্রয়াসে নিজেকে মুক্ত করে আনল ও। জেগে উঠে দেখল ঘামে ভিজে গেছে। কানের কাছে তপ্ত আওয়াজ তুলছে শ্বাসপ্রশ্বাস।
উল্টোদিকের দেয়ালের জানালা গলে চাঁদের এক চিলতে আলো ঢুকে পড়েছে ঘরে। কম্পিত শরীরে উঠে দাঁড়াল ও। পানির জগের কাছে এসে ঢকঢক করে পানি খেল। এমন সময় নিজের বেল্ট আর পাউচের দিকে নজর গেল ওর, ঘুমোনোর প্রস্তুতি নেওয়ার সময় যেখানে রেখেছিল সেখানেই পড়ে আছে। চাঁদের আলো সরাসরি পাউচের উপর এসে পড়ছে। যেন বাইরের কোনও প্রভাব ওকে ওটার দিকে তাকাতে বাধ্য করছে। তুলে বাঁধন আলগা করল ও। ভেতরে হাত ঢুকিয়ে জীবন্ত উষ্ণ একটা কিছু স্পর্শ করল। ওর আঙুলের ডগার নিচে নড়ছে ওটা। ঝটকা মেরে হাত বের করে ফেলল ও। এতক্ষণে পুরোপুরি সজাগ হয়ে উঠেছে। পাউচের মুখটা ভোলা রেখে এমনভাবে ধরল যাতে চাঁদের আলো ভেতরটা আলোকিত করে তোলে। নিচে একটা কিছু জ্বলজ্বল করছে। তাকিয়ে রইল ও, লক্ষ করল আভাটা বায়বীয় একটা আকার পেল। পাঁচ আঙুলঅলা বেড়ালের থাবা।
খুব সাবধানে আবার থলের ভেতর হাত ঢোকাল তাইতা, মেরেনের চোখ থেকে হান্নাহর বের করা লাল পাথরের ক্ষুদে টুকরোটা তুলে আনল। এখনও উষ্ণ, উজ্জ্বল দেখাচ্ছে, কিন্তু বেড়ালের থাবা মিলিয়ে গেছে। শক্ত করে ধরে রাখল ওটা। সাথে সাথে স্বপ্নের ঝামেলা মিলিয়ে গেল।
কামরার কোণে রাখা তেলের কুপির কাছে এগিয়ে গেল ও, সলতে বাড়িয়ে দিল। সেই আলোয় পাথরের ছোট টুকরোটা পরখ করল। স্ফটিকের রুবি ঝলক জ্যান্ত মনে হচ্ছে। ধীরে ধীরে ওর বোধ জাগল যে পাথরটা ইয়োসের সত্তার খানিকটা ধারণ করে। মেরেনের চোখে এটা ঢোকানোর সময় নিশ্চয়ই নিজের জাদুর একটা অংশে মুড়ে দিয়েছিল।
