সেলাই কেটে ফেলল সে, ফোরসেপ দিয়ে সুইয়ের ফুটো থেকে সুতোর টুকরোগুলো বের করে আনল। শুকনো মিউকাস আর রক্তের পাতাগুলো একসাথে সেঁটে আছে। উষ্ণ সুবাসিত জলে ভেজানো কাপড় দিয়ে আস্তে আস্তে সেটা মুছে ফেলল সে।
এবার চোখ খোলার চেষ্টা করো, কর্নেল ক্যাম্বিসেস, নির্দেশ দিল সে। কেঁপে উঠল চোখের পাতা, চট করে খুলে গেল। চক্ষুকোটরে চোখ ফেলতেই তাইতার মানে হলো ওর বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা অনেক জোরে ও দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে। এখন আর শূন্য গহ্বর নেই ওটা।
পবিত্র ত্রয়ী অসিরিস, আইসিস আর হোরাসের নামে, ফিসফিস করে বলে উঠল তাইতা। তোমার একটা নতুন নিখুঁত চোখ গজিয়েছে!
এখনও নিখুঁত হয়ে ওঠেনি, চিন্তিত কণ্ঠে বলল হান্নাহ। অর্ধেকটা বড় হয়েছে ওটা, এখনও অন্যটার চেয়ে বেশ ছোট। চোখের মণি এখনও আবছা। ডাক্তার গিব্বার হাতে থেকে রূপার থালাটা নিয়ে সরাসরি অপরিপক্ক চোখের ভেতর আলো ফেলল। অন্য দিকে দেখুন চোখের মণি কীভাবে কুঁচকে যাচ্ছে। এরই মধ্যে ঠিকমতো কাজ শুরু করেছে। তুলোর দলায় মেরেনের ভালো চোখটা ঢেকে দিল সে। কী দেখছ, আমাদের বলল, কর্নেল, বলল সে।
উজ্জ্বল আলো, জবাব দিল ও।
আঙুল মেলে ওর মুখের সামনে দিয়ে হাত নিয়ে গেল হান্নাহ। এখন কী দেখছ বলো।
ছায়া, সন্দিহান কণ্ঠে বলল সে। কিন্তু পরক্ষণেই দৃঢ় কণ্ঠে আবার বলল, না, দাঁড়াও! পাঁচটা আঙুলের রেখা।
প্রথমবারের মতো হান্নাহকে হাসতে দেখল তাইতা। হলদে কুপির আলোয় অল্পবয়সী ও ভদ্র মনে হলো তাকে। না, সৎ মেরেন, বলল ও। আজকের দিনে আঙুলের চেয়ে বেশি কিছু দেখতে পাচ্ছ তুমি। অলৌকিক ঘটনা।
চোখে আবার ব্যান্ডেজ বেঁধে দিতে হবে, আবার পেশাদার ও কাঠখোট্টা হয়ে গেল হান্নাহ। দিনের আলো সহ্য করার মতো হয়ে উঠতে আরও কয়েকটা দিন সময় লাগবে ওটার।
৬. শয়তানের দেখানো ইমেজ
গুহায় শয়তানের দেখানো ইমেজগুলো তাড়া করে ফিরছে তাইতাকে। প্রতিদিনই আবার বাগানে ফিরে গুপ্ত পুকুরের পাশে তার জন্যে অপেক্ষা করার উদগ্র একটা ইচ্ছা জোরাল হয়ে উঠছে। মনের সামনের দিকে ও জানে এই তাগিদ ওর নিজস্ব নয়। সরাসরি ইয়োসের কাছ থেকে আসছে।
তার সীমানায় পা রাখলেই শক্তিহীন হয়ে পড়ছি। সব সুবিধাই তার হাতে। সেরা কালো বেড়াল সে। আর আমি তার ইঁদুর, ভাবল ও।
তারপরই ওর অন্তরের কণ্ঠস্বর জবাব দিল। তাহলে কী, তাইতা, জাররিতে তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে আসোনি তুমি? তোমার মহাপরিকল্পনার কী হলো? তাকে খুঁজে পাবার পর এখন কাপুরুষের মতো পিছিয়ে যাবে?
কাপুরুষতার পক্ষে আরেকটা অজুহাত খুঁজে বের করল ও। কেবল যদি বৈরী তীরগুলোকে ঠেকানোর মতো একটা বর্ম পেতাম।
মেরেনকে ওর অপিরপক্ক চোখের পূর্ণ ব্যবহার শেখাতে সাহায্য করে এইসব তাড়া করা ভীতি ও প্রলোভন থেকে মনকে বিক্ষিপ্ত রাখার প্রয়াস পেল তাই। প্রথমে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্যে ব্যান্ডেজ খুলে দিয়েছিল হান্নাহ, এমনকি তখনও ওকে দিনের আলোর দিকে তাকাতে দেয়নি। বরং ঘরের ভেতর আটকে রেখেছে।
চোখের লেন্স এখনও আবছা, পাঁপড়ির রঙও ফ্যাকাশে ও দুধের মতো শাদা। ভালো চোখটার সাথে তাল মিলিয়ে কাজ করছে না, বরং ইচ্ছামতো নড়াচড়া করছে। চোখটাকে স্থির করতে সাহায্য করল তাইতা: লক্ট্রিসের মাদুলিটা মেরেনের সামনে ধরে এপাশ-ওপাশ, ওপর-নিচ দোলাতে থাকে; একবার কাছে আনে আবার দূরে সরায়।
প্রথমে দ্রুত চেষ্টা করল নতুন চোখটা, পানি জমে উঠল তাতে, পাপড়িগুলো আপনাআপনি কেঁপে উঠতে লাগল। রক্তলাল হয়ে চুলকাতে লাগল। ইমেজগুলো আবছা, বিকৃত রয়ে যাবার অভিযোগ করতে লাগল মেরেন।
এ নিয়ে হান্নাহর সাথে আলোচনা করল তাইতা। আসল চোখের চেয়ে ভিন্ন রঙের এটা। আকার বা গতির সাথে খাপ খায়নি। একবার নিজেকে মানুষের মালি বরেছিলে তুমি। হতে পারে তোমার লাগানো চোখটা ভিন্ন জাতের।
না, ম্যাগাস। এই চোখটা মূল চোখের শেকড় থেকেই বড় করা হয়েছে। যুদ্ধে কাটা পড়া অংশগুলো বদলে দিয়েছি আমরা। এগুলো সম্পূর্ণ মনে হয় না। আপনার উত্তরসুরির চোখের মতো চারার কায়দায় শুরু হয়ে আস্তে আস্তে পরিপক্ক আকার পায়। মানুষের শরীরের সময়ের পরিক্রমায় নিজেকে আদি রূপের সাথে খাপ খাইয়ে বৃদ্ধি ঘটানোর ক্ষমতা আছে। নীল চোখের জায়গায় বাদামী চোখ বসানো হয় না। হাতের জায়গায় পা বসানো হয় না। আমাদের সবারই এমন এক ধরনের প্রাণশক্তি আছে যা নিজেকে নকল করতে পারে। বাচ্চারা দেখতে বাবা-মায়ের মতো কেন হয় কখনও ভেবেছেন? থেমে নিবিড়ভাবে ওর চোখের দিকে তাকাল সে। ঠিক একইভাবে একটা কাটা হাত খোয়া যাওয়া অঙ্গের হুবহু নকল দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়। নষ্ট করে দেওয়া কাটা শিশ্ন মূলের মতোই হুবহু একই রকমভাবে বেড়ে উঠবে। প্রচণ্ড বিস্ময়ে ওর দিকে চেয়ে রইল তাই। নিষ্ঠুর, আঘাত দেওয়ার মতো প্রসঙ্গটা ওকে ফিরিয়ে দিয়েছে সে।
আমারই খুঁত নিয়ে কথা বলছে সে, ভাবল ও। আমার বিকৃতি সহ্য করার কথা সে জানে। লাফ দিয়ে উঠে কামরা ছেড়ে বের হয়ে গেল ও। টলমল পায়ে অন্ধের মতো হ্রদের কিনারে চলে এলো। সৈকতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। অসহায়, পরাস্ত মনে হচ্ছে নিজেকে। অবশেষে, অশ্রু যখন আর চোখে বিধল না, দৃষ্টি পরিষ্কার হয়ে এলো, বাগানের মাথার উপর আকাশছোঁয়া ক্লিফ প্রাচীরের দিক মাথা তুলে তাকাল ও। ইয়োস আশপাশে আছে বলেই মনে হচ্ছে। যুদ্ধ চালিয়ে যাবার মতো শক্তি নেই আর, সম্পূর্ণ ক্লান্ত ও মনের দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়েছে ও।
