যা কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তোমাকে আমি তা ফিরিয়ে দিতে পারি, বলল ছেলেটা, কণ্ঠস্বর ডাক ছাড়া বেড়ালের বাচ্চার মতো। তরুণের কোমর থেকে রেশমী কাপড়ের টুকরোটা খসে পড়ল, বের হয়ে এলো নিখুঁত পুরুষাঙ্গ।
তোমাকে তোমার পৌরুষ ফিরিয়ে দিতে পারি, তোমার সামনে তুলে ধরা ওই প্রতিবিম্বের মতো পরিপূর্ণ করে তুলতে পারি। পুকুরের ইমেজ থেকে চোখ সরাতে পারছে না তাই। সারা জীবন বোধ না করা কামনা বোধে আক্রান্ত হলো তাই। সেগুলো এতটাই বিকৃত কামনাপ্রসূত যে, তাইতা বুঝতে পারল ওর নিজের ভেতরে তৈরি নয়, বরং ওই শয়তান ছেলেটাই গেঁথে দিচ্ছে ওর মনে। দূর করে দিতে চাইল ও, কিন্তু নর্দমার জলের মতোই চুঁইয়ে বের হয়ে আসতে লাগল।
ছোট হাত তুলে তাইতার কুঁচকির দিকে ইশারা করল সুদর্শন ছেলেটা। সবই সম্ভব, তাইতা, শুধু যদি আমাকে বিশ্বাস করো।
সহসা কুঁচকিতে জোরাল একটা অনুভূতি বোধ করল তাইতা। প্রেতাত্মা তরুণের অভিজ্ঞতাই ওর শরীরে প্রতিবিম্বিত হচ্ছে বোঝার আগে পর্যন্ত কী হচ্ছে কোনও ধারণাই করতে পারছিল না ও। অজান্তেই ওর পিঠ বেঁকে গেল, দাঁতে দাঁত চেপে ধরায় ঠোঁট ফাঁক হয়ে গেল। গলা থেকে বের হয়ে এলো কর্কশ চিৎকার। ভূতে ধরা মানুষের মতো গোটা শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল ওর। তারপর ঘাসের উপর লুটিয়ে পড়ল ও, যেন এক লীগ দূরত্ব দৌড়ে এসেছে, হাঁপাতে লাগল। ওর সব শক্তি ফুরিয়ে গেছে।
শারীরিক আনন্দের চরম শিখরের স্মৃতির কথা চেপে রাখার কথা ভুলে গেছ? এইমাত্র তোমার যার অভিজ্ঞতা হলো সেটা তোমাকে যা দিতে পারি তার তুলনায় পাহাড়ের কাছে বালি-কণার মতো, বলল ছেলেটা। দৌড়ে পাথুরে ঝর্নার কিনারায় গেল সে। ওখানে থেমে শেষবারের মতো তাইতার দিকে তাকাল। ভেবে দেখ, তাইতা। আমার দিকে হাত বাড়াবে কিনা সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার এখন তোমার। বলেই সোজা পুকুরে ঝাঁপ দিল।
সে অদৃশ্য হওয়ার সময় তার ম্লান দেহটাকে ঝলসে উঠতে দেখল তাইতা। সূর্যটা আকাশের গায়ে অর্ধেকটা পথ পার হয়ে যাবার আগে পর্যন্ত নিজেকে টেনে তোলার মতো শক্তি সংগ্রহ করতে পারল না ও।
*
শেষ বিকেলের দিকে স্যানেটোরিয়ামে ফিরে এলো ও। নার্সের সাথে অন্ধকার সেলে বসে থাকতে দেখল মেরেনকে। তাইতার কণ্ঠস্বর শোনার পর ওর আনন্দ ছিল দেখার মতো। ওকে এত দীর্ঘ সময়ের জন্যে অন্ধকার সেলে কুরে কুরে খাওয়া সন্দেহের ভেতর ফেলে রাখায় নিজেকে অপরাধী বোধ হলো তাইতার।
তুমি যখন ছিলে না মহিলা আবার এসেছিল, বলল সেরেন। কাল ব্যান্ডেজটা পুরোপুরি খুলে ফেলার কথা বলে গেছে। নিজেকে অতক্ষণ সামলে রাখতে কষ্টই হচ্ছে আমার।
বিকেলের ঘটনায় তখনও এমনভাবে অভিভূত ছিল তাইতা যে বুঝতে পারছিল রাতে ঘুমাতে পারবে না ও। সন্ধ্যার খাবার শেষে নার্সকে ওকে একটা বাঁশি এনে দিতে পারে কিনা দেখতে বলল।
ডাক্তার গিব্বা বাঁশি বাজান, জবাব দিল লোকটা। আমি তাকে আপনার অনুরোধের কথা জানাব?
চলে গেল সে, খানিক পরে বাঁশিসহ ফিরে এলো। এমন একটা সময় ছিল যখন তাইতার গান শুনে দারুণ আনন্দ পেত সবাই, এখনও সুরেলা ও ভালোই আছে সেটা। বুকের কাছে মেরেনের চিবুক ঝুলে না পড়া পর্যন্ত গান গাইল ও। নাক ডাকতে শুরু করল সে। এমনকি তারপরেও মৃদু সুরে বাঁশি বাজিয়ে চলল তাইতা, ওর আঙুলগুলো বাঁশিতে শয়তান ছেলেটার তোলা সুর না উঠে আসা পর্যন্ত।
মেরেনের সেলের উল্টোদিকের সেলে মাদুরে শুয়ে নিজেকে স্থির করে নিল ও। কিন্তু ঘুম এড়িয়ে গেল ওকে। অন্ধকারে ওর মন ধেয়ে গেল, ছুটতে শুরু করল বুনো ঘোড়ার মতো, সামলে রাখতে পারল না। ওর মনে শয়তানের বুনে দেওয়া ছবিগুলো এত স্পষ্টভাবে আবার ফিরে আসতে লাগল নিস্তার পাওয়ার উপায় রইল না। জোব্বা নিয়ে সেল থেকে পিছলে বের হয়ে এলো ও, তারপর হ্রদের কিনারা বরাবর হাঁটতে শুরু করল। গালে বরফের ছোঁয়া অনুভব করছে, কিন্তু সেটা ওরই নিজের অশ্রু, বাইরের কোনও সত্তা ওকে শীতল করে তোলেনি।
না পুরুষ, না নারী, তাইতা শয়তানের পরিহাসের পুনরাবৃত্তি করল ও। উলের জোব্বার হাতায় চোখের পানি মুছল। তবে কি এই প্রাচীন পঙ্গু দেহেই চিরকাল বন্দি থাকব? ফিসফিস করে বলল ও। ইয়োসের প্রলোভন যে কোনও শারীরিক নিপীড়নের মতোই কষ্টকর। হোরাস, আইসিস আর অসিরিস, ওসব ঠেকানোর শক্তি দাও।
*
আজ তোমার নার্সদের প্রয়োজন নেই আমাদের, বলল ডাক্তার হান্নাহ, মেরেনের পাশে বসল সে, সেলের একমাত্র আলোর উৎস তেলের কুপির সলতেটা নামিয়ে দিল। তোমাকে আর ব্যথা দেব না। বরং আশা করছি তোমার এরই মধ্যে পাওয়া কষ্টের ক্ষতিপূরণ দিতে পারব কুপিটা নামিয়ে রাখল সে। মেরেনের ব্যান্ডেজ বাঁধা মাথায় কোমল আলো ফেলছে ওটা। তুমি তৈরি, ডাক্তার গিব্বা? গিব্বা মেরেনের মাথা ধরে রাখলে আস্তে আস্তে ব্যান্ডেজের গিঁট খুলে ফেলল সে। কুপিটা তাইতার হাতে তুলে দিল এবার। দয়া করে আলোটা ওর চোখের উপর ধরুন।
মেরেনের মুখের উপর আলোর রশ্মি ফেলতে শিখার পেছনে পলিশ করা রূপা ধরল তাইতা। চোখের পাতা বন্ধ করে রাখা সেলাইগুলো ভালো করে দেখতে সামনে ঝুঁকল হান্নাহ। ভালো, স্বস্তির সাথে বলল সে। যেভাবে সেরে উঠেছে তাতে খারাপ কিছু দেখছি না। এবার সেলাই কাটা নিরাপদ হবে বলেই মনে হয়। দয়া করে আলোটা স্থির রাখুন।
