পুরো দৃশ্যটা এতটাই মোহনীয় ও প্রশান্তিময়, তাইতা কেমল ঘাসের একটা জায়গায় এসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে উপড়ে পড়া গাছের কাণ্ডে ঠেস দিল। কিছু সময় কালো জলের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল ও। পুকরের জলের গভীরে একটা বড়সড় মাছের ছায়া দেখতে পাচ্ছে। জলের উপর ঝুলে থাকা ফার্ন আর চাতালের নিচে অর্ধেকটা ঢাকা পড়েছে। অনেকটা অলস হাওয়ায় উড়ন্ত পতাকার মতে সম্মোহনীর শক্তিতে নড়ছে ওটার লেজ। দেখতে গিয়ে তাইতা বুঝতে পারল কতটা ক্লান্ত ও, চোখ বন্ধ করল। মৃদু বাজনার শব্দে যখন ঘুম থেকে জেগে উঠল বুঝতে পারল না ঠিক কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল।
পুকুরের উল্টোদিকে একটা পাথুরে চাতালে বসে আছে বাদক, তিন বা চার বছর বয়সী কোঁকড়া চুলের একটা ইম্প, আগাছার বাঁশিতে সুর তোলার সময় এপাশ ওপাশ মাথা দোলাচ্ছে, গালে এসে পড়ছে মাথার চুল। গায়ের রঙ রোদে পোড়া সোনালি। দেবদূতসুলভ চেহারা। ছোট ছোট হাত পা নিখুঁত গোলাকার, থলথলে। ছেলেটা সুন্দর, কিন্তু তাই অন্তর্চক্ষু দিয়ে ওর দিকে তাকাতেই তাকে ঘিরে রাখা কোনও আভা দেখতে পেল না।
তোমার কী নাম? জিজ্ঞেস করল তাইতা।
বাঁশিটা ছেড়ে দিতেই সেটা ছেলেটার গলায় ঝোলানো রশিতে ঝুলতে লাগল। অনেক নামই আছে, জবাব দিল সে। ছেলেমানুষি কণ্ঠস্বর, আধোআধো বোল, এতক্ষণ যে মোহনীয় বাঁশি বাজাচ্ছিল তারচেয়েও মধুর।
একটা নাম জানাতে না পারলে তুমি কে সেটা বলো, আবার বলল তাইতা।
আমি অনেক, বলল ছেলেটা। আমি লিজিয়ন।
তাহলে তোমার পরিচয় আমি জানি। তুমি বেড়াল নও, বরং তার থাবার চিহ্ন, বলল তাইতা। তার নাম উচ্চারণ করতে না পারলেও ধারণা করতে পারছে এই দেবদূত ইয়োসেরই একটা প্রকাশ।
আমিও জানি তুমি কে। খোঁজা তাইতা।
দুর্বোধ্য রয়ে গেল তাইতার চেহারা। কিন্তু ওর অন্তস্তলকে রক্ষাকারী বর্মে বরফের তীরের মতো আঘাত করল পরিহাসটা। বনের বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ানো কুকুরছানার মতো মোহনীয় ভঙ্গিমায় উঠে দাঁড়াল ছেলেটা। তাইতার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে, আবার বাঁশি ঠোঁটে ছোঁয়াল। কোমল, ছন্দোময় সুর তুলল, তারপর আগাছার বাঁশিটা নামাল আবার। কেউ তোমাকে বলে ম্যাগাস তাইতা, কিন্তু অর্ধেক পুরুষ কখনও অর্ধেক ম্যাগাসের চেয়ে বেশি হতে পারে না। একটা রূপালি সুর তুলল সে। কিন্তু সুরের মাধুর্য তার কথার যন্ত্রণা দূর করতে পারল না। আবার বাঁশি নামাল সে, কালো পুকুরের দিকে ইঙ্গিত করল। ওখানে কী দেখছ, বিকৃত তাইতা? ছবিটা চিনতে পারছ, না পুরুষ না নারী তাইতা?
কথামতো কালো জলের দিকে তাকাল তাইতা। গভীর থেকে একটা তরুণের প্রতিবিম্ব ফুটে উঠল দেখল। তার চুল ঘন, ঝলমলে, চোখের ভুরু প্রশস্ত নিবিড়, চোখজোড়া প্রজ্ঞা ও রসবোধে প্রাণবন্ত, উপলব্ধি ও সহানুভূতিময়। পণ্ডিত ও শিল্পীর চেহারা ওটা। লম্বা ও, লম্বা পরিষ্কার হাত-পা। ধড় হালকা পেশিপূর্ণ। হাভভাব শিতল ও মহোনীয়। ব্লিচ করা শাদা লিনেনে কুঁচকি ঢেকে রেখেছে। দৌড়বিদ ও যোদ্ধার শরীর।
এই লোকটাকে চিনতে পারছ? ছেলেটা আবার জানতে চাইল।
হ্যাঁ, কর্কশ কণ্ঠে জবাব দিল তাইতা। কণ্ঠ প্রায় ভেঙে পড়েছে।
ওটা তুমি, বলল ছেলেটা। এককালে যেমন ছিলে, অনেক অনেক বছর আগে।
হ্যাঁ, বিড়বিড় করে বলল তাইতা।
এখন কী হয়েছ নিজের চোখেই দেখ, নারকীয় ছেলেটা বলল। তরুণ তাইতার পিঠ বেঁকে গেল, ওর হাত-পা সরু কাঠিতে পরিণত হলো। ক্ষীণ হয়ে গেল চমৎকার পেশি, পেট বেরিয়ে এলো। মাথার চুল ধূসর হয়ে এলো ওর, দীর্ঘ লম্বা চুলও ফিকে হয়ে গেল। শাদা দাঁত পরিণত হলো হলদে খাঁজকাটা। গালে গভীর বলীরেখা দেখা দিল, ভাঁজ হয়ে ভেঙেচুড়ে গেল চিবুকের নিচের চামড়া। ঝিলিক হারাল দুই চোখ। প্রতিমূর্তিটা একটা ক্যারিকেচার হলেও বাস্তবতা কেবল আরও অতিরঞ্জিতই।
তারপর সহসা কোমরের কাপড় খসে পড়ল, যেন দমকা হাওয়ায় উড়ে গেছে, ফলে উন্মুক্ত হয়ে গেল ওর কুঁচকি। নির্বীজ করা ছুরি ও উত্তপ্ত ছ্যাকা দেওয়ার দণ্ডের রেখে যাওয়া ক্ষতচিহ্ন মৃদু স্বরে গুঙিয়ে উঠল তাইতা।
তোমার এখনকার চেহারা চিনতে পারছ? জিজ্ঞেস করল শয়তানটা। অদ্ভুতভাবে অসীম সহানুভূতিতে ভরা কণ্ঠস্বর।
তাইতাকে পরিহাসের চেয়ে বেশি আঘাত করল এই করুণা। আমাকে এসব দেখাচ্ছ কেন? জানতে চাইল ও।
তোমাকে সতর্ক করতে এসেছি আমি। এতদিন তোমার জীবন নিঃসঙ্গ, বন্ধ্যা থেকে থাকলে অচিরেই আরও হাজারগুন বেড়ে উঠবে। আরও একবার ভালোবাসার পরিচয় পাবে তুমি, কামনা করবে, কিন্তু সেই কামনা কখনওই প্রশমিত হবে না। ভালোবাসার এক অসম্ভব নরকে দগ্ধ হবে তুমি। ওকে অস্বীকার করার মতো কোনও শব্দ পেল না তাই। কারণ এরইমধ্যে শয়তানটার হুমকির যন্ত্রণা পেয়ে বসেছে ওকে। এটা, জানে ও, কী হতে পারে তার একটা পূর্বাভাস মাত্র। গুঙিয়ে উঠল ও।
এমন সময় আসবে, যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে মৃত্যু কামনা করবে তুমি, নির্দয়ভাবে বলে চলল শয়তানটা। কিন্তু ব্যাপারটা ভেবে দেখ। দীর্ঘায়ু তাইতা। মৃত্যু এসে শস্তি দেওয়ার আগে কত দিন তোমার ভোগান্তি চলবে?
পুকরের জলে প্রাচীন অবয়বটা মিলিয়ে গেল, তার জায়গায় সুদর্শন প্রাণবন্ত তরুণের ছবি ফুটে উঠল। কালো জল থেকে তাইতার দিকে তাকিয়ে হাসছে সে। চোখ ঝকঝক করছে, দাঁত ঝিলিক মারছে।
