চতুর্থ দিন সকালে চোখের কোটরের তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে জেগে উঠল ও। ঠিক হৃপিণ্ডের স্পন্দনের মতোই নিয়মিত বিরতিতে আঘাত হানছে, এতই প্রবল যে প্রতিটি হামলার সাথে সাথে বিষম খাচ্ছে ও, স্বয়ংক্রিয়ভাবে চোখের দিকে চলে যাচ্ছে দুই হাত। হান্নাহর খোঁজে পরিচারকদের পাঠাল তাইতা। নিমেষে হাজির হলো সে, ব্যান্ডেজ খুলে ফেলল। পচন ধরেনি, বলল সে। পুরোনো ব্যান্ডেজের বদলে নতুন ব্যান্ডেজ লাগাতে শুরু করল। আমরা এমন কিছুই আশা করেছিলাম। বীজ জায়গা করে নিয়েছে। শেকড় ছড়াতে শুরু করেছে এখন।
মালিদের মতো কথাবার্তা বলছ, বলল তাইতা।
আমাদের অনেকটা মানুষের মালিই বলা যায়, জবাব দিল সে।
পরের দিন তিন ঘুমাতে পারল না মেরেন। যন্ত্রণা প্রবল হয়ে উঠলে মাদুরের উপর দাপাদাপি করে, গোঙাতে থাকে ও। খায় না, রোজ মাত্র কয়েক বাটি পানি খেতে পারে। অবশেষে যখন ঘুম গ্রাস করে নিল, চিত হয়ে শুয়ে থাকল ও, ওর হাতজোড়া চামড়ার ফিতে দিয়ে পাশে বেঁধে রাখা হলো। ব্যান্ডেজ বাঁধা মুখে প্রচণ্ড শব্দে নাক ডেকে চলল। গোটা এক রাত এক দিন ঘুমাল ও।
জেগে ওঠার পর শুরু হলো চুলকানি। মনে হচ্ছে পিঁপড়ার দল আমার চোখে আঁচড়াচ্ছে। ঘোঁৎ করে শব্দ করে কর্কশ পাথরে দেয়ালের গায়ে মুখ ডলতে চাইল ও। মেরেন বেশ শক্তিশালী লোক, তাই ওকে ঠেকাতে পরিচারকদের আরও দুই সহকর্মীকে ডাকতে হলো। যদিও খাবার আর ঘুমের ঘাটতির কারণে শরীরে মাংস ঝরে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে ওর। বুকের চামড়ার ভেতর থেকে পরিষ্কার পাঁজরের হাড় বেরিয়ে পড়েছে, পেটটা চুপসে মেরুদণ্ডের হাড়ের সাথে মিশে গেছে যেন।
বছরে পর বছর তাইতা আর ও এত ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে যে ওর সাথে ভুগতে লাগল তাইতাও। মেরেন সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্যে অস্থির ঘুমে তলিয়ে গেলেই কেবল ওর সেল থেকে পালিয়ে আসার সুযোগ পাচ্ছে ও। ওকে পরিচারকদের হাতে ছেড়ে দিয়ে সুন্দর বাগানে ঘুরে বেড়াতে পারে।
এইসব বাগানে এক ধরনের শান্তির খোঁজ পেয়েছে তাইতা, সময়ে সময়ে তাই বারবার এখানে ফিরে আসছে। বিশেষ ঢঙে বিন্যাস করা হয়নি বাগানগুলো, বরং কতগুলো পথ, বড় রাস্তা আর গলির একটা গোলকধাঁধা, সেগুলোর কোনওটা আবার আগাছায় ভরা। প্রতিটি বাঁক বা মোড়ই নতুন আনন্দের জগতে নিয়ে যায়। উষ্ণ মিষ্টি হাওয়ায় নানান ফুলের মিশে যাওয়া সুবাস কেমন যেন ঘোর লাগা অনুভূতি সৃষ্টি করে, নেশা ধরিয়ে দেয়। জমিন এত বিস্তৃত যে এই স্বর্গের পরিচর্যাকারী মাত্র হাতে গোণা কয়েকজন মালির দেখা পেয়েছে ও। ওর আগমনের আভাস পেয়ে অদৃশ্য হয়ে গেছে তারা, যেন মানুষ নয়, প্রেতাত্মা। প্রতি সফরেই নতুন নতুন খিলান আর ছায়াময় হাঁটাপথের দেখা পাচ্ছে ও, আগের বার যা হয়তো বাদ দিয়ে গেছে। কিন্তু আবার সেখানে ফিরে যাবার প্রয়াস পাচ্ছে যখন, দেখা যাচ্ছে সেগুলো অদৃশ্য হয়ে গেছে, সে জায়গায় সমান সুন্দর ও মনোমুগ্ধকর অন্য বাগান দেখা দিয়েছে। বৈচিত্র্যময় বিস্ময়ে ভরা উদ্যান এটা।
বীজ বপনের দশম দিনে মেরেনকে অনেক সহজ মনে হলো। চোখে নতুন ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল হান্নাহ, বলল সে খুশি হয়েছে। ব্যথা পুরোপুরি বন্ধ হলেই চোখের পাতার সেলাই খুলে ফেলতে পারব আমি, তারপর বুঝতে পারব কতটা অগ্রগতি হলো।
আরেকটা শান্ত রাত কাটাল মেরেন, জেগে উঠল নাশতার জন্যে চমৎকার খিদে নিয়ে। তার রসবোধও ফিরে এলো। রোগীর চেয়ে বরং তাইতারই কেমন যেন পরিশ্রান্ত ও দুর্বল বোধ হলো। চোখজোড়া ঢাকা থাকলেও তাইতার মানসিক অবস্থা যেন বুঝতে পারল মেরেন। ওর বিশ্রাম দরকার, একা থাকতে দিতে হবে ওকে। অনেক সময় ওর এমনিতে স্পষ্টবাদী ও সরল সিধা সঙ্গীর চকিত প্রখর বুদ্ধির প্রদর্শনে অবাক মানে তাইতা। মেরেন যখন বলল, আমাকে অনেক সময় ধরে নার্সের মতো সেবা করেছেন, ম্যাগাস। লাগলে মাদুর ভেজাতে দিন আমাকে। আপনি বিশ্রাম নিন। আমি নিশ্চিত দেখতে ভয়াবহ লাগছে আপনাকে। খুবই আলোড়িত হলো ও।
উঠে ছড়িটা তুলে নিল তাইতা, বেল্টের নিচে টিউনিকটা একটু তুলে স্যানেটোরিয়াম থেকে সবচেয়ে দূরের বাগানের উপরের অংশের উদ্দেশে রওয়ানা হলো। জায়গাটাকে সবচেয়ে আকর্ষণীয় মনে হয়েছে ওর। কেবল এটাই জ্বালামুখের সবচেয়ে প্রশস্ত ও যত্নহীন এলাকা, এইটুকু ছাড়া আর কোনও কারণ বলতে পারবে না। পাথুরে প্রাচীর থেকে বিশাল সব চাঁই ভেঙে পড়েছে, গড়িয়ে নেমে এসে প্রাচীন কালের রাজা আর বীরদের নামে নির্মিত সৌধের ধ্বংসস্তূপের মতো পড়ে রয়েছে। সেগুলোর উপর লতাপাতা উঠে এসেছে, ফুলে ভরে গেছে। খুব ভালো করে চেনা ভেবে একটা পথ ধরে আগে বাড়ল ও, কিন্তু দুটো বিশাল বোল্ডারের মাঝখানে একটা হঠাৎ বাঁকে এসে প্রথমবারের মতো লক্ষ করল যে আরেকটা স্পষ্ট রাস্তা সোজা জ্বালামুখের খাড়া দেয়ালের দিকে চলে গেছে। শেষ বার যখন এখানে আসে তখন এটা ছিল না, নিশ্চিত ও। কিন্তু বাগানের এমনি জাদুময় বৈশিষ্ট্যে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে ও, কোনও দ্বিধা ছাড়াই এগিয়ে গেল সে পথে। অল্প কিছুদূর এগোনোর পরেই ডানদিকে কোথাও প্রবহমান পানির আওয়াজ কানে এলো। শব্দ অনুসরণ করে আগে বাড়ল ও, অবশেষে একটা সবুজের পর্দা ভেদ করে সামনে এগিয়ে আরেকটা গোপন ফাঁকা জায়গায় চলে এলো। সকৌতূহলে চারপাশে নজর বোলাল। একটা গুহা-মুখ থেকে ছোট একটা ধারা এসে বেশ কয়েকটা শ্যাওলা ঢাকা চাতালের উপর দিয়ে একটা পুকুরে গিয়ে পড়েছে।
