অন্ধকার ঘনিয়ে আসা পর্যন্ত দেখতে লাগল তাইতা। তারপর গভীর অস্বস্তি বোধ নিয়ে প্রাঙ্গণের উপর দিয়ে হাঁটতে শুরু করল।
ও ঘরে ঢোকার পরপরই জেগে উঠল মেরেন। তরতাজা মনে হলো ওকে, তাইতার গম্ভীর মেজাজ তাকে প্রভাবিত করছে না। সন্ধ্যার খাবার খাওয়ার সময় হান্নাহর পরদিনের অপারেশনের পরিকল্পনা নিয়ে বাজে রসিকতায় মেতে উঠল। নিজেকে সাইক্লপস বলে উল্লেখ করল সে, যাকে একটা কাঁচের চোখ দেওয়া হবে।
*
হান্নাহ ও গিব্বা এক দল সহকারী নিয়ে পরদিন বেশ সকালে হাজির হলো ওদের ঘরে। মেরেনের চোখের কোটর পরীক্ষা শেষে ওকে পরবর্তী ব্যবস্থার জন্যে তৈরি বলে ঘোষণা করল। এক ডোজ ভেষজ চেতনা নাশক তৈরি করল গিব্বা ওদিকে সরঞ্জামের ট্রে-টা পাতল হান্নাহ। তারপর মেরেনের পাশে মাদুরে বসল। খানিক পর পর ওর অক্ষত চোখের পাতা তুলে চোখের মণির বিস্তৃতি পরখ করছে সে। শেষ পর্যন্ত ওষুধ কাজ শুরু করেছে, মেরেন শান্তিতে বিশ্রাম নিচ্ছে, সন্তুষ্ট হয়ে গিব্বার উদ্দেশে মাথা দোলাল সে।
উঠে কামরা থেকে বের হয়ে গেল সে, অল্প সময় বাদে একটা ছোট অ্যালাবাস্টার পট নিয়ে ফিরে এলো। এমনভাবে বহন করছে, যেন ওটা মহাপবিত্র প্রভু সামগ্রী চার সহকারী মেরেনের হাত-পা বেঁধে ফেলা পর্যন্ত অপেক্ষা করে তারপর পটটা হান্নাহর ডান হাতের খুব কাছে নামিয়ে রাখল। আরও একবার মেরেনের মাথাটা দুই হাঁটুর মাঝখানে ধরল। খোয়া যাওয়া চোখের পাতা ফাঁক করে রূপালি ডায়ালেটরটা বসিয়ে দিল জায়গামতো।
ধন্যবাদ, ডাক্তার গিব্বা, বলল হান্নাহ। গোড়ালির উপর মৃদু ছন্দোময় ভঙ্গিতে দুলতে শুরু করল সে। আন্দোলনের সাথে তাল মিলিয়ে মন্ত্র জপতে শুরু করল ওরা। কয়েকটা শব্দ চিনতে পারল তাইতা, মনে হচ্ছে তেনমাসের ক্রিয়া পদের মতো একই উৎস থেকে এসেছে ওগুলো। মনে মনে ধরে নিল এটা হয়তো ভাষার অনেক উন্নত, আরও বিকশিত একটা ধরণ।
ওদের শেষ হলে ট্রে থেকে একটা স্ক্যালপেল তুলে নিল হান্নাহ, তেলের কুপির শিখার উপর দিয়ে খেলাল ওটার ফলা। তারপর চক্ষু কোটরের অভ্যন্তরের লাইনিংয়ে অগভীর সমান্তরাল দ্রুত কয়েকটা গর্ত তৈরি করল। মিস্ত্রিদের ভেজা কাদা লাগাতে দেয়ালের শরীর পানি দিয়ে তৈরি করার কথা মনে পড়ে গেল তাইতার। হালকা ক্ষত থেকে ক্ষীণ ধারায় রক্ত বের হচ্ছে, হান্নাহ একটা শিশি থেকে কয়েক ফোঁটা তরল ছিটাতেই রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে গেল। জমাট বাঁধা রক্ত মুছে ফেলল গিব্বা।
এই তরল শুধু রক্তপাতই বন্ধ করে না, বীজের জন্যেও জোড়া দেওয়ার আঠা তৈরি করে, ব্যাখ্যা করল হান্নাহ।
এর আগে গিব্বার মতো সেই একই রকম সমীহ জাগানো যত্নের সাথে অ্যালাবাস্টার পটের ঢাকনা তুলল হান্নাহ। ভালো করে দেখতে মাথা সামনে বাড়িয়ে দিল তাইতা। খুবই সামান্য পরিমাণ হলদে স্বচ্ছ জেলির মতো পদার্থ দেখতে পেল; বড়জোর নখের ডগা ঢাকার মতো।
চোখ বন্ধ করার জন্যে আমরা তৈরি, ডাক্তার গিব্বা, মৃদু কণ্ঠে বলল সে। ডায়ালেটর তুলে নিল গিব্বা। তারপর বুড়ো আঙুল ও তর্জনী দিয়ে চোখের পাতা বন্ধ করে দিল। ভেড়ার নাড়ী দিয়ে বানানো সূক্ষ্ম সুতো পরানো একটা সরু রূপালি সুই তুলে নিল হান্নাহ। দক্ষ হাতে চোখের পাতায় তিনটা সেলাই দিল। মেরেনের মাথা ধরে রাখল গিব্বা, মিশরিয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মন্দিরের এমবামারদের ব্যবহৃত জটিল প্যাটার্নের পরস্পর লাগানো লিনেনের কাপড়ে ব্যান্ডেজ করে দিল হান্নাহ। স্বস্তি-ভরা চেহারায় পায়ের উপর ভর দিয়ে বসল। ধন্যবাদ, ডাক্তার গিব্বা। যথারীতি তোমার সহযোগিতা অনেক মূল্যবান ছিল।
ব্যস, এই? জানতে চাইল তাইতা। অপারেশন শেষ?
যদি পচন বা অন্য কোনও ধরনের ঝামেলা না দেখা দেয়, বার দিনের ভেতর সেলাই খুলে নেব, জবাব দিল হান্নাহ। ততক্ষণ আমাদের মুল চিন্তার বিষয় হবে চোখটাকে আলো ও রোগির হাত থেকে রক্ষা করা। এই সময়ে অনেক অশান্তিতে থাকবে সে। এমন ব্যথা আর চুলকানি হবে যা কিনা চেতনানাশক ওষুধ দিয়েও চট জলদি কমানো যাবে না। জাগ্রত অবস্থায় নিজেকে সামলাতে পারলেও ঘুমের ভেতর চোখ ডলার চেষ্টা করবে সে। প্রশিক্ষিত পরিচারকদের পাহারায় রাখতে হবে ওকে। হাত বেঁধে রাখা হবে। অন্ধকার জানালাহীন সেলে নিয়ে যেতে হবে ওকে, যাতে আলো ব্যথাকে আরও বাড়াতে বা বীজের অঙ্কুরোদাম ঠেকাতে না পারে। আপনার উত্তরসুরির জন্যে খুব একটা খারাপ সময় যাবে, সামাল দিতে আপনার সহযোগিতার প্রয়োজন হবে তার।
দুটো চোখই বন্ধ করার দরকার হলো কেন, অক্ষতটাও?
চোখে পড়া কিছু ভালো চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করলে নতুনটাও সাড়া দেবে। ওটাকে যতটা সম্ভব নিশ্চল রাখতে হবে আমাদের।
*
ডাক্তার হান্নাহ সাবধান করে দিলেও চোখের বীজ বপন করার পরের তিনটা দিন তেমন একটা অস্বস্তি বোধ করল না মেরেন। সবচেয়ে কষ্টকর হয়ে দাঁড়াল দৃষ্টিশক্তি থেকে বঞ্চিত হওয়া আর সে কারণে দেখা দেওয়া একঘেয়েমী। বছরের পর বছর একসাথে অংশ নেওয়া অভিযান, সফর করা জায়গা আর পরিচয় পাওয়া নারী পুরুষের স্মৃতি রোমন্থন করে ওকে আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করে গেল তাইতা। মাতৃভূমির আর নীলের উপর দিয়ে বয়ে চলা খরার সম্ভাব্য প্রভাব আলোচনা করল ওরা, লোকজনের উপর নেমে আসা দুর্ভোগ ও ফারাও নেফার সেতি ও রানি কীভাবে এই দুর্যোগের মোকাবিলা করছেন তাও আলোচনা করল। গালালায় নিজেদের বাড়িঘর এবং এই অভিযান শেষে ফিরে গিয়ে কী অবস্থায় দেখবে, আলোচনা করল তাও। এইসব প্রসঙ্গে আগেও বহুবার আলোচনা করেছে ওরা, কিন্তু তাইতার কণ্ঠস্বর মেরেনকে শান্ত করল।
