তাহলে সেটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোনও ব্যাপার নয়। হয়তো পরে আবার মনে পড়বে, উঠে দাঁড়ানোর সময় বলল হান্নাহ। এবার ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি, ম্যাগাস। শুনেছি আপনি উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও খুবই অভিজ্ঞ ভেষজবিদ। আমরা আমাদের বাগান নিয়ে দারুণ গর্বিত। আপনি চাইলে সেখানে ঘুরে আসতে পারেন। আপনার গাইড হিসাবে আনন্দের সাথে কাজ করব আমি।
পরের দিনগুলোর বেশিরভাগই হান্নাহর সাথে মেঘ-বাগিচায় ঘুরে বেড়ানোর পেছনে কাটাল তাইতা। কৌতূহল জাগানোর মতো অনেক কিছু ওকে দেখানো হবে বলে আশা করেছিল ও, কিন্তু ওর প্রত্যাশা শতগুন অতিক্রম করে গেল। জ্বালামুখের প্রায় অর্ধেক এলাকা জুড়ে বিস্তৃত বাগান বিপুল প্রজাতির অসংখ্য গাছে ভর্তি, পৃথিবীর সব এলাকার সব ধরনের আবহাওয়ার গাছই আছে।
শত শত বছর ধরে আমাদের মালিরা এসব সংগ্রহ করেছে, ব্যাখ্যা করল হান্নাহ। এই পুরো সময় জুড়ে দক্ষতা বাড়িয়েছে তারা, প্রত্যেকটা প্রজাতির প্রয়োজনীয়তা জেনেছে। ঝর্নায় বুদ্বুদ তোলা পানি নানা উপাদানে ভরা। আমরা বিশেষ ধরনের গোলাঘর তৈরি করতে পেরেছি যেখানে আবহাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।
এখানে নিশ্চয়ই আরও বেশি কিছু আছে, পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেনি তাইতা। এখানে কীভাবে উঁচু পাহাড়ের দানবীয় রোবেলিয়া গাছ ট্রপিকাল বনের টিক আর মেহগনি গাছের পাশে জন্মাতে পারে তার কোনও ব্যাখ্যা মেলে না।
আপনি খুবই বিচক্ষণ, ভাই, সায় দিল হান্নাহ। ঠিকই ধরেছেন। এখানে উষ্ণতা, সূর্যের আলো আর পুষ্টির চেয়েও বেশি কিছু রয়েছে। আপনি গিল্ডে যোগ দেওয়ার পর আমাদের জাররিতে কী পরিমাণ বিস্ময়কর ব্যাপারস্যাপার রয়েছে তার মাত্রা সম্পর্কে একটা ধারণা পাবেন। তবে নগদ জ্ঞান লাভের আশা করতে যাবেন। না। আমরা হাজার বছরের জ্ঞান আর প্রজ্ঞার সমাবেশ নিয়ে আলোচনা করছি। এমন মূল্যবান কিছু একদিনে আয়ত্ত করার নয়। ঘুরে ওর মুখোমুখি হলো সে।
আপনি জানেন এই জীবনে কত দীর্ঘদিন বেঁচে আমি, ম্যাগাস?
তুমি দীর্ঘায়ু এটা বুঝতে পেরেছি, জবাব দিল তাইতা।
ঠিক আপনার মতোই, ভাই, জবাব দিল সে। কিন্তু আপনার জন্মের দিনও অনেক বয়স্ক ছিলাম আমি, কিন্তু এখনও রহস্যের বেলায় নবীশ রয়ে গেছি। গত অল্প কদিনে আপনার সঙ্গ উপভোগ করেছি। আমরা প্রায়ই মেঘ-বাগিচার বুদ্ধিবৃত্তিক ভূখণ্ডে নিজেদের বিচ্ছিন্ন হওয়ার সুযোগ করে দিই, তো আপনার সাথে কথা বলতে পারাটা আমাদের যেকোনও ভেষজ ওষুধের মতোই কাজের। যাহোক, এবার ফিরতে হয়। কালকের প্রক্রিয়ার জন্যে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাগানের গেটে আলাদা হলো ওরা। এখনও বিকেলের গোড়ার দিক। অলস পায়ের হ্রদের কিনারা বরবার হাঁটতে লাগল তাইতা। একটা জায়গা থেকে জ্বালামুখের ওপারে অসাধারণ একটা দৃশ্য দেখা গেল। সেখানে পৌঁছার পর একটা উপড়ানো গাছের গুঁড়িতে বসে মন উন্মুক্ত করে দিল ও। লেপার্ডের খোঁজে বাতাসে গন্ধ শোকা অ্যান্টিলোপের মতো বৈরী উপস্থিতি খুঁজল ইথারে। কিন্তু তেমন কিছু পেল না। একেবারে প্রশান্ত, কিন্তু তারপরও ও জানে ব্যাপারটা এক ধরনের ভ্রান্তি হতে পারে: নিশ্চয়ই ডাইনীর আস্তানার বেশ কাছাকাছি রয়েছে ও। কারণ সব মনস্তাত্ত্বিক প্রতীক ও ইঙ্গিত তার উপস্থিতির সঙ্কেত দিচ্ছে। গোপন জ্বালামুখ তার পক্ষে নিখুঁত ঘাঁটির ব্যবস্থা করবে। এখানে ওর আবিষ্কার করা অসংখ্য বিস্ময়কর ব্যাপারস্যাপার হয়তো তার জাদুরই ফল। এক ঘণ্টারও কম সময় আগে উষ্ণতা, সূর্যের আলো আর পুষ্টিকর উপাদানের চেয়েও বেশি কিছু আছে, বলে তারই ইঙ্গিত দিয়েছে হান্নাহ।
মনের চোখ দিয়ে দানবীয় কালো মাকড়শার মতো ইয়োসকে জালের মাঝখানে বসে থাকতে দেখল ও, শিকারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে মিহি সুতোয় ক্ষীণতম আন্দোলনের অপেক্ষা করছে। তাই জানে, ওইসব অদৃশ্য জাল ওর জন্যেই পাতা হয়েছে, এবং ইতিমধ্যে তাতে বাঁধা পড়েছে ও।
এতক্ষণ নিষ্ক্রিয় ও নীরবে ইথার পরখ করছিল ও। ফেনকে আহ্বান জানাতে প্রলুব্ধ হলেও জানত, তেমন কিছু করলে উল্টে ডাইনীকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বসতে পারে। ফেনকে এখন বিপদে ফেলতে পারবে না। ঠিক মনটাকে রুদ্ধ করতে যাবে, এমন সময় মনস্তাত্ত্বিক গোলমালের একটা মহা তরঙ্গ চিৎকার করে কপালের পাশটা চেপে ধরতে বাধ্য করল ওকে। পাক খেল ও, গাছের গুঁড়ির উপর থেকে প্রায় উল্টে পড়ার দশা হলো।
ও যেখানে বসে আছে তার খুব কাছেই করুণ কিছু ঘটে যাচ্ছে। ওর মনের পক্ষে এমন বিষাদ ও কষ্ট, ইথারে ভেসে আসা এমন চরম অশুভকে মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ল। যুঝতে লাগল ও। যেন ভোলা মহাসাগরের বুকে ডুবন্ত সাতারুর মতো প্রবল জোয়ারের মোকাবিলা করছে। মনে হলো তলিয়ে যাচ্ছে ও, কিন্তু তারপর ঝড়ের প্রাবল্য কমে এলো। এমন একটা ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে যাবার জন্যে এক ধরনের গভীর বেদনাবোধে আক্রান্ত হয়ে রইল ও, বাধা দিতে পারেনি।
উঠে দাঁড়ানোর মতো সামলে নিতে অনেকটা সময় লাগল ওর, ক্লিনিকের পথে পা বাড়াল। সৈকতে বের হয়ে আসার পর হ্রদের মাঝখানে আরেকটা তোলপাড় দেখতে পেল ও। এইবার নিশ্চিত হয়ে গেল ও, ভৌত বাস্তবতাই প্রত্যক্ষ করছে। ও। পানির নিচে থেকে উঠে আসা এক দল কুমীরের আঁশঅলা পিঠ দেখতে পেল ও, হাওয়ায় উড়ছে ওদের লেজ। মনে হচ্ছে যেন মরদেহ খাচ্ছে, লোভী উন্মাদনায় পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়ছে। দেখার জন্যে থামল ও, একটা মদ্দা কুমীরকে পানি থেকে শূন্যে উঠে আসতে দেখল। মাথা নেড়ে এক টুকরো মাংস হাওয়ায় উড়িয়ে দিল ওটা। ওটা নেমে আসার সময় ফের লুফে নিল, তারপর ঘূর্ণী তুলে অদৃশ্য হয়ে গেল পানির নিচে।
