মাঝামাঝি আসার পর আবার থামল ও। অন্যসব বিচ্যুতির সাথে এটাই ছিল স্যানেটোরিয়ামের সামনের দিকটা জরিপ করার প্রথম সুযোগ। মেরেনের ঘরটা যে ব্লকে রয়েছে সেটা মূল কমপ্লেক্সের এক প্রান্তে। আরও পাঁচটা বড় বড় ব্লক দেখতে পাচ্ছে ও। প্রত্যেকটা একটা টেরেস দিয়ে পড়শী থেকে বিচ্ছিন্ন, যার উপর একটা করে পারগোলা আঙুর গাছ ধরে রেখেছে, থোকা থোকা আঙুর ঝুলছে তাতে। এই জ্বালামুখের সব কিছুই উর্বর ও ফলদায়ী ঠেকছে। কেন যেন ওর নিশ্চিত মনে হলো শতশত বছরের পরিক্রমায় এখানেই আবিস্কৃত ও বিকশিত অনেক অনেক অসাধারণ বৈজ্ঞানিক চমক ধারণ করছে দালানগুলো। প্রথম সুযেগেই সেগুলো পরখ করবে ও।
সহসা মেয়েলি কণ্ঠে চিন্তায় ছেদ পড়ল ওর। পেছনে তাকাতেই আগে দেখা সেই গাঢ় ত্বকের তিনজন মেয়েকে দেখতে পেল, সৈকত থেকে ফিরে আসছে। এখন পরনে পুরো পোশাক, চুলে বুনো ফুল পরেছে। এখনও পরিপূর্ণ প্রাণবন্ত মনে হচ্ছে ওদের। বনে চড়ইভাতির সময় জাররির ভালো মদ একটু বেশি চেখে ফেলেছে কিনা ভাবল তাই। ওকে উপেক্ষা করে সৈকত বরাবর দালানকোঠার একেবারে শেষ ব্লকের উল্টোদিকে চলে গেল ওরা। তারপর প্রাঙ্গণের উপর দিয়ে ভেতরে অদৃশ্য হলো। ওদের অবারিত আচরণ কৌতূহলী করে তুলল ওকে। ওদের সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করল। এই ছোট অদ্ভুত বিশ্বে কী ঘটছে সেটা বুঝতে হয়তো ওকে সাহায্য করতে পারবে ওরা।
অবশ্য, সূর্যটা এরইমধ্যে মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে, মেঘ জমাট বাঁধছে। মৃদু হাওয়া বইতে শুরু করল। মুখ উঁচু করে রাখায় ঠাণ্ডা লাগছে। মেয়েদের সাথে কথা বলতে হলে অবশ্যই তাড়াতাড়ি করতে হবে। ওদের পিছু নিল ও। প্রাঙ্গণের মাঝামাঝি আসার পর কমে এলো চলার গতি। ওদের প্রতি আগ্রহও কমে গেল। ওদের কোনও গুরুত্ব নেই, ভাবল ও। আমি বরং মেরেনের কাছেই থাকি। থেমে আকাশের দিকে চোখ তুলে তাকাল ও। জ্বালামুখের দেয়ালের আড়ালে চলে গেছে। সূর্য। প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে। এই অল্প সময় আগেও মেয়েদের সাথে কথা বলাটাকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল, কিন্তু এখন ভাবনাটা ওর মন থেকে বিদায় নিয়েছে যেন মুছে ফেলা হয়েছে। দালানের কাছ থেকে সরে এসে মেরেনের কামরার দিকে পা বাড়াল ও। তাইতা ঢুকতেই উঠে বসল মেরেন, কৃশ হাসল।
কেমন লাগছে? জানতে চাইল তাইতা।
হয়তো ঠিকই বলেছিলেন, ম্যাগাস। লোকগুলো আমাকে সাহায্য করেছে। বলেই মনে হচ্ছে। এখন তেমন একটা ব্যথা নেই। অনেক শক্তিশালী মনে হচ্ছে নিজেকে। ওরা কী করেছে বলুন।
পাউচ খুলে ওকে পাথরের টুকরোটা দেখাল তাই। তোমার মাথার ভেতর থেকে এটা বের করে এনেছে ওরা। এটাই বিষাক্ত হয়ে তোমার কষ্টের কারণে পরিণত হয়েছিল।
পাথরটা নিতে হাত বাড়াল মেরেন, তারপরই ঝটকা মেরে হাত সরিয়ে নিল। কী ছোট, কিন্তু কত খারাপ। বাজে জিনিসটা আমার চোখ কেড়ে নিয়েছে। ওটাকে দিয়ে আমার কোনও কাজ নেই। হোরাসের দোহাই, ফেলে দিন ওটা। কিন্তু জিনিসটা আবার পাউচে রেখে দিল তাইতা।
*
এক ভৃত্য সন্ধ্যার খাবার পৌঁছে দিল ওদের। দারুণ উপাদেয় খাবার, তৃপ্তি ও আয়েস করে খেল ওরা। এক ধরনের গরম পানীয় দিয়ে খাবার শেষ করল, গভীর ঘুমে সেটা ওদের সাহায্য করল। পরদিন বেশ সকালে ফিরে এলো হান্নাহ ও গিব্বা। মেরেনের চোখের ড্রেসিং সরানোর পর ফোলা আর ব্যথা অনেকটা কমে এসেছে এসে দেখে খুশি ওরা।
তিনদিনের ভেতর আবার কাজে নামতে পারব আমরা, বলল হান্নাহ। ততদিনে ক্ষত ঠিক হয়ে যাওয়ার কথা, তবে বীজ গ্রহণ করার মতো উন্মুক্ত থাকবে।
বীজ! জিজ্ঞেস করল তাইতা। বিজ্ঞ বোন, তোমাদের প্রক্রিয়া ঠিক বুঝতে পারছি না। আমি তো ভেবেছি তোমরা কাঁচ বা পাথরের তৈরি নকল চোখ বসানোর পরিকল্পনা করছিলে। এখন আবার কীসের বীজের কথা বলছো?
আপনার সাথে বিস্তারিত নাও আলোচনা করতে পারি, ভাই ম্যাগাস। কেবল মেঘ-বাগিচার গিল্ডের পণ্ডিতরাই এই বিশেষ জ্ঞান লাভের অধিকারী।
আমি আরও জানতে পারছি না বলে স্বাভাবিকভাবেই হতাশ বোধ করছি, কারণ তোমাদের দেখানো নৈপূণ্যের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেছি আমি। এই নতুন আবিষ্কার এখন আরও উত্তেজনাকর মনে হচ্ছে। অন্তত তোমাদের এই নতুন কায়দার চূড়ান্ত ফল দেখার জন্যে অপেক্ষা করব আমি।
জবাব দেওয়ার সময় কিঞ্চিত ভুরু কোঁচকাল হান্নাহ। একে ঠিক নতুন কায়দা বলাটা ঠিক হবে না, ভাই ম্যাগাস। একে আজকের পর্যায়ে আনতে মেঘ-বাগিচার সার্জনদের পাঁচ প্রজন্মের নিবেদিত প্রাণ শ্রমের প্রয়োজন হয়েছে। এমনকি এখনও ঠিক পুরোপুরি নিখুঁত হয়ে ওঠেনি। তবে প্রতিদিনই লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। অবশ্য, আমি নিশ্চিত, হয়তো অচিরেই আমাদের গিল্ডে যোগ দিয়ে এই কাজে আমাদের সাথে অংশ নিতে পারবেন আপনি। আমি নিশ্চিত, আপনার অবদান হবে অনন্য ও অমূল্য। অবশ্যই আপনি যদি ইনার সার্কলের বাইরের কারও জন্যে নিষিদ্ধ নয় এমন কিছু জানতে আগ্রহী হয়ে থাকেন, তাহলে খুশি মনেই সেসব নিয়ে আপনার সাথে আলোচনা করতে পারব।
সত্যিই একটা জিনিস জানতে চাই আমি, বনের ভেতর মেয়েদের প্রথম দেখার কথা, তারপর আবার বৃষ্টির ভেতর ওদের স্যানেটোরিয়ামে ফিরে আসার কথা ওর মনের ভেতর ঘুরে মরছিল। ওদের সম্পর্কে জানার এটা আরেকটা সুবর্ণ সুযোগ মনে হলো। কিন্তু প্রশ্নটা ঠোঁটের ডগায় আসার আগেই মিলিয়ে যেতে শুরু করল। ভাবনটাকে ধরে রাখার বিশেষ চেষ্টা করল ও। আমি তোমার কাছে জানতে চাইছিলাম… প্রশ্নটা মনে করার চেষ্টায় কপাল টিপে ধরল ও। মেয়েদের ব্যাপারে একটা কিছু…মনে করার চেষ্টা করল ও, কিন্তু সূর্য ওঠার সাথে সাথে মিলিয়ে যাওয়া সকালের শিশির বিন্দুর মতো সেটা উড়ে গেল। নিজের নির্বুদ্ধিতায় বিরক্তির সাথে দীর্ঘশ্বাস ফেলল ও। ক্ষমা করবে, কথাটা কী ছিল বেমালুম ভুলে গেছি।
