ওরা আবার রোগির কামরায় ফেরার পর হান্নাহই প্রথম কথা বলবে বলেই মনে হলো ওর। ঘুমের ওষুধের প্রভাব কেটে যাবার আগেই এখুনি ওর অপারেশন করতে হবে, বলল সে।
চারজন পেশিবহুল পরিচারক ফিরে এলো, মেরেনের পা আর হাতের পাশে বসল। রূপালি ট্রেতে সার্জিকাল সরজ্ঞাম সাজিয়ে নিল হান্নাহ।
একটা সুবাসিত ভেষজ মলমে মেরেনের চোখ ও ওটার চারপাশের এলাকা ভিজিয়ে দিল গিব্বা। তারপর দুই আঙুলে চোখের পাতা ফাঁক করে রূপার ডায়ালেটরটা বসাল ওগুলোর মাঝখানে। একটা সংকীর্ণ সুচাল স্কেলপেল বেছে নিল হান্নাহ, চোখের কটোরের মুখে ধরল ওটা। বাম হাতের তর্জনী দিয়ে পেছনটা দেখল, যেন জ্বলন্ত লাইনিংয়ের মাঝে জুৎসই জায়গার খোঁজ করছে। তারপর স্কেলপেলটাকে নির্বাচিত জায়গায় বসাতে সেটাকে ব্যবহার করল। সাবধানে মাংসে খোঁচা দিল সে। ধাতুর চারপাশে রক্ত বের হয়ে এলো। একটা আইভরি দণ্ডের খাঁজে আটকানো এক টুকরো কাপড়ের সাহায্যে সেটা মুছে ফেলল গিব্বা। ফলাটার অর্ধেকটা না ঢোকা পর্যন্ত কেটে আরও গভীরে গেল হান্নাহ। সহসা তার উন্মুক্ত করা ক্ষতস্থান থেকে গলগল করে বের হয়ে এলো সবুজ পুঁজ। সরু একটা ফোয়ারার মতো উঠে এসে রোগির ঘরের ছাদের দিকে ফিনকি দিয়ে ছুটে গেল। আর্তচিৎকার করে উঠল মেরেন, গোটা শরীর বেঁকে গেল ওর, ওঠানামা করতে লাগল, ওকে ধরে রাখা চার চারজন লোক হাতছাড়া হওয়া থেকে বিরত রাখতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করতে বাধ্য হলো।
স্ক্যালপেলটা ট্রেতে ফেলে দিল হান্নাহা, তারপর চোখের কোটারের উপর একটা তুলার দলা চেপে ধরল। ছাদ থেকে ঝরে পড়া পুঁজের গন্ধ ভয়ঙ্কর পচা। ওকে চেপে ধরা লোকদের ভারে আবার শিথিল হয়ে গেল মেরেন। চট করে চোখে চেপে ধরা তুলোটা সরিয়ে নিল হান্নাহ, তারপর কাটা জায়গায় ব্রোঞ্জের একটা ফোরসেপের মুখ ঢুকিয়ে দিল। ক্ষতস্থানের কোথাও চাপা পড়ে থাকা একটা কিছুর সাথে ওটার,ঘর্ষণের আওয়াজ পেল তাইতা। ওটাকে ফোরসেপে ধরে চেপে ধরতে দুই প্রান্ত মেলাল হান্নাহ। আরেক দফা জলীয় পুঁজের একটা ধারার সাথে বাইরের বস্তুটা বের হয়ে এলো। ফোরসেপে ধরে ওটা উঁচু করল সে। মনোযোগের সাথে পরখ করল। জিনিসটা চিনতে পারছি না, আপনি চেনেন? তাইতার দিকে তাকাল সে। একটা হাত পেয়ালার মতো করে বাড়িয়ে দিল তাইতা। সেখানে জিনিসটা ফেলে দিল সে।
উঠে দরজা গলে ঘরে আসা আলোয় সেটা পরখ করতে এগিয়ে গেল তাই। আকারের তুলনায় বেশ ভারি, পাইনের শাঁসের আকারের একটা টুকরো। তর্জনী আর বুড়ো আঙুলে ধরে ওটাকে ঢেকে রাখা রক্ত ও পুঁজ মুছে ফেলল ও। লাল পাথরের টুকরো! জোরে বলে উঠল ও।
চিনতে পেরেছেন? জানতে চাইল হান্নাহ।
পাথরের একটা টুকরো। বুঝতে পারছি না, কেমন করে আমার চোখ এড়িয়ে গেল এটা। বাকি সব টুকরাই পেয়েছিলাম।
নিজেকে দোষারোপ করবেন না, ম্যাগাস। অনেক গভীরে ছিল ওটা। সংক্রমণ পথ না দেখালে আমরাও হয়তো পেতাম না। কোটর পরিষ্কার করে ভেতরে তুলোর দলা ঠেসে দিচ্ছে হান্নাহ আর গিব্বা। অচেতন হয়ে গেছে মেরেন। তাগড়া পরিচারকরা বাধন শিথিল করল।
এখন অনেক সহজে বিশ্রাম নেবে ও, বলল হান্নাহ, তবে ক্ষতস্থানটা পুরোপুরি সেরে উঠতে বেশ কয়েকদিন লাগবে। তখন আমরা চোখটা বদলে দিতে পারব। সে পর্যন্ত ওকে অবশ্যই নিরিবিলি বিশ্রাম নিতে হবে।
এর আগে কখনও কাজটা করতে না দেখলেও তাই শুনেছে ভারতের সার্জনরা মাৰ্বল বা কাঁচের তৈরি চোখ খোয়ানো চোখের জায়গায় বসাতে পারে। এত সূক্ষ্মভাবে নকশা করা থাকে যে মনে হয় সত্যিকারের চোখ। নিখুঁত বিকল্প না হলেও মুখ ব্যাদান করে থাকা শূন্য কোটরের চেয়ে অনেক কম ভীতিকর।
চলে যাওয়ার সময় সার্জন ও তাদের সহকারীদের ধন্যবাদ দিল ও। অন্য পরিচারকরা ছাদ ও মাৰ্বল মেঝের পুঁজ পরিষ্কার করে নোংরা বিছানা বদলে দিল। শেষে আরেক মধ্যবয়সী মহিলা মেরেনের জ্ঞান না ফেরা অবধি নজর রাখতে হাজির হলো। মেরেনকে তার হাওলায় রেখে রোগির ঘর থেকে খানিক্ষণের জন্যে পালিয়ে এলো তাইতা। প্রাঙ্গণ ধরে এগিয়ে গেল সৈকতের দিকে। বিশ্রাম নেওয়ার মতো একটা পাথরের বেঞ্চ পেয়ে গেল।
পাহাড়ের চূড়ায় দীর্ঘ কষ্টকর যাত্রা শেষে অপারেশনের প্রক্রিয়া দেখে এখন ক্লান্ত মনে হচ্ছে নিজেকে। বেল্টের পাউচ থেকে পাথরের টুকরোটা বের করল ও, ফের পরখ করল। সাধারণই মনে হচ্ছে বটে কিন্তু জানে সেটা বিভ্রান্তিকর। ঝিলিক মারছে ক্ষুদে লাল পাথরটা। এক ধরনের উষ্ণ আভা বিলোচ্ছে যেন, ওর মাঝে বিতৃষ্ণা জাগাচ্ছে সেটা। উঠে পানির কিনারায় চলে এলো ও, হ্রদের জলে টুকরোটা ছুঁড়ে ফেলতে হাত পেছনে নিয়ে এলো। কিন্তু তার আগেই ওটার গভীরে এক ধরনের আলোড়ন উঠল, যেন কোনও দানব দাপাচ্ছে ওখানে। ভীতির সাথে পিছিয়ে এলো ও। ঠিক একই সময়ে শীতল হাওয়া কাঁপন জাগাল ওর ঘাড়ে। শিউরে উঠে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল ও। কিন্তু ভীতিকর কিছু দেখতে পেল না। যেমন নীরবে এসেছিল তেমনি চলে গেছে হাওয়াটা। আবার কোমল ও উষ্ণ হয়ে গেছে চারপাশের বাতাস।
পানির উপরে তরঙ্গের একটা বৃত্ত ছড়িয়ে পড়েছে, আবার হ্রদের দিকে তাকাল ও। তখনই আগে দেখা কুমীরের কথা মনে পড়ে গেল। হাতের লাল পাথরের টুকরাটার দিকে তাকাল। দেখে নিরীহ মনে হচ্ছে। কিন্তু শীতল হাওয়া পেয়েছে ও, অস্বস্তিতে ভুগতে শুরু করেছে। পাথরটা আবার পাউচে রেখে ফের প্রাঙ্গণের উপর দিয়ে ফিরতি পথ ধরল।
