এগিয়ে যাবার সময় তাইতা জানতে চাইল, এখানে কতগুলো পরিবার থাকে? ওই মেয়েদের স্বামীরা কোথায়?
ওরা হয়তো স্যানেটোরিয়ামে কাজ করে, এমনকি হয়তো সার্জনও হতে পারে। তেমন একটা আগ্রহ দেখাল না ওনকা। ওখানে হ্রদের কিনারে পৌঁছে জানতে পারব বোধ হয়।
ধোঁয়াটে নীল পানির এপাশ থেকে স্যানেটোরিয়ামটাকে অনাকর্ষণীয় পাথুরে দালানের একটা কমপ্লেক্স মনে হচ্ছে। পরিষ্কার বোঝা যায়, দেয়ালের পাথরের ব্লকগুলো ক্লিফের প্রাচীর থেকে কুঁদে বের করা হয়েছে। চুনকাম নয়, বরং স্বাভাবিক গাঢ় ধূসরই রয়ে গেছে। চারপাশে সুন্দর করে ছাঁটা ঘাসের প্রাঙ্গণ, বুনোহাঁসের ঝাঁক ঘুরে বেড়াচ্ছে সেখানে। অন্তত বিশ ধরনের জলমুরগি হ্রদে সাঁতার কাটছে, ওদিকে অগভীর জলে ঘুরে বেড়াচ্ছে বক আর হেরন। কাঁকর বিছানো সৈকত ধরে যাবার সময় কয়েকটা বিশাল আকারের কুমীর দেখতে পেল তাইতা, নীল জলে গাছের গুঁড়ির মতো পড়ে আছে।
সৈকত ছেড়ে প্রাঙ্গণ ধরে এগিয়ে ফুলে ভরা লতায় ছাওয়া একটা খিলানের ভেতর দিয়ে মূল ভবনের উঠানে পা রাখতে আগে বাড়ল ওরা। ঘোড়ার দায়িত্ব নিতে অপেক্ষা করছিল সহিসরা। চারজন বলিষ্ঠ পুরুষ পরিচারক স্যাডল থেকে একটা খাটিয়ায় তুলে দিল মেরেনকে। মূল ভবনে নিয়ে যাওয়ার পর ওর পাশে রইল তাইতা। এখন যোগ্য হাতে পড়েছ তুমি, মেরেনকে সান্ত্বনা দিল ও। কিন্তু বাতাস আর ঠাণ্ডায় পাহাড় বাইবার ধকল কাবু করে দিয়েছে ওকে, এখন চেতনার কিনারায় ঝুলছে মেরেন।
পরিচারকরা একটা বিরাট অল্প আসবাবে ভরা কামরায় নিয়ে এলো ওকে। হ্রদের দিকে একটা প্রশস্ত দরজা খুলেছে। দেয়াল ও ছাদ ম্লান হলুদ পাথরের টালিতে ঢাকা। শাদা মাৰ্বল মেঝের মাঝখানে রাখা একটা গদিমোড়া তক্তপোষের উপর ওকে নামিয়ে দিল, নোংরা পোশাক খুলে নিয়ে এক কোণে তামার পাইপ থেকে ঘরে তৈরি বেসিনে জমা গরম পানিতে মুছে দিল। পানিতে সালফারের মতো গন্ধ, তাইতা বুঝতে পারল উষ্ণ ঝর্না থেকেই আসছে ওই পানি। ওদের পায়ের নিচের মাৰ্বল মেঝে বেশ আরামপ্রদভাবে উষ্ণ। ওই একই পানি মেঝের নিচে নালার ভেতর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, অনুমান করল তাইতা। কামরা ও পানির উষ্ণতা মেরেনকে শান্ত করে আনছে। লিনেনের তোয়ালে দিয়ে ওকে মুছে দিল পরিচারকরা। তারপর ওদের একজন ওর মুখের সামনে একটা বাটি ধরে পাইনের গন্ধঅলা ভেষজের রস খেতে বাধ্য করল। তাইতাকে ওর তক্তপোশের পাশে বাস অবস্থায় রেখে চলে গেল ওরা। অচিরেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল মেরেন, আরকের প্রভাবেই এসেছে ওই ঘুম।
প্রথমবারের মতো চারপাশ জরিপ করার সুযোগ পেল ও। ওয়াশরুমের দরজা লাগোয়া দেয়ালের কোণের দিকে তাকাতেই ওটার পেছনে মানুষের আভার বিচ্ছুরণ টের পেল। চোখেমুখে তার কোনও ছাপ ফুটে উঠতে না দিয়ে নিবিড়ভাবে সেদিকে নজর দিল। বুঝতে পারল দেয়ালের গায়ে একটা লুকোনো পিপ-হোল আছে, ওটা দিয়ে ওদের উপর নজর রাখা হচ্ছে। জেগে ওঠার সাথে সাথে মেরেনকে সতর্ক করে দেবে ও। এমনভাবে চোখ সরিয়ে নিল, যেন নজরদারের উপস্থিতি সম্পর্কে মোটেই ওয়াকিবহাল নয়।
কিছু সময় পরে একজন পুরুষ আর একজন নারী এলো কামরায়। হাঁটু অবধি লম্বা শাদা পরিষ্কার টিউনিক ওদের পরনে। গলায় কোনও জাদুর পুঁতির নেকলেস বা ব্রেসলেট বা বাঁকানো নখ বা প্রাচীন শিল্পকলার অন্যকোনও সাজসরঞ্জাম না থাকলেও সার্জন বলে চিনতে পারল তাইতা। ভদ্রভাবে নাম ধরে ওকে স্বাগত জানাল ওরা, নিজেদের পরিচয় দিল।
আমি হান্নাহ, বলল মহিলা।
আমি গিব্বা, জানাল লোকটা।
সাথে সাথে রোগির পরীক্ষা শুরু করল ওরা। প্রথমে ব্যান্ডেজ বাঁধা মাথা গ্রাহ্য করে হাত ও পায়ের তালু পরখ করল; পেট আর বুকে টোকা দিল। একটা তীক্ষ্ণ কাঠির সূঁচাল ডগা দিয়ে ওর পিঠে আঁচড় কাটল হান্নাহ, কী ধরনের চল্টা ওঠে পরখ করবে।
সন্তুষ্ট হয়ে তারপর ওর মাথার দিকে নজর দিল। দুই হাঁটুতে মেরেনের মাথা চেপে ধরল গিব্বা, শক্ত করে ধরে রাখল। মেরেনের গলা, কান আর নাকের ভেতর পরখ করল ওরা। তারপর তাইতার বেঁধে দেওয়া ব্যান্ডেজ খুলে ফেলল। শুকনো রক্ত আর খুঁজে নোংরা হয়ে গেলেও ওটা বাধার দক্ষতার তারিফ করল হান্নাহ। তাইতার কাজের নৈপূণ্যের ব্যাপারে সমীহ প্রকাশ করতে ওর উদ্দেশে মাথা। দোলাল।
এবার চোখের পাতা খুলে রাখতে একটা রূপার ডায়ালেটর ব্যবহার করে শূন্য চক্ষুকোটরের দিকে মনোযোগ দিল ওরা। কোটরে একটা আঙুল ঢুকিয়ে দৃঢ়ভাবে চাপ দিল হান্নাহ। গুঙিয়ে উঠে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল মেরেন। কিন্তু হাঁটুর মাঝখানে শক্ত করে ওকে ধরে রাখল গিব্বা। ওরা সোজা হয়ে দাঁড়ানোর পর তাইতার উদ্দেশে মাথা দোলাল হান্নাহ। আঙুলের ডগা এক করে ঠোঁট স্পর্শ করল। আমাদের কিছুক্ষণের জন্যে ক্ষমা করতে হবে। রোগির অবস্থা নিয়ে আলাপ করতে হবে।
খোলা দরজা পথে প্রাঙ্গণে চলে গেল ওরা। ওখানে আলোচনায় মগ্ন হয়ে একসাথে পায়চারি করতে লাগল। দরজা পথে ওদের আভা পরখ করল তাইতা। গিব্বার আভা রোদের আলোয় ধরে রাখা তলোয়ারের মতো ঝিলিক আছে। তাই লক্ষ করল তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি শীতল, নিরাবেগ।
হান্নাহর আভা পরখ করতে গিয়েই বুঝে গেল দীর্ঘায়ু মহিলা সে। তার পুঞ্জীভূত অভিজ্ঞতা বিপুল, দক্ষতা অসীম। বুঝতে পারল তার চিকিৎসার সামর্থ সম্ভবত ওর ক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে গেছে, কিন্তু তারপরেও সহানুভূতির অভাব রয়েছে তার। তার আভা বন্ধ্যা ও কঠোর। আভা থেকে বুঝতে পারল দায়িত্বের প্রতি নিবেদনের ব্যাপারে মহিলা কঠোর, দয়া বা করুণায় ভোলার নয়।
