সহসা সামনে কাঠের কাঠামোর ভারি গেটের ওপাশে ক্লিফের প্রাচীরে একটা টানেলের মুখ উদয় হলো। ওরা এগিয়ে যাবার সাথে সাথে ধীরে ধীরে খুলে গেল গেটটা, ভেতের ঢুকতে দিল ওদের। দূর থেকে প্রবেশপথে পাহারাদারদের উপস্থিতি দেখতে পেল ওরা। মেরেনের অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকায় প্রথমে ওদের দিকে তেমন একটা নজর দিতে পারেনি তাইতা। কাছাকাছি যাবার পর লক্ষ করল খাটো আকারের ওরা, স্বাভাবিক মানুষের অর্ধেক হবে বড়জোর। কিন্তু বিশাল ওদের বুকের ছাতি, হাতগুলো এত লম্বা যে প্রায় জমিন ছুঁয়েছে। ওদের দাঁড়াবার ভঙ্গি কুঁজো ও বাঁকা পায়ের। সহসা বুঝতে পারল তাইতা, ওরা মানুষ নয়, বরং বিশালদেহী শিম্পাঞ্জি। ও যেটাকে বাদামী ইউনিফর্মের কোট ভেবেছিল সেটা আসলে ওদের ঝুলন্ত পশম। গুবড়ে পোকার মতো ভুরু পর্যন্ত নেমে এসেছে ওদের ঢালু কপাল। ওদের চোয়াল এতটাই উন্নতি লাভ করেছে যে দাঁতের উপর দিয়ে ঠোঁট সম্পূর্ণ বন্ধ হচ্ছে না। খুব কাছাকাছি বসানো চোখের স্থির দৃষ্টিতে ওর জরিপের উত্তর দিল ওরা। নীরবে অন্তর্চক্ষু খুলল তাইতা, একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের ও পাশবিক বলে আবিষ্কার করল ওদের আভা। ওদের খুনে প্রবৃত্তি প্রতিরোধের ছুরির মতো কিনারায় ঠেকে আছে।
ওদের চোখের দিকে তাকাবেন না, সতর্ক করল ওনকা। উস্কে দেবেন না। অনেক শক্তিশালী, বিপজ্জনক জানোয়ার। পাহারা দেওয়ার ব্যাপারে খুবই একগুঁয়ে। আপনি যেভাবে পোড়ানো কোয়েল পাখিকে ছিঁড়ে কুটিকুটি করেন, ঠিক সেভাবে মানুষকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে পারে। ওদের সুড়ঙের মুখের কাছে নিয়ে গেল সে, সাথে সাথে ওদের পেছনে বন্ধ হয়ে গেল বিশাল গেটটা। দেয়ালের ব্র্যাকেটে জ্বলন্ত মশাল আটকানো। পাথুরে পথে শব্দ তুলছে ঘোড়ার খুর। দুটো ঘোড়া পাশাপাশি এগোনোর মতো যথেষ্ট প্রশস্ত, সওয়ারিদের স্যাডলের উপর উবু হতে হচ্ছে যাতে ছাদের সাথে মাথার টক্কর না লাগে। চারপাশের দেয়াল ভূগর্ভস্থ নদী ও লুকোনো লাভার পাইপের বিড়বিড়ানিতে ভরা। সময় সুড়ঙটা বা কত দূর পথ অতিক্রম করেছে তার পরিমাপের কোনও উপায় নেই ওদের। তবে অবেশেষে বেশ সামনে স্বাভাবিক আলোর একটা মেঘ দেখতে পেল ওরা। আরও আগে বাড়তেই টানেলে প্রবেশ পথ আটকে রাখা গেটের মতোই আরেকটা গেট দেখা গেল। ওরা কাছে যাবার আগেই খুলে গেল ওটা। শিম্পাঞ্জিদের আরকেটা দলের দেখা মিলল। ওদের পার হয়ে আসার পর উজ্বল রোদের আলোয় চোখ পিটপিট করে উঠল ওদের।
চোখ সয়ে আসতে বেশ খানিকটা সময় লাগল। তারপর অবাক বিস্ময়ে চারপাশে চোখ বোলাল ওরা। একটা সুবিশাল আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখে এসে পড়েছে, এত চওড়া যে সবচেয়ে দ্রুত গতির ঘোড়ারও ওটার একপাশের উলম্ব প্রাচীর থেকে আরেক প্রাচীর পর্যন্ত যেতে দিনের অর্ধেকটা লেগে যাবে। এমনকি দক্ষ কোনও পাহাড়ী আইবেক্সও ওই খাড়া দেয়াল বেয়ে উঠতে পারবে না। জ্বালামুখের তলাটা একটা সবুজ অবতল বর্ম। ওটার মাঝখানে ছোট একটা হ্রদ, তাতে দুধের মতো নীল আভাঅলা জল। ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠে আসছে উপরিতল থেকে। তাইতার ভুরু থেকে বরফের একটা টুকরো গলে গাল বেয়ে নেমে গেল। চোখ পিটপিট করল ও, বুঝতে পারল জ্বালামুখের হাওয়া কোনও ট্রপিকাল সাগরের দ্বীপের মতো আরামপ্রদ। চামড়ার কেইপ খুলে ফেলল ওরা, এমনকি মেরেনের অবস্থাও যেন উষ্ণ পরিবেশে আগের চেয়ে ভালো হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে।
পৃথিবীর অগ্নিকুণ্ডের পানিই এই জায়গাটাকে উষ্ণ রাখে। এখানে বাজে আবহাওয়া বলে কিছু নেই। উদ্ধতভাবে হাত নেড়ে চারপাশ ঘিরে রাখা সুন্দরবনের দিকে ইঙ্গিত করল ওনকা। চারপাশের জন্মানো গাছপালা দেখতে পাচ্ছেন? দুনিয়ার আর কোথাও এসব দেখতে পাবেন না।
স্পষ্ট পথ ধরে আগে বাড়ল ওরা। জ্বালামুখের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য দেখিয়ে দিচ্ছে ওনকা। ক্লিফের রঙ লক্ষ করুন, তাইতাকে আমন্ত্রণ জানাল সে, বিশাল দেয়ালের দিকে তাকাতে ঘাড় করে রেখেছে ও। আগ্নেয়গিরির স্বাভাবিক ধূসর বা কালো নয় ওগুলো, বরং রুবি পাথরের ছোপঅলা কোমল নীল ও লালচে সোনালি রেণুতে ঢাকা। বহুরঙা পাথরের মতো লাগছে যেটাকে সেটা আসলে মেয়েদের চুলের সমান লম্বা ও পুরু ছত্রাক, বলল ওনকা।
ক্লিফের দিকে থেকে চোখ নামাল তাইতা। নিচের বেসিনের বনের দিকে তাকাল। ওগুলো পাইন গাছ, সোনালি বাঁশের ঝাড় থেকে মাথা বের করে থাকা উঁচু সবুজ বর্শাগুলোর দিকে তাকিয়ে বলে উঠল ও। দানবীয় লতা। পুরু মাংসল কাণ্ড থেকে ঝলমলে ফুল ঝুলছে। বাজি ধরে বলতে পারি ওগুলো কোনও ধরনের ইউফোরবিয়া, আর গোলাপি ও পালকের মতো রূপালি ফুলেঢাকা ঝোঁপগুলো প্রোটিয়াস। ওপাশের লম্বা গাছগুলো সুবাসিত সিডার। আর ছোটগুলো তেঁতুল ও খায়া মেহগনি। ফেন থাকলে এসব দেখে মজা পেত খুব, মনে মনে ভাবল ও।
হ্রদের কুয়াশা ধোয়ার মতে ছত্রাক পড়া ডালের ভেদ করে উঠে আসছে। একটা জলধারা অনুসরণ করতে বাঁক নিল ওরা, কিন্তু কয়েক শো কদম এগোনোর আগেই মেয়েদের ঝনঝন হাসি আর কণ্ঠস্বর কানে এলো! একটা ফাঁকা জায়গায় এসে দেখল নিচের পুকুরের ধূমায়িত নীল জলে সাঁতার কাটছে তিনটা মেয়ে, জলকেলী করছে। নীরবতার ভেতর ওদের চলে যেতে দেখল মেয়েরা। তরুণী ওরা, গাঢ় গায়ের রঙ, লম্বা ভেজা চুল কৃষ্ণকালো। তাইতা ভাবল, ওরা সম্ভবত পুব সাগরের ওপাশের দেশ থেকে এসেছে। নিজেদের নগ্নতা সম্পর্কে নির্বিকার ঠেকল ওদের। প্রত্যেকটা মেয়ের পেটেই বাচ্চা রয়েছে, স্ফীত পেটের ভারসাম্য রক্ষা করতে বারবার কোমরের উপর ভর বদল করছে।
