*
মুতাঙ্গিতে ফেরার পরপরই মেরেনের চোখ ও ওর সামগ্রিক অবস্থা পরখ করল তাইতা। উপসংহার অস্বস্তিকর। ক্ষতস্থানের গহ্বরে গভীর এক ধরনের সংক্রমণ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে, বারবার ব্যথা, রক্তক্ষরণ ও পুঁজ জমার কারণ সেটাই। তাই ক্ষতস্থানের আশপাশের এলাকায় জোর চাপ দিতেই নিস্পৃহভাবে সহ্য করে নিল মেরেন, কিন্তু ব্যথায় হাওয়ায় কম্পিত শিখার মতো টলে উঠল ওর আভা। অলিগার্করা ওর চিকিৎসার ব্যবস্থা নিচ্ছে, জানাল তাই।
আপনিই আমার ক্ষতস্থানের চিকিৎসা করুন, অস্বীকার গেল মেরেন। এই বিদ্রোহী মিশরিয়দের বিশ্বাস করি না। এরা আমাদের দেশ আর ফারাওর সাথে বেঈমানি করেছে। কেউ আমার জন্যে ভেবে থাকলে সেটা আপনি। তাইতা ওকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেও অটল রইল সে।
*
বিলতো এবং অন্য গ্রামবাসীরা অতিথিপরায়ণ ও বন্ধুসুলভ। তাইতার দল নিজেদের সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন নৈমিত্তিক জীবনে মিশে যাচ্ছে বলে আবিষ্কার করল। বাচ্চারা যেন ফেনের প্রতি মুগ্ধ হয়ে গেছে। ওদের তিনজনের সাথে বন্ধুত্ব হয়ে গেছে যেন, ওদের সঙ্গ বেশ আনন্দ যোগাচ্ছে ওকে। প্রথম প্রথম ওদের সাথে অনেক বেশি সময় কাটাচ্ছিল ও, বনে ব্যাঙের ছাতার খোঁজ করেছে কিংবা ওদের গান, নাচ বা খেলা শিখেছে। ওকে বাও সম্পর্কে কিছুই শেখাতে পারল না ওরা, অচিরেই গ্রামের চ্যাম্পিয়নে পরিণত হলো ও। বাচ্চাদের সাথে না থাকলে প্রায়ই আস্তাবলের সহিসদের সাথে ওয়ার্লউইন্ডকে প্রশিক্ষণ দেয়। হিলতো ওকে তীরন্দাজী প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। নিজস্ব একটা ধনুক বানিয়ে দিয়েছে ওকে। একদিন বিকেলে ইম্বালির সাথে হাসি ঠাট্টা, আড্ডায় প্রায় ঘণ্টাখানেক কাটানোর পর তাইতার কাছে এসে জানতে চাইল, ওর পুরুষাঙ্গ নেই কেন?
জুৎসই জবাব খুঁজে পেল না তাইতা। ব্যাপারটা ওর কাছ থেকে কখনও আড়াল করতে না চাইলেও ওর সাথে ওকে নির্বীজ করার বিষয়টা আলোচনা করার মতো বয়স হয়নি ওর। তবে অনেক দ্রুত আসবে সেই সময়। ইদালির কাছে প্রতিবাদ করার কথা ভাবল ও, কিন্তু পরক্ষণেই নাকচ করে দিল। দলের একমাত্র নারী হিসাবে সবচেয়ে ভালো গুরু সে। মোটামুটি দায়সারা গোছের জবাব দিয়ে আপাতত সমস্যা মেটাল ও। তবে পরে নিজের অপূর্ণতা নিয়ে এক ধরনের সচেতনতা বোধ করতে লাগল। ফলে ফেনের দৃষ্টি থেকে শরীর আড়াল করার প্রয়াস পেল ও। এমনকি গ্রাম থেকে দূরে ঝর্নার পানিতে একসাথে সাঁতার কাটার সময়ও টিউনিক খুলল না। নিজের দৈহিক অপূর্ণাঙ্গতাকে মেনে নিয়েছে ভেবেছিল ও, কিন্তু এখন রোজই বদলে যাচ্ছে অবস্থা।
মেরেনকে মেঘ-বাগিচার রহস্যময় স্যানেটোরিয়ামে নিয়ে যাওয়ার জন্যে ওনকার আসতে আর বেশি দেরি নেই। ওকে চিকিৎসায় রাজি করানোর সাধ্যমতো সবই করেছে তাইতা, কিন্তু অবাধ্য হওয়ার অনুকরণীয় ক্ষমতা রয়েছে মেরেনের, ওর সব রকম তোষামোদ দৃঢ়তার সাথে ঠেকাচ্ছে সে।
তারপর এক সন্ধ্যায় মেরেনের চেম্বারে মৃদু গোঙানির শব্দে ঘুম থেকে জেগে উঠল তাইতা। বাতি জ্বেলে ওর ঘরে ঢুকে মাদুরে উবু হয়ে দুহাতে মুখ ঢেকে রেখেছে মেরেন। আস্তে করে ওর হাত সরিয়ে নিল তাইতা। ওর মুখের একপাশ বিশ্রীভাবে ফুলে উঠেছে। টানটান একটা রেখায় পরিণত হয়েছে শূন্য অক্ষিকোটর। চামড়া যেন পুড়ে যাচ্ছে। গরম পুলটিশ ও আরামদায়ক মলম লাগিয়ে দিল তাইতা, কিন্তু সকালের দিকে সামান্যই উন্নতি হলো পুরোনো ক্ষতের। সেই দিনই ওনকার হাজির হওয়াটা কাকতালের চেয়েও বেশি কিছু মনে হলো ওর।
মেরেনকে যুক্তি দেখাল তাইতা: পুরোনো বন্ধু, তোমার চিকিৎসার জন্যে আমার আর কিছু করার আছে বলে মনে হচ্ছে না। তোমার ভোগান্তি সহ্য করার সিদ্ধান্ত সময়ের অনেক আগেই তোমাকে ওপারে নিয়ে যাবে বলে আমার ধারণা। তবে আমি যেখানে ব্যর্থ হয়েছি, জাররিয় সার্জনদের একবার চেষ্টা করার সুযোগ দিয়ে দেখতে পারো।
দুর্বল ও জ্বরাক্রান্ত হয়ে পড়ায় আর বাধা দিতে পারল না মেরেন। ইদালি ও ফেন পোশাক পরতে সাহায্য করল ওকে। তারপর একটা ছোট ব্যাগে ওর টুকটাক জিনিসপত্র ভরে দিল। লোকেরা বাইরে নিয়ে ঘোড়ায় চাপতে সাহায্য করল ওকে। ঝটপট ফেনকে বিদায় জানাল তাইতা, উইন্ডস্মোকের পিঠে সওয়ার হওয়ার আগে হিলতো, নাকোন্তো ও ইম্বালির দিকে খেয়াল রাখতে বলল ওকে। পশ্চিমুখী রাস্তা ধরে মুতাঙ্গি ত্যাগ করল ওরা। আধা লীগের মতো উইন্ডস্মোকের পেছন পেছন দৌড়ে এলো ফেন। তারপর রাস্তার পাশে থেমে ওরা দৃষ্টিসীমার বাইরে না যাওয়া পর্যন্ত হাত নাড়তে লাগল।
আরও একবার আগ্নেয়গিরির ত্রয়ী চূড়ার দিকে এগিয়ে চলল ওরা, কিন্তু দুর্গে পৌঁছানোর আগেই আরও উত্তরে চলে যাওয়া পথটা বেছে নিল। অবশেষে পাহাড়ের দিকে যাওয়া সংকীর্ণ পাসে ঢুকল। ওটা বেয়ে এমন একটা উচ্চতায় উঠে এলো যেখান থেকে অনেক দক্ষিণে দুর্গ চোখে পড়ে। অলিগার্কদের সাথে যে দরবার হলে দেখা করেছিল সেটাকে একেবারে ছোট মনে হচ্ছে এখান থেকে। পাহাড়ী পথ ধরে এগিয়ে চলল ওরা। বাতাস শীতল হয়ে এলো। ক্লিফের গায়ে গুঙিয়ে চলেছে বাতাস। যত উপরে উঠছে মনে হচ্ছে পাহাড় আরও উঁচু হয়ে উঠছে। দাড়ি আর ভুরুতে শাদা তুষার জমে উঠছে। কেইপ গায়ে জড়িয়ে ক্রমাগত উপরে উঠে চলল ওরা। জিনের উপর এপাশ ওপাশ দোল খেতে শুরু করেছে মেরেন। ওকে সাহায্য করতে ও পতন ঠেকাতে ওর পাশে থেকে ঘোড়া চালাচ্ছে তাইতা ও ওনকা।
