নাম ধরে সামনে ডাকল তাইতা: সবার আগে মেরেন, প্ল্যাটফর্মের সামনে পাঠানো হলো ওকে। এ কর্নেল মেরেন ক্যাম্বিসেস, বীরত্বের স্বর্ণ পদকধারী ও লাল পথের সঙ্গী। নীরবে ওকে জরিপ করল কাউন্সিল। সহসা অস্বাভাবিক একটা কিছু ঘটার ব্যাপারে সজাগ হয়ে উঠল তাইতা। তিন অলিগার্ক থেকে ওদের পেছনের চামড়ার পর্দাটার দিকে মনোযোগ দিল। গোপন সত্তার উপস্থিতি খোঁজ করল, কিন্তু নেই কিছু। যেন পর্দার ওপাশের জায়গাটা কেবলই শূন্যতা। কিন্তু এইটুকুই ওকে সতর্ক করে তোলার জন্যে যথেষ্ট। মনস্তাত্ত্বিক কোনও শক্তি কামরার এই অংশটুকু আড়াল করে রেখেছে।
ইয়োস এখানে! ভাবল ও। সে কোনও আভা ছড়ায় না, নিজেকে চামড়ার চেয়ে অনেক বেশি দুর্ভেদ্য পর্দার আড়ালে লুকিয়ে রেখেছে। আমাদের উপর নজর রাখছে। ধাক্কাটা এতটাই প্রবল ছিল যে নিজেকে সামলে উঠতে রীতিমতো কষ্ট হলো। সেই আসল শিকারী, রক্ত বা দুর্বলতার গন্ধ পেয়ে যাবে।
অবশেষে ফের কথা বলল আকের। চোখ খেয়ালে কীকরে, কর্নেল মেরেন ক্যাম্বিসেস?
সৈনিকদের ক্ষেত্রে এমন হয়েই থাকে। আমার জীবনে অনেক অঘটন ঘটেছে।
পরে এক সময় ওসব নিয়ে কথা বলা যাবে, বলল আকের।
এই ধরনের হেঁয়ালিময় কথার সামান্য অর্থই বের করতে পারল তাই। দয়া করে নিজের জায়গায় ফিরে যাও, কর্নেল। সাক্ষাৎকারটা সাধারণ ছিল, কিন্তু মেরেনের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সব তথ্যই বের করে নিয়েছে সে।
এরপর হিলতোকে ডাকল তাইতা। ওকে বিচার করে দেখতে আরও কম সময় নিল অলিগার্করা। কেবল প্রান্তে নীল ফিতের মতো একটা রেখার পতপত করে চলা ছাড়া হিলতোর আভাকে সৎ ও অনার্ষণীয়ভাবে জ্বলতে দেখল তাইতা। তার বিরক্তি প্রকাশ করে দিচ্ছে ওটা। অলিগার্করা ওর আসনে পাঠিয়ে দিল ওকে। নাকোন্তো ও ইম্বালির সাথে মোটামুটি একইরকম আচরণ করল ওরা।
অবশেষে ফেনকে তলব করল তাইতা। মাই লর্ডস, এ হচ্ছে যুদ্ধে এতিম হয়ে যাওয়া একটি মেয়ে, দয়া করে ওকে নিয়ে এসেছি আমরা। আমার সঙ্গী করে নিয়েছি, নাম রেখেছি ফেন। তার সম্পর্কে তেমন একটা কিছু জানি না। আমার কোনও বাচ্চা না থাকায় ওকে বড় ভালোবেসে ফেলেছি।
পরিত্যক্ত শিশুর মতো লাগছে সুপ্রিম কাউন্সিলের সামনে দাঁড়ানো ফেনকে। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে লাজুকভাবে এক পা থেকে আরেক পায়ে শরীরের ভর বদল করছে বারবার। যেন সাহস করে প্রশ্নকারীদের দিকে সরাসরি তাকাতে পারছে না। যথারীতি ওকে অন্তর্চক্ষু দিয়ে জরিপ করে চলল তাইতা। চাপা রইল ওরা আভা। ওর জন্যে স্থির করা ভুমিকা নিখুঁতভাবে পালন করছে। আরেকদফা বিরতির পর আকের জানতে চাইল, তোমার বাবার নাম কী, মেয়ে?
হুজুর, আমি তাকে চিনি না। মিথ্যার ঝিলিক দেখা গেল না ওর আভায়।
তোমার মা?
তার কথাও আমার মনে নেই, হুজুর।
তোমার জন্মস্থান কোথায়?
হুজুর, মাফ করবেন, ঠিক জানি না।
ফেন কীভাবে নিজেকে সামলে রাখছে খেয়াল করল তাইতা।
এদিকে এসো, নির্দেশ দিল আকের। অনুগতের মতো লাফ দিয়ে প্ল্যাটফর্মে উঠল ফেন, এগিয়ে গেল আকেরের কাছে। ওর হাত ধরে টুলের কাছে টেনে নিল সে। তোমার বয়স কত, ফেন?
আমাকে বোকা ঠাউড়াবেন, কিন্তু আমি জানি না। ওকে ঘুরিয়ে নিল আকের, টিউনিকের ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিল। লিনেনের নিচে ওর বুক স্পর্শ করল।
এই মধ্যে একটা কিছুর অস্তিত্ব রয়েছে, হেসে বলল সে। আরও অনেক বেড়ে উঠবে শিগগিরই। মৃদু গোলাপি হয়ে উঠল ফেনের আভা। মেয়েটা নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবে বলে ভয় হলো তাইতার। পরক্ষণেই বুঝতে পারল দুর্বোধ্য আচরণের কারণে ওর বয়সী কোনও মেয়ের মতোই লজ্জার আভাটুকুই তুলে ধরছে ও। নিজের ক্রোধ আড়াল করতেই বরং অনেক কষ্ট পেতে হচ্ছে ওকে। অবশ্য, বুঝতে পারছে এই ছোট নাটকটা একটা পরীক্ষা: আকের হয় ফেন বা তাইতার তরফ থেকে উস্কানি দিয়ে ওদের ক্রুদ্ধ করে তুলতে চাইছে। চেহারা পাথরের মতো করে রাখল তাইতা, তবে ভেবে চলল। বদলার সময় এজন্যে কড়ায়গণ্ডায় মাশুল গুনতে হবে তোমাকে, লর্ড আকের।
ফেনকে কচলে চলল অলিগার্ক। আমি নিশ্চিত অসাধারণ সুন্দরী হয়ে উঠবে তুমি। যথেষ্ট ভাগ্যবতী হলে হয়তো এই জাররিতেই মহাসম্মান আর মর্যাদার আসন পেয়ে যাবে। ওর ছোট নিতম্বে চিমটি কাটল সে। ফের হেসে উঠল। এবার ভাগো তো, পিচ্চি। বছর দুয়েকের মধ্যেই এসব নিয়ে ভাবব আমরা।
ওদের বাতিল করে দিল সে, কিন্তু তাইতাকে থাকতে বলল। অন্যরা কামরা ছেড়ে বেরিয়ে যাবার পর ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করল আকের, আমাদের একান্তে আলোচনা করা দরকার, ম্যাগাস। আমরা চলে যাবার সময় আমাদের ক্ষমা করবেন। বেশিক্ষণ একা রাখব না আপনাকে।
ফিরে আসার পর তিন অলিগার্ককে আগের চেয়ে অনেক বেশি নিশ্চিন্ত ও বন্ধুসুলভ মনে হলো। সমীহ দেখানো অব্যাহত রাখল তারা।
আমার দাদা সম্পর্কে কী জানেন বলুন, আমন্ত্রণ জানাল লর্ড আকের। আমার জন্মের আগেই মারা গেছেন তিনি।
অভিবাসন ও দুই সাম্রাজ্যে হিকস্স বাহিনীর আক্রমণের সময় রানি লস্ত্রিসের দরবারের একজন সম্মানিত ও অনুগত সদস্য ছিল সে। মহামান্যা রানি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব দিয়েছিল তাকে। নীলের খাড়ির উপর দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তাটা সেই আবিষ্কার করে। ওটা এখনও ব্যবহার করা হয়, আসৌন ও কেবুইয়ের পথে কয়েকশো লীগ দূরত্ব বাঁচে। এই জন্যে আর অন্যান্য সাফল্যের জন্যে রানি সম্মানে ভূষিত করেছিল তাকে।
