চল্লিশ লীগ দূরে, তাইতাকে বলল ওনকা। বেশ কয়েক ঘণ্টার যাত্রা। আবহাওয়া চমৎকার, রৌদ্রজ্জ্বল, বাতাস কড়কড়ে, উদ্দীপ্তকারী। ফেনের গাল জলজল করছে, চোখে ঝিলিক খেলছে। তাইতার ইশারা পেয়ে দলের একেবারে শেষ মাথায় ওর সাথে যোগ দিল সে। নিচু কণ্ঠে তেনমাস ভাষায় ওর সাথে কথা বলল তাইতা। এটা কঠিন পরীক্ষা হতে যাচ্ছে, ওকে সতর্ক করে দিল। আমার ধারণা ডাইনীর ঘাঁটির দিকে যাচ্ছি আমরা। এখন তোমাকে আভা গোপন করতে হবে। আমরা মুতাঙ্গিতে না ফেরা পর্যন্ত সেভাবেই থাকতে হবে।
বুঝতে পারছি, ম্যাগাস। তোমার কথামতোই করব, জবাব দিল ফেন। প্রায় সাথে সাথে ওর অভিব্যক্তি নিরাসক্ত আর চোখজোড়া ম্লান হয়ে গেল। ওর আভা মিলিয়ে যেতে দেখল তাইতা, রঙগুলো কমতে কমতে এক সময় ইদালির বিচ্ছুরিত রঙের মতো মামুলি হয়ে গেল।
তুমি যত উৎসাহ বা উস্কানির মুখোমুখিই হও না কেন, কোনওভাবেই একে ঝলসে উঠতে দেবে না। কোন দিক থেকে তোমার উপর নজর রাখা হচ্ছে টেরও পাবে না। এক মুহূর্তের জন্যেও যেন অসাবধান না হও।
দুপুর পার হওয়ার বেশ পরে একটা খাড়া পাসঅলা উপত্যকায় প্রবেশ করল ওরা, পাহাড় সারির কেন্দ্রিয় ম্যাসিফের ভেতর ঢুকে পড়েছে ওটা। আরও এক লীগের মতো এগোনোর পর দুর্গের বাইরের প্রাচীরের কাছে পৌঁছাল ওরা। বিশাল চৌকো আগ্নেয়গিরির পাথরের ব্লক দিয়ে বানানো হয়েছে ওটা, ভিন্ন কোনও যুগের দক্ষ রাজমিস্ত্রিদের হাতে একসাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সময়ের আক্রমণে পাথরে ক্ষয় ধরেছে। গেট খোলা ছিল। হতে পারে বহু বছর কোনও শত্রুর বিরুদ্ধে ওগুলো আর বন্ধ করা হয়নি। দুর্গের ভেতরে ঢুকে বুঝতে পারল মিশর ছাড়ার পর এত মজবুত আর আঁকাল দালানকোঠা আর দেখেনি ওরা। প্রকৃতপক্ষে সবচেয়ে বড়টা কারনাকের হাথরের মন্দিরের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
ঘোড়ার দায়িত্ব নিতে অপেক্ষা করছিল সহিসরা। লাল জোব্বা পরা চাকররা একটা উন্মুক্ত প্রাঙ্গণের ছোট একটা দরজার কাছে না পৌঁছানো পর্যন্ত থামঅলা হলঘর ধরে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল ওদের। দরজা দিয়ে একটা অ্যান্টিচেম্বারে ঢুকল ওরা। একটা লম্বা টেবিলে খাবারদাবার সাজানো: বাটি ভর্তি ফল, পিঠা ও জগ ভর্তি লাল মদ, তবে পথ চলার পর আগে টাটকা হয়ে নিতে যার যার ঘরে চলে গেল ওরা। সব কিছুর আয়োজন করা হয়েছে ওদের আরামের কথা ভেবে।
ওরা হালকা খাবার শেষ করার পর কাউন্সিল পরিচারক খাস দরবারে নিয়ে যেতে এলো ওদের। কয়লা রাখা আগুনের পাত্র দিয়ে উষ্ণ রাখা হয়েছে। কামরাটাকে। পাথরের মেঝেয় গদিমোড়া মাদুর বিছানো। কে কোথায় বসবে দেখিয়ে দিয়ে ওদের বসতে বলল সে। সবার সামনে তাইতাকে বসিয়ে মেরেন ও হিলতোকে বসাল ওর পেছনে। ফেনকে বাকিদের সাথে পেছনের সারিতে পাঠিয়ে দিল। ওর প্রতি বিশেষ আগ্রহ না দেখানোয় সন্তুষ্ট বোধ করল তাইতা। চোখের কোণ দিয়ে তীর্যক দৃষ্টিতে ফেনের দিকে তাকাল ও। ইম্বালির পাশে বসেছে ও, তাইতা বুঝতে পারল দীর্ঘাঙ্গী মহিলার আভার সাথে খাপ খাওয়াতে নিজের আভা চেপে রাখার চেষ্টা করছে।
কামরার নকশা ও আসবাবের দিকে নজর ফেরাল তাইতা। জুৎসই অনুপাতের একটা বিশাল কামরা। যেখানে ও বসেছে তার ঠিক সামনেই একটা উঁচু প্ল্যাটফর্মে তিনটা টুল রাখা। বাবিলনের বিভিন্ন প্রাসাদে এই ধরনের নকশার টুল দেখেছে ও, তবে সেগুলো আইভরি বা মূল্যবান পাথরে সাজানো ছিল না। ওদের পেছনের দেয়ালটা নকশা করা চামড়ার পর্দায় ঢাকা, উঁচু ছাদ থেকে পাথরের মেঝে পর্যন্ত নেমে এসেছে ওটা, পার্থিব বিভিন্ন রঙের নকশা তাতে। এসব জরিপ করার সময় তাইতা দেখতে পেল ওগুলো নিগূঢ় বা প্রাচীন প্রতীক জাতীয় কিছু নয়, বরং স্রেফ অলঙ্কার।
পাথুরে দরজার উপর পেরেকঅলা স্যান্ডেলের আওয়াজ হলো। এক পাশের একটা দরজা গলে সশস্ত্র সৈনিকদের একটা দল ঢুকল, সার বেঁধে দাঁড়াল প্ল্যাটফর্মের ভিত্তির কাছে। বর্শার বাটগুলো মাটিতে ঠেকাল।
চামড়ার পর্দার পেছন থেকে এলো আরও তিনজন। সন্দেহের কোনও অবকাশ থাকতে পারে না যে ওরাই অলিগার্ক। হলুদ টিউনিক পরেছে ওরা, মাথায় মসৃণ রূপার মুকুট। হাবভাব রাজকীয়, জাঁকাল। ওদের আভা খতিয়ে দেখল তাইতা: বিচিত্র ও জটিল। শক্তিমান ও দৃঢ় চরিত্রের লোক ওরা, তবে নীল জোব্বাঅলা লোকটাই সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। মাঝখানের টুলে বসেছে সে। তার চরিত্রে গভীরতা আর দ্যোতনা রয়েছে, কিছু কিছু বিভ্রান্তিকর ও অস্বস্তিকর বোধ হলো তাইতার কাছে।
লোকটা ওদের শান্ত থাকার ইঙ্গিত করল। সোজা হলো তাই।
শুভেচ্ছা, ম্যাগাস গালালার তাইতা। চাঁদের পাহাড়ের দেশ জাররিতে আপনাকে স্বাগত জানাই, বলল নীল জোব্বাঅলা নেতা।
শুভেচ্ছা, জাররির সুপ্রিম কাউন্সিলের অলিগার্ক লর্ড আকের, জবাব দিল তাইতা।
চোখ পিটপিট করে মাথা কাত করল আকের। আপনি আমাকে চেনেন?
তোমার দাদাকে ভালো চিনতাম, ব্যাখ্যা করল তাইতা। শেষবার যখন তাকে দেখি, তোমার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল সে, অবশ্য তোমার চেহারা পুরোপুরি তার আদলেই তৈরি।
তাহলে আপনার সম্পর্কে যা যা শুনেছি তার বেশির ভাগই ঠিক। আপনি একজন দীর্ঘায়ু ও মোহন্ত, স্বীকার গেল আকের। আমাদের সমাজে আপনি উজ্জ্বল অবদান রাখতে পারবেন। আপনি কি এবার দয়া করে আপনার সঙ্গীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবেন, যাদের আমরা সেভাবে চিনি না?
