কী সুন্দর সব মেয়ে, মন্তব্য করল মেরেন। একটাও কুৎসিত নেই।
অচিরেই চারণভূমি এত সবুজ হওয়ার কারণ জানতে পেল ওরা। সহসা মেঘের ভারি পর্দার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেল বরফ ঢাকা আগ্নেয়গিরির চূড়া-ত্রয়ী। ফিরে এসে তাইতাকে ওনকা বলল, আপনাদের কেইপ পরতে হবে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই বৃষ্টি নামবে।
এই সময় রোজ বিকেলে এখানে বৃষ্টি হয়, ঘনায়মান মেঘের দিকে ইঙ্গিত করল সে। জাররিকে ঘিরে রাখা ওই তিন চূড়ার বেশ কটা নাম রয়েছে: তার একটা হলো বৃষ্টিদাতা। এই দেশের এত সমৃদ্ধ হওয়ার কারণ ওগুলোই। সে কথা শেষ করামাত্র কেঁপে এলো বৃষ্টি, কেইপ থাকা সত্ত্বেও একেবারে চামড়া পর্যন্ত ভিজিয়ে কাদা করে দিল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ভেতর একপাশে সরে গেল মেঘ। ফের দেখা দিল সূর্য। পুরো এলাকা ধুয়ে পরিষ্কার, টাটকা হয়ে উঠল। গাছের পাতা ঝিলিক মারছে, মাটি থেকে উন্নত ধুরার গন্ধ উঠে আসছে।
রাস্তার একটা বাকে পৌঁছুল ওরা। বাম দিকের পথ বেছে নিল দাসদের সারিটা। ওরা দূরে চলে যাবার পর তাইতা শুনতে পেল পাহারাদারদের এক সার্জেন্ট বলছ, ইন্দেব্বির দুটো খনিতে ওদের ভীষণ দরকার হয়ে পড়েছে।
ডানদিকের পথ ধরে এগিয়ে চলল দলের বাকি অংশ। বিভিন্ন সময়ের বিরতিতে সৈনিকরা কর্নেল তিনাতকে স্যালুট করতে আসছে, তারপর কলাম ছেড়ে বিভিন্ন দিকে যার যার বাড়ির খামারের পথ ধরছে। শেষ পর্যন্ত কয়েকজন এসকর্টসহ তিনাত ও ওনকাই রইল ওদের সাথে। শেষ বিকেলের দিকে একটা হালকা ঢালে উঠে এলো ওরা, নিচে সবুজ গাছপালা ও চারণভূমির মাঝখানে আরেকটা ছোট গ্রাম দেখতে পেল।
এটা মুতাঙ্গি, তাইতাকে বলল তিনাত। স্থানীয় বাজার শহর ও দরবার। আপাতত এটাই আপনাদের আবাস। আপনার জন্যে বাড়ি বেছে রাখা হয়েছে। আমি নিশ্চিত আরামদায়ক বলেই আবিষ্কার করবেন আপনি। আগেও কথাটা শুনেছেন জাররিতে সম্মানিত মেহমান আপনি।
ওদের স্বাগত জানাতে খোদ ম্যাজিস্ট্রাট এসে হাজির হলো। মাঝবয়সী লোকটার নাম বিলতো। তার লম্বা দাড়িতে রূপালি ছোঁয়া; তবে মানুষটা ঋজু, শক্তিশালী। চোখজোড়া স্থির, মুখে উষ্ণ হাসি। অন্তর্চক্ষু দিয়ে তাকে দেখে তাইতা বুঝতে পারল লোকটা সৎ ও সদিচ্ছাপ্রবণ, কিন্তু কর্নেল তিনাত আনকুরের মতোই খুশি বা সন্তুষ্ট নয়। মহা সম্মানের সাথে তাইতাকে স্বাগত জানালেও অদ্ভুত দৃষ্টিতে দেখতে লাগল। যেন ওর কাছ থেকে একটা কিছু আশা করছে। তার স্ত্রীদের একজন হিলতো, নাকোন্তো ও ইম্বালিসহ বাকিদের গ্রামের দূর প্রান্তের কাছে একটা সুবৃহৎ পাথুরে বাড়িতে নিয়ে গেল। ওদের সেবা করতে দাসীরা অপেক্ষা করছিল সেখানে। তাইতা, ফেন ও মেরেনকে রাস্তার উল্টো দিকের একটা অপেক্ষাকৃত বড় বাড়িতে নিয়ে গেল বিলতো। আশা করি আপনাদের আরামের জন্যে প্রয়োজনীয় সবই পাবেন। বিশ্রাম নিন, তরতাজা হয়ে নিন। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই অলিগার্কদের পরিষদ আপনাদের নিতে খবর পাঠাবে। তার আগে পর্যন্ত আমিই আপনাদের মেজবান। আপনাদের যেকোনও নির্দেশ মানতে প্রস্তুত। যাবার আগে অস্থির অনুসন্ধানী চোখে ফের তাইতার দিকে তাকাল বিলতো। কিন্তু আর কিছু বলল না। ওরা বাড়িতে ঢুকলে একজন প্রধান পরিচারক আর পাঁচজন দাস স্বাগত জানাতে লাইন ধরে দাঁড়াল। কামরাগুলো বিশাল, হাওয়াখেলা, কিন্তু জানালাগুলো চামড়ার পর্দায় ঢেকে রাখা যায়, মূল কামরাগুলোয় উন্মুক্ত হার্থ রয়েছে, ওখানে আগে থেকেই আগুন জ্বলছে। সূর্য তখনও দিগন্তের উপরে থাকলেও হাওয়ায় শীতল স্পর্শ, সুতরাং সূর্য ডুবে যাওয়ার পর এই আগুন কাজে আসবে। টাটকা পোশাক ও নতুন স্যান্ডেল সাজিয়ে রাখা ছিল ওদের জন্যে। গোসলের জন্যে গরম পানি এনে দিল দাসরা। তেলের কুপির আলোয় সন্ধ্যার খাবার পরিবেশন করা হলো, বুনোশুয়োরের মাংস দিয়ে রান্না করা স্বাদু স্টু তেজি লাল মদের সাথে খাওয়া হলো।
যাত্রার ধকল ওদের কতখানি ক্লান্ত করে তুলেছিল এর আগে পর্যন্ত টের পায়নি ওরা। চোখে জ্বালা করছিল মেরেনের, চোখের কোটরে জলপাই তেল ও আরামদায়ক গুল্মের উষ্ণ মলম লাগিয়ে দিল, তাইতা, তারপর লাল শেপেনের একটা ডোজ খাওয়াল।
পরদিন সকালে অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমাল ওরা। মেরেনের চোখের উন্নতি হলেও এখনও ব্যথা করছে।
নাশতার পর ওদের গ্রাম ঘোরাতে নিয়ে গেল বিলতো। গ্রাম নিয়ে তার ভীষণ গর্ব। লোকজনের জীবন যাপনের ধারা ব্যাখ্যা করল সে। নেতাদের সাথে তাইতার পরিচয় করিয়ে দিল। তাইতা লক্ষ করল মূলত ওরা সৎ ও জটিলতা মুক্ত। বিলতো আর কর্নেল তিনাতের মতো ওদের মনস্তত্বে কোনও ধরনের দুর্বোধ্যতা খুঁজে পাবে বলে আশা করেছিল ও; ইয়োসের কাছাকাছি থাকাটাকে যার কারণ হিসাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, কিন্তু উল্লেখযোগ্য তেমন কিছুই নেই। কেবল মানবীয় খুচরো অহঙ্কার আর ব্যর্থতা। একজন তার স্ত্রীকে নিয়ে অসন্তুষ্ট, আরেকজন পড়শীর একটা কুড়োল চুরি করেছে বলে অপরাধবোধে ভুগছে, আর আরেকজন তার তরুণী সৎ বোনের দিকে নজর দিচ্ছে।
পঞ্চম দিন বেশ সকাল সকাল সুপ্রিম কাউন্সিলের তরফ থেকে সমন জারি করতে মুতাঙ্গিতে ফিরে এলো ক্যাপ্টেন ওনকা। ওদের এখুনি যেতে হবে, বলল সে।
*
সুপ্রিম কাউন্সিলের চেম্বারের অবস্থান দুৰ্গটা চাঁদের পাহাড়ের দিকে যাবার পথে
