কর্নেল তিনাত ফের যাত্রা শুরু করার আগে তিন দিন কেটে গেল। এবার সব রসদ ষাঁড়ের পালের পিঠে চাপানো হয়েছে। দাসদের ব্যানরাকুন থেকে বের করে লম্বা দড়িতে বাঁধা হলো। সৈন্য বাহিনী ও তাইতার দল ঘোড়ার পিঠে ক্লিফের পাদদেশে ধরে দীর্ঘ কাফেলার মতো এগোল। লীগ খানেক যাবারর পরই চুলের কাঁটার মতো বাঁক নিয়ে ঢাল বেয়ে খাড়া উঠতে শুরু করল রাস্তাটা, সংকীর্ণ হয়ে এলো। এক সময় ঢালটা মারাত্মক খাড়া হয়ে ওঠায় ঘোড়ার পিঠ থেকে নামতে বাধ্য হলো ওরা, ঘোড়া আর বোঝাই ষাড়গুলোকে সামনে বাড়াল। বন্দি দাসরা অনুসরণ করল ওদের।
ক্লিফের মাঝামাঝি উচ্চতায় ওঠার পর একটা জায়গায় হাজির হলো ওরা যেখানে একটা সংকীর্ণ দড়ির সেতু চলে গেছে একটা গভীর গোর্জের উপর দিয়ে। গোর্জ পার হওয়ার দায়িত্ব নিল ক্যাপ্টেন ওনকা, একবারে নাজুক কাঠামোটার উপর দিয়ে প্যাক অ্যানিমেল ও মানুষের একটা ছোট দলকে পার হওয়ার অনুমতি দিল সে। এমনকি সীমিত ওজন সত্ত্বেও সেতুটা ভীতিকরভাবে দোল খেতে শুরু করল। ক্যরাভান গোর্জ পার হতে হতে মধ্যাহ্ন পার হয়ে গেল।
এটাই ক্লিফর চূড়ায় যাবার একমাত্র রাস্তা? ওনকাকে জিজ্ঞেস করল মেরেন।
চল্লিশ লীগ দূরে দক্ষিণে ঢাল বেয়ে উঠে যাওয়া আরেকটা সহজ পথ আছে, কিন্তু তাতে যেতে আরও কয়েকদিন বেশি সময় লাগে।
শূন্যতার ওপারে গিয়ে নিচে তাকাল ওরা, সামনের দৃশ্য যেন গোটা পৃথিবীকে ধারণ করেছে বলে মনে হলো। উঁচু থেকে কালো সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে যাওয়া নদীঅলা সোনালি প্রান্তর, দূরের পাহাড় আর সবুজ বন দেখতে পাচ্ছে। অবশেষে ধোঁয়াশাচ্ছন্ন দিগন্ত, বিশাল নালুবালের জলধারা গলিত ধাতুর মতো ঝিলিক মারছে-ওটার তীর ধরেই পাল তুলে এসেছে ওরা।
অবশেষে জাররির প্রবেশ পথ কিতানগালে গ্যাপ নামে পরিচিত পাস পাহারা দিতে বসানো রিজের দুর্গে পৌঁছাল ওরা। ওরা যখন বাইরে শিবির গাড়ল তখন আঁধার মিলিয়েছে। রাতে বৃষ্টি হলেও সকাল নাগাদ সূর্য ফের দরাজ আলো বিলোতে শুরু করল। আশ্রয়ের ভেতর থেকে বাইরে তাকিয়ে তাইতা ও ফেন এমন একটা দৃশ্য দেখল যা ওদের এতদিন পর্যন্ত প্রত্যক্ষ করা সমস্ত দৃশ্য মামুলি ব্যাপারে পরিণত করল। ওদের নিচে বিছিয়ে আছে এক বিশাল মালভূমি, দূর দিগন্তে মিলিয়ে গেছে। মালভূমি বরাবর মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে উঁচু উঁচু পাহাড়সারি, নির্ঘাৎ দেবতারের আবাস যেন। তিনটা মূল চূড়া পূর্ণিমার চাঁদের বায়বীয় আলোকচ্ছটায় চকচক করছে। মেরেন ও তাইতা খোরাশান রাজপথের পাহাড়চূড়ার ভেতর দিয়ে পথ চলেছে, কিন্তু এর আগে কখনও বরফ দেখেনি ফেন। এই অসাধারণ দৃশ্য দেখে রীতিমতো বাকহারা হয়ে গেল ও। অবশেষে ভাষা খুঁজে পেয়ে বলে উঠল: দেখ! জ্বলন্ত পাহাড়, চিৎকার করে বলল ও।
চকচকে পাহাড়চূড়াগুলো থেকে ধোয়ার রূপালি মেঘ বের হয়ে আসছে।
আপনি একক আগ্নেয়গিরি খোঁজ করছিলেন, ম্যাগাস, মৃদু কণ্ঠে বলল মেরেন, কিন্তু তিনটা পেয়ে গেছেন। ঘুরে পাসের ওধারে দূরের নালুবালে হ্রদের ঝিলিকের দিকে ইশারা করল সে। আগুন, পানি আর মাটি…
…কিন্তু এসবরেই প্রভু হচ্ছে আগুন, ইয়োসের মন্ত্র শেষ করল তাইতা। নির্ঘাৎ ওটাই ডাইনীর ঘাঁটি। ওর পা কাঁপছে, আবেগে ভেসে যাচ্ছে ও। এখানে পৌঁছতে অনেক পথ পাড়ি দিয়েছে ওরা, অনেক কষ্ট সয়েছে। পাজোড়া ওর শরীরের ভার বহন করার মতো একটা জায়গা খুঁজে নিয়ে বসতে হবে। দৃশ্যের দিকে নজর রাখার মতো জুৎসই একটা জায়গা পেয়ে গেল ও। আবেগের ভাগ নিতে ওর পাশে পাথরে বসল ফেন।
অবশেষে কাফেলার সামনে থেকে ওদের খোঁজে ফিরে এলো ক্যাপ্টেন ওনকা। এখানে আর দেরি করতে পারবেন না। আমাদের এগোতে হবে।
এবার বেশ সহজভাবে নিচে নেমে গেছে রাস্তাটা। ঘোড়ায় চেপে পাদদেশ বরাবর নিচে নেমে মালভূমিতে পৌঁছাল ওরা। দিনের বাকি অংশ এক মুগ্ধকর প্রান্তরের উপর দিয়ে পাহাড়ের দিকে এগিয়ে চলল। হ্রদ থেকে যথে উঁচুতে উঠে এসেছে এখন, বন আর মরুপ্রান্তর এর মিষ্টি উদার ভূখণ্ডে এসে গেছে যেন। প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে দেহ যেন উদ্দীপ্ত হয়ে উঠছে, পরিষ্কার করে তুলছে মন। পাহাড় থেকে এসেছে পরিষ্কার জলের ধারা। সোনালি ছাউনিঅলা পাথুরে কটেজ আর খামার পার হয়ে এলো ওরা। ওগুলোর চারপাশে আঙুর আর জলপাইয়ের বাগান। নিপূণভাবে যত্ন নেওয়া আঙুর বাগিচায় পাকা আঙুর টসটস করছে। ক্ষেতে ধূরার চাষ করা হয়েছে, সজি ক্ষেতে তরমুজ, সিম, ডাল, কাঁচা-পাকা মরিচ, কুমড়ো ও অন্যান্য সজি রয়েছে যেগুলো চিনতে পারল না তাই। চারণভূমিগুলো সবুজ, গরুবাছুর, ছাগল চরে বেড়াচ্ছে। মোটাসোটা শুয়োর ঘুরে বেড়াচ্ছে বনে। নদীর পুকুরে সাঁতার কাটছে হাঁস, রাজহাঁস; প্রত্যেকটা খামারের উঠানে আঁচড়ে বেড়াচ্ছে মুরগির দল।
গোটা সফরে খুব কমই এমন দেশের দেখা পেয়েছি আমরা, বলল মেরেন।
ওরা এগিয়ে যাবার সময় কৃষক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা শরবত ও লাল মদের বাটি নিয়ে স্বাগত জানাতে এলো। দুই রাজ্যের টানে মিশরিয় ভাষায় কথা বলছে। সবাই পুষ্টিকর খাবার খেয়ে স্বাস্থ্যবান, পরনে ভালো চামড়া ও লিনেনের পোশাক। বাচ্চাদের তাগড়া মনে হচ্ছে। অবশ্য বেশ ঠাণ্ডা দেখাচ্ছে। মেয়েরা গোলাপি গালের, ব্যবহার ভালো।
