কয়েক লীগের মধ্যেই নদীর তীর বরাবর গড়ে ওঠা বড়সড় একটা বসতির কাছে পৌঁছে গেল। এখানে ঢালে অসমাপ্ত খোলের দুটো বিশাল আকারের জাহাজ পড়ে আছে। ওগুলোর উপর গিজগিজ করছে শ্রমিকের দল। ইশারায় ওদের তত্ত্ববধানকারীর দিকে মেরেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করল তাইতা। এখানেই জাহাজের বিদেশী নকশার কারণ বোঝা যায়। নিশ্চয়ই এই ইয়ার্ডেই সব বানানো হয়েছে, যারা বানিয়েছে তারা নিঃসন্দেহে সিন্ধু নদের ওপাশের কোনও দেশ থেকে আসা।
কীভাবে এখানে এলো ওরা, নিজ দেশ থেকে এত দূরে? জানতে চাইল মেরেন।
এখানে এমন কিছু আছে যা বাগানের ফুল মৌমাছিকে আকর্ষণ করার মতো যোগ্য লোকদের টেনে আনে।
আমরাও কি মৌমাছি, ম্যাগাস? আমাদেরও কি একই আকর্ষণ টেনে নিয়ে চলেছে?
সবিস্ময়ের ওর দিকে তাকাল মেরেন। মেরেনের পক্ষে এটা অস্বাভাবিক গভীর চিন্তা। ফারাওকে দেওয়া পবিত্র শপথ রক্ষা করতে এখানে এসেছি আমরা, ওকে মনে করিয়ে দিল তাইতা। তবে এসেই যখন পড়েছি, খুব সতর্ক থাকতে হবে আমাদের। কিছুতেই অসংখ্য জাররিয়কে যেমন মনে হচ্ছে সেভাবে স্বাপ্নিক ও বিলাসি হয়ে পড়া চলবে না।
নদীর উজানে এগিয়ে চলল নৌবহর। কয়েক দিনের মধ্যেই নদীর এপার থেকে ওপার পর্যন্ত রুদ্ধ করে রাখা শাদা পানির প্রথম জলপ্রপাতের দেখা মিলল। তিনাত ও ওর লোকরা তাতে দমল না, কারণ জলধারার পায়ের কাছে আরেকটা ছোট গ্রাম রয়েছে, সেটার ওপাশে বিশাল গবাদি পশুর খোয়াড়, কুঁজঅলা ষাড়ের পাল রয়েছে এখানে।
তীরে নেমে এলো যাত্রী, ঘোড়া এবং দাসরা। কেবল ক্রুদের জাহাজে রেখে পাকানো লিয়ানার তৈরি কাছি দিয়ে ষাঁড়ের পালের সাথে বেঁধে টেনে দ্রুত গতির পানির শু্যট দিয়ে তুলে আনা হলো ওগুলো। তীরের মানুষ ও পশু জলপ্রপাতের পাশ দিয়ে উঠে যাওয়া পাহাড় বেয়ে উঠে উপরের জমিনে পৌঁছাল। জলপ্রপাতের উপরে নদী গভীর, প্রশান্ত; নোঙর ফেলে হালকাভাবে আগে বাড়ল গালিগুলো। আবার জাহাজে চড়ল সবাই। পরবর্তী জলপ্রপাতের কাছে না পৌঁছানো পর্যন্ত যাত্রা অব্যাহত রাখল, সেখানে ফের একই কৌশলের পুনরাবৃত্তি ঘটল।
তিনবার এভাবে খাড়া জলপ্রপাতের কাছে পৌঁছে জাহাজ টেনে উপরে তোলা সম্ভব নয়। মিশরিয় এঞ্জিনিয়ারদের প্রতিভা বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা অতিক্রমের ক্ষেত্রে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে: জলপ্রপাত ঘেঁষে আঁকাবাঁকা একটা খাল খনন করা হয়েছে, ওগুলোর প্রত্যেক প্রান্তে তালা দেওয়া, জাহাজকে পরের স্তরে যাবার সুযোগ করে দিতে কাঠের গেট আছে তাতে। জলের মই বেয়ে ফ্লোটিলাগুলো উপরে তুলতে অনেক দিন আর বেশ কঠোর খাটুনি গেল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আরও একবার গভীর প্রশান্ত জলধারায় পৌঁছুল ওরা।
হ্রদ ছাড়ার পর থেকে পার হয়ে আসা এলাকা এর অনন্য বৈচিত্র্যে মনোমুগ্ধকর ছিল। ওরা কিতানগালে ঢোকার পর একশো বা তারও বেশি লীগ দূরত্ব গভীর বনের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেছে নদীটা। মাথার উপরে মিশে গেছে ডালপালা, দুটো গাছকে একই জাতের মনে হচ্ছে না। লিয়ানা, অন্যান্য লতা আর ফুলে আর পরগাছায় ভরে আছে ওগুলো। একবারে মগডালের কাছে শোরগোল করছে বানরের দল। নদীর উপর হেলে পড়া ডালে চকচকে-শরীর গিরগিটি রোদ পোহাচ্ছে। নৌকার আগমন টের পেয়ে হাওয়ায় ভেসে ঝপাত করে পানিতে পড়ল ওরা, ভিজিয়ে দিল বৈঠাঅলাদের।
রাতে তীরে নোঙর করার পর, বিশাল গাছের গোড়ায় নৌকার দড়ি বেঁধে রাখা হলো। অদৃশ্য পশুর দলের চিৎকার আর গুলোকে শিকার করা শিকারী জানোয়ারের গর্জনে ভরে উঠল রাতের অন্ধকার। মাঝিদের কেউ কেউ ব্রোঞ্জের হুকে নাড়িভুড়ির টোপ লাগিয়ে পানিতে বঁড়শি পেতে রাখল। টোপ গিলে নেওয়া একটা মাগুড় মাছ তুলতে গিয়ে রীতিমতো লড়াই করল তিনজন।
জলপ্রপাত ধরে উপরে ওঠার সাথে সাথে ধীরে ধীরে তীর বরাবর জন্মানো গাছপালা বদলে যেতে শুরু করল। গা পোড়ানো গরম কমে ঠাণ্ডা হয়ে এলো, বাতাস হয়ে এলো কোমল। শেষ জল-মই পার হওয়ার পর ঘেসো মাঠ আর পাতাহীন ও কাটাঅলা, কোমল, পালকের মতো আগাছায় ঢাকা বিশাল কালো কাণ্ড ও গাঢ় ডালপালাঅলা নানা জাতের বাবলা গাছে ভর্তি উন্মুক্ত বনের এক নির্মল ল্যান্ডস্কেপে নিজেদের আবিষ্কার করল ওরা। সবচেয়ে লম্বা গাছগুলো উঁচু ডালে তঙুরের মতো ঝুলন্ত ল্যাভেন্ডার ফলে সাজানো।
এটা মাঠ ভরে রাখা মিষ্টি ঘাস আর কিতানগালের মূল ধারায় এসে মেলা কয়েক ডযেন জলধারায় ভর্তি প্রয়োজনীয় জলের উর্বর দেশ। অসংখ্য পশুতে গিজগিজ করছে সমতল, চরে বেড়াচ্ছে ওরা। এমন একটা দিন গেল না যেদিন ওরা সিংহের দলকে খোলা প্রান্তরে শিকার বা বিশ্রাম নিতে দেখেনি। রাতে ওদের বজ্রনির্ঘোষ গর্জন রীতিমতো আত্মারাম খাঁচাছড়া করে দেয়। যতবার ওই ওদের গর্জন শুনুক না কেন, প্রতিবারই শ্রোতার স্নায়ু কেঁপে ওঠে, বেড়ে ওঠে হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন।
অবশেষে একটা দীর্ঘ ঢাল মাথা তুলে দাঁড়ালে দিগন্তে। কাছাকাছি যাবার পরপরই একধরনের বিড়বিড়ানি সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠল ওরা। নদীর আরেকটা বাঁক ঘুরে এসে সামনে আরেকটা বিশাল জলপ্রপাত দেখতে পেল, বজ্রের মতো আওয়াজ তুলে একটা ক্লিফের মাথা থেকে নিচের পাক খাওয়া সবুজ পুকুরে পড়ছে শাদা পানি।
ওটাকে ঘিরে রাখা সৈকতে নৌকা তীরে টেনে তুলতে ষাঁড়ের পাল তৈরি রয়েছে। আরও একবার নামল ওরা, তবে এটাই শেষবার। মানুষের বানানো কোনও যন্ত্রের পক্ষে জাহাজগুলোকে এই ক্লিফের উপরে টেনে তোলা সম্ভব নয়। নদীর তীরের বসতিতে অফিসার ও তাইতার দলের থাকার ব্যবস্থা হিসাবে অতিথিভবন রয়েছে। বাকি লোকজন, ঘোড়া ও মালসামান তীরে নিয়ে যাওয়া হলো। ব্যারাকুনে আটকে রাখা হলো বাসমারা দাসদের।
