শিকারীদের ক্ষীণ চিঙ্কারে বাধা পেল ওরা। অনেক সামনে ওর তীরের উপযুক্ত একটা শিকার কোণঠাসা করেছে মেরেন। কোণঠাসা হয়ে অগ্নিনিঃশ্বাসঅলা ড্রাগনের মতো ফুঁসছে বিরল দানবটা, নিপীড়নকারীদের দিকে শঙ্কিত কিন্তু হিংস্র দৌড় শুরু করেছে। বিরাট খুরের ঘায়ে বালি উড়ছে, এপাশ পোশ ঘোরাচ্ছে শিংঅলা নাকটা, শুয়োরের চোখের মতো জ্বলজ্বল করছে চোখজোড়া। প্রায় এক মানুষ সমান লম্বা। শিংটা অবিরাম গাছের কাণ্ড আর উইপোকার ঢিপিতে শান দেওয়ায় চকচক করছে। ঝিলিক মারছে তলোয়ারের মতো।
এইবার ফেনকে দেখল তাইতা। গলার কাছে কী যেন একটা দলা পাকিয়ে উঠল ওর। জানোরটার সাথে খেলছে ও। নিজের ঘোড়দৌড় ও ওয়ার্লউইন্ডের গতির উপর স্পষ্ট আস্থা থাকায় পশুটার নাকের সামনে তীর্যক রেখা তৈরি করে পার হয়ে যাচ্ছে। ধাওয়া করতে আহবান করছে ওটাকে। উইন্ডম্মেকের পেটে গোড়ালি ছোঁয়াল তাইতা, ওকে বাধা দিতে ছুটে গেল। সাথে সাথে সরাসরি জরুরি হাওয়াই বার্তা পাঠাল ওর কাছে। বুঝতে পারল দক্ষ তলোয়ারবিদের মতোই সেটাকে ঠেকাল ফেন, তারপর ওর কাছ থেকে মন বিচ্ছিন্ন করে নিল সে। তেতে উঠল তাইতার রাগ ও উদ্বেগ। পিচ্চি শয়তান! বিড়বিড় করে বলে উঠল।
ঠিক সেই মুহূর্তে ওয়ার্লউইন্ডের চকচকে ধূসর চামড়ার দিকে নজর গেল পশুটার, ফেনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করল সে। ঘোঁৎ-ঘোঁৎ গর্জন ছেড়ে বিশাল খুরে জমিনে আঘাত করে তেড়ে গেল ওদের দিকে। কোল্টের ঘাড় স্পর্শ করল ফেন, পূর্ণ গতিতে ছুটতে শুরু করল ওরা। শিং ও ওয়ার্লউইন্ডের লেজের ভেতরে দূরত্ব বোঝার জন্যে ঘোড়ার পিঠের উপর বেঁকে পেছনে তাকাল ও। আরেকেটু সামনে এগোনোর পর দূরত্ব কমিয়ে আনতে ওয়ার্লউইন্ডকে থামাল ও। পশুটাকে আগে বাড়ার তাগিদ দিল।
ফেনের নিরাপত্তার কথা ভেবে শঙ্কিত হলেও ওর দক্ষতা ও সাহসের তারিফ না করে পারল না তাই। মেরেনের একদম কাছে নিয়ে এলো সে জানোয়ারটাকে। পর পর তিনটা তীর ছুঁড়ল মেরেন, উড়ে গিয়ে ওটার কাঁধের পেছনে পুরু চামড়ায় গোড়া অবধি গেঁথে গেল ওগুলো। টলে উঠল পশুটা। মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসতে দেখল তাইতা। মেরেনের ছোঁড়া অন্তত একটা তীর ওটার ফুসফুস ভেদ করেছে। জানোয়াটাকে টেনে আনতে লাগল ফেন। দক্ষতার সাথে বৃত্তাকারে ঘুরিয়ে শরীরের অন্যদিক মেরেনের তীরের নাগালে নিয়ে আসছে। একের পর এক তীর ছুঁড়ে চলল মেরেন। গভীরে গিয়ে বিঁধতে লাগল ওগুলো, হৃৎপিণ্ড আর ফুসফুস ছিন্নভন্ন করে দিচ্ছে।
ফুসুফস রক্তে ভরে ওঠায় জানোয়ারটার গতি শ্লথ হয়ে এসেছে। মৃত্যুর আলস্য শক্তিমান পা পাথরে পরিণত করেছে। নিচের দিকে মাথা ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সময় ভোলা মুখ ও নাক দিয়ে ফোয়ারার মতো রক্ত বের হতে লাগল ওটার। এক পাশ থেকে ছুটে গেল নাকোন্তো, কানের পাশ দিয়ে সেঁধিয়ে দিল ওর বর্শাটা। মগজের সন্ধানে বাঁকা করে দিল ফলাটা। প্রবল শব্দে লুটিয়ে পড়ল লাশটা, গোটা জমিন কেঁপে উঠল, ধুলোর মেঘ উড়ল।
তাইতা ওদের কাছে পৌঁছুতে পৌঁছুতে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে লাশ ঘিরে দাঁড়িয়েছে সবাই। উত্তেজনায় নাচছে ফেন, বাকিরা হেসে শেষ, হাততালি দিচ্ছে। অবাধ্যতার জন্যে ফেনকে অপমান করে গালিতে ফেরত পাঠাতে দৃঢ়পতিজ্ঞ ছিল তাইতা। কিন্তু পাথরের মতো চেহারা করে ও যখন ঘোড়ার পিঠ থেকে নামলো, ফেন ছুটে এলো ওর কাছে, লাফিয়ে ওর গলা জড়িয়ে ধরল।
তাইতা, তুমি দেখেছে সবটা? দারুণ না? তোমার কি ওয়ার্লউইন্ড আর আমার জন্যে গর্ব হচ্ছে না? তারপর ঠোঁটের কাছে উঠে আসা কর্কশ কণ্ঠে বকাঝকা শুরু করার আগেই ওর কানে ঠোঁট ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল, তুমি আমার সাথে এত ভালো আর সুন্দর আচরণ করো, আমি তোমাকে ভালোবাসি, প্রিয় তাইতা।
রাগ মুছে যাচ্ছে, টের পেল তাইতা, পরিহাসের সাথে নিজেকে জিজ্ঞেস করল, কে কাকে শিক্ষা দিচ্ছে? অন্য জীবনে এই কৌশল ওর পছন্দ ছিল। এখনও ওর বিরুদ্ধে আমি অসহায়।
*
চল্লিশটারও বেশি বিশাল পশু হত্যা করেছে শিকারীরা, ফলে সবগুলো লাশের Vছাল খসিয়ে মাংস কেটে ঝলসে বার্জে তুলতে বেশ কয়েক দিন লাগল। কেবল তারপরেই গালিতে চেপে আবার দক্ষিণে যাত্রা শুরু করতে পারল ওরা। নিজের অফিসারদের সাথে যোগ দেওয়ার পর ফের বিচ্ছিন্ন, দুর্গম লোকে পরিণত হয়েছে তিনাত। অন্তর্চক্ষু দিয়ে ওকে পরখ করতে গিয়ে তাইতা বুঝতে পারল ওর সাথে আলাপের সময় বলে দেওয়া বিষয়গুলোর জন্যে নিজেকে দোষারোপ করছে সে। গোপনীয়তা বজায় রাখার ব্যাপারে নিজের অক্ষমতায় এখন ভীত হয়ে উঠেছে।
উত্তরে ঘুরে গেছে বাতাস, সজীব হয়ে উঠেছে। বৈঠা তুলে রেখে বিরাট তেকোনো পাল উড়িয়েছে গালিগুলো। ওদের গলুইয়ের নিচের পাক খাচ্ছে শাদা পানি, ডানদিকে দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছে কিনারা। শিকারের পর পঞ্চম সকালে আরেকটা শাখার মুখে পৌঁছাল ওরা। পশ্চিমের উঁচু এলাকা থেকে নেমে আসা শাখাটা বিপুল পরিমাণ পানি ঢেলে দিচ্ছে হ্রদে। ক্রুদের নিজেদের ভেতর আলাপ করতে দেখল তাইতা, বারবার উচ্চারিত হলো কিতানগালে নামটা। নিঃসন্দেহে এটাই ওদের সামনের নদীর নাম। পাল নামিয়ে আবার বৈঠা তুলে নেওয়ার হুকুম দিল ক্যাপ্টেন, তাতে অবাক হলো না ও। ওদের গালি ফ্লোটিলাকে কিতানগালেয় নিয়ে এলো, প্রবল স্রোতের বিরুদ্ধে এগিয়ে চলল।
