মনের সাহায্যে ফেনের কাছে পৌঁছাল তাইতা, সচেতন হয়ে উঠতে দেখল ওকে। তেনমাস ভাষায় বার্তা পাঠাল ও। মেরেনের কাছে যাও। তিনাতের সাথে একা থাকতে দাও আমাকে।
সাথে সাথে ওর দিকে তাকিয়ে হাসল ফেন। আমাকে ক্ষমা করবে, ম্যাগাস, মিষ্টি করে বলল সে। খানিকটা পথ মেরেনের সাথে যাব আমি। আমাকে একটা তীর বানিয়ে দেবে বলেছিল ও। হাঁটুর ধাক্কায় দুলকি চালে ওয়ার্লউইন্ডকে ছোটাল ও। তাইতার সাথে একা রেখে গেল তিনাতকে।
নিঃশব্দে এগিয়ে চলল ওরা। অবশেষে তাইতা বলল, ফারাওর সাথে আমার কথা থেকে বুঝতে পেরেছি অনেক বছর আগে মিশর ছাড়ার সময় নীল মাতার উৎস পর্যন্ত যাওয়ার নির্দেশ ছিল ফারাও নেফার সেতির, তারপর অনুসন্ধানের ফল জানাতে কারনাকে ফিরে যাবার কথা ছিল তোমাদের।
ওর দিকে তাকাল তিনাত। জবাব দিল না।
সূক্ষ্মভাবে বিরতি দিল তাইতা, তারপর খেই ধরল। ফিরে গিয়ে তাঁর কাছে তোমাদের সাফল্যের সংবাদ দিয়ে যোগ্যতা অনুযায়ী পুরস্কার দাবি করোনি দেখে খুবই অবাক লাগছে। আমরা মিশর থেকে নাটকীয়ভাবে উল্টোপথে যাচ্ছি দেখে বিভ্রান্ত বোধ করছি আমি।
খানিকক্ষণ চুপ থাকল তিনাত। তারপর বলল, ফারাও নেফার সেতি এখন আর আমার শাসক নন। মিশর আর এখন আমার বাসভূমি নয়। আমি ও আমার লোকজন আরও অনেক সুন্দর, সমৃদ্ধ ও আশীর্বাদপুষ্ট একটা দেশ পেয়েছি, ঠিক যেমন মিশর এখন অভিশপ্ত।
তোমার মতো পদমর্যাদার একজন অফিসার দেশপ্রেমিকের দায়িত্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারে, কোনওদিনই বিশ্বাস হতো না আমার, বলল তাইতা।
আমিই একমাত্র মিশরিয় নই যে একাজ করেছে। অনেক বছর আগে আরও একজন এমন করেছে, এই নতুন দেশে সেই আবিষ্কার করেছে, তারপর আর মিশরে ফিরে যায়নি। রানি লস্ত্রিস একই রকম অভিযানে তাকে পাঠিয়েছিলেন, নীলের উৎসমুখ আবিষ্কারের মিশন দিয়ে। তার নাম জেনারেল লর্ড আকের।
বেশ ভালো করেই চিনতাম ওকে, বাধা দিয়ে বলল তাইতা। ভালো সৈনিক ছিল বটে, কিন্তু দুর্বোধ্য।
তাইতার দিকে তীর্যক চোখ তাকালেও ওর মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলল না সে। লর্ড আকের চাঁদের পাহাড়ের দেশের জাররি বসতির অগ্রগামী, বলল সে। তার প্রত্যক্ষ বংশধররা শক্তিশালী ও উন্নত দেশে পরিণত করেছে একে। ওদের সেবা করতে পেরে আমি সম্মানিত।
অন্তর্চক্ষু দিয়ে তাকে জরিপ করে তাই দেখল কথাটা ঠিক না। বিদেশী সরকারে সেবা করতে গিয়ে সম্মানিত বোধ করা দূরে থাক রীতিমতো মানসিক অশান্তিতে আছে তিনাত। এখন আমাদের সেখানেই নিয়ে যাচ্ছ তুমি, তাই না? জাররিতে?
আমাকে সেরকমই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ম্যাগাস, সায় দিল তিনাত।
এই দেশের রাজা কে? জানতে চাইল তাইতা।
আমাদের কোনও রাজা নেই। অভিজাত ও জ্ঞানী লোকদের একটা অলিগার্কি আমাদের শাসন করে।
তাদের বাছাই করে কে?
আপাত গুণের ভিত্তিতে মনোনীত করা হচ্ছে।
তাইতা বুঝল, মন থেকে এসব কথা বিশ্বাস করে না তিনাত। তুমিও অলিগার্কদের একজন?
না, ম্যাগাস। অভিজাত বংশে জন্ম হয়নি বলে কোনওদিনই সেই সম্মানের দাবিদার হতে পারব না। জাররিতে ইদানীং এসেছি আমি। নবাগত।
তার মানে জাররির সমাজ গোত্রভিত্তিক? জানতে চাইল তাইতা। অভিজাত, সাধারণ জনগণ আর দাস সমাজে বিভক্ত?
মোটা দাগে তাই। আবশ্য আমরা অভিবাসী হিসাবে পরিচিত, সাধারণ মানুষ না।
তোমরা জাররিয়রা কি এখনও মিশরিয় দেবদেবীদের পূজা করো?
না, ম্যাগাস, আমাদের দেবতা একজনই।
কে সে?
জানি না। কেবল ধর্মে দীক্ষাপ্রাপ্তরাই তার নাম জানে। এক দিন আমি সেই সুযোগ পাবার প্রার্থনা করি। এই বক্তব্যে নানা রকম স্ববিরোধী ধারা দেখতে পেল তাইতা: এমন কিছু আছে তিনাত মুখে বলতে পারছে না। যদিও কথাটা বলার জন্যে ওনকার নজর থেকে দূরে সরে আসতে পেরেছে।
আমাকে এই বিস্ময়কর দেশ সম্পর্কে আরও কিছু বলো, যার জন্যে তোমার মতো বিশ্বস্ত একজন লোক প্রলুব্ধ হতে পারে। কথা বলতে ওকে উৎসাহিত করল তাইতা।
এই কাজের উপযুক্ত কোনও শব্দ নেই, জবাব দিল তিনাত। কিন্তু অচিরেই পৌঁছে যাব ওখানে, নিজেই বিচার করতে পারবেন। খোলামনে কথার বলার সুযোগ পায়ে ঠেলছে সে।
কর্ণেল তিনাত, বাসমারাদের কবল থেকে আমাদের উদ্ধার করার সময় তুমি এমন কিছু বলেছিলে যাতে আমার বিশ্বাস হয়েছিল যে তোমাকে সেই স্পষ্ট উদ্দেশ্যেই পাঠানো হয়েছিল। আমার কথা ঠিক?
এরই মধ্যে অনেক কথা বলে ফেলেছি…আপনার সম্পর্কে অনেক উঁচু ধারণা রাখি আর আপনাকে অনেক সম্মান করি বলে। কিন্তু আমাকে আর জোর না করার অনুরোধ জানাতে বাধ্য হচ্ছি। আমি জানি অনেক উন্নত ও অনুসন্ধিৎসু মন আপনার, কিন্তু এমন এক দেশে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন যার ভিন্ন রীতিনীতি ও আইনকানুন রয়েছে। এই মুহূর্তে আপনি মেহমান, সুতরাং মেজবানের রীতিনীতির প্রতি সম্মান দেখালেই সবার পক্ষে ভালো হবে। এখন পুরোপুরি পিছু হটে গেছে তিনাত।
তার একটা হচ্ছে আমার সাথে জড়িত নয় এমন সব ব্যাপারে খোঁচাখুঁচি না করা।
ঠিক তাইতা, বলল তিনাত। ভদ্র সতর্কবাণী এটা। এরচেয়ে বেশি কিছু বলতে পারল না সে।
আমি সব সময় ভেবেছি যে সুবিধাজনক নীতিমালা স্বৈরাচারকে যুক্তিসঙ্গত ও প্রজাদের ভোলাতে যৌক্তিক।
বিপজ্জনক দৃষ্টিভঙ্গি, ম্যাগাস, জাররিতে থাকার সময় কথাটা গোপন রাখতে হবে আপনাকে, ম্যাগাস। ব্রোঞ্জ হেলমেটের ভাইজরের মতো মুখে কুলুপ আঁটল তিনাত। তাইতা বুঝল, ওর কাছ থেকে বেশি কিছু জানা যাবে না। তবে হতাশ হলো না ও, বরং এত কিছু জানতে পেরে অবাকই হয়েছে।
