দ্বীপের গোলকধাঁধার ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ওরা, ওখানকার গাছগুলো এত পুরু ও লম্বা যে মনে হয় মাথার উপরের নীল বাঁকানো স্বৰ্গকে ঠেস দিয়ে রেখেছে। উঁচু ডালে বানানো নীড়ে ঈগল পাখি বসে রয়েছে। ঝলমলে শাদা পালক ও বাদামী ডানার অসাধারণ সুন্দর পাখি। আকাশে ওড়ার সময় বুনো গানের মতো চিৎকার ছাড়ে, তারপর হ্রদে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠোঁটে টাটকা মাছ নিয়ে উঠে আসে।
সবগুলো সৈকতেই বিশাল বিশাল কুমীরকে রোদ পোহাতে দেখল ওরা, অগভীর পানিতে জলহস্তির জমায়েত। ওদের গোলাকার ধূসর পিঠ গ্রানিট বোল্ডারের মতোই বিশাল। ওরা আবার উন্মুক্ত জলে বের হয়ে এলে তাইতার অনুমান সত্যি প্রমাণ করে দক্ষিণে বাঁক নিল তীরটা। পৃথিবীর শেষ প্রান্তের দিকে ধেয়ে চলল ওরা। কালো মোষ, ধূসর হাতি ও বিশাল নাকের উপর শিঙঅলা শুয়োর সদৃশ জানোয়ারে ভরা অন্তহীন বনের পাশ দিয়ে পাল তুলে ভেসে চলল। এই প্রথম এই ধরনের জানোয়ার দেখছে ওরা। ওগুলোর স্কেচ এঁকে রাখল তাইতা। ওগুলোকে অলৌকিকভাবে নিখুঁত মন্তব্য করল ফেন।
আমার বন্ধু পুরোহিতরা এমন জানোয়ারের অস্তিত্ব থাকার কথা বিশ্বাস করতে চাইবে না, মন্তব্য করল তাইতা। মেরেন, ফারাওর জন্যে নাক কেটে উপহার নিয়ে যেতে একটা জানোয়ার শিকার করতে পারবে? ওদের মেজাজ মর্জি এতটাই প্রফুল্ল হয়ে উঠেছে যে সবার মনেই শেষ পর্যন্ত অনেক উত্তরের নিজ দেশে ফিরে যেতে পারবে বদ্ধমূল ধারণা জন্মাতে শুরু করেছে।
বরাবরের মতো তাইতার কথায় জানোয়ারের পিছু ধাওয়া করে লাফিয়ে পড়তে উদগ্রীব হয়ে উঠল মেরেন। আপনি তিনাত ও ক্যাপ্টেনকে দিন দুয়েকের জন্যে নোঙর ফেলতে রাজি করাতে পারলে একটা ঘোড়া আর তীর ধনুক নিয়ে তীরে নেমে যেতে পারি।
তিনাতের কাছে দীর্ঘদিন বার্জের বদ্ধ পরিবেশে থাকার পর একটু দৌড়ানোর সুযোগ পেলে ঘোড়াগুলোর উপকার হবে বলে প্রস্তাব রাখল তাইতা। আপাত তাকে বেশ আন্তরিক আবিষ্কার করল ও।
ঠিক বলেছেন, ম্যাগাস। তাছাড়া, ভালো মাংসের এমন দারুণ যোগান হাতছাড়া হতে দেওয়া যায় না। সৈনিক ও দাসদের নিয়ে অনেকগুলো পেটের ব্যবস্থা করতে হয় আমাকে।
সেদিন সন্ধ্যায় হ্রদের কিনারে একটা প্রশস্ত সমতলে এলো ওরা। বনের উন্মুক্ত জায়গাগুলো নানান শিকারে ভরা: ধূসর গণ্ডার থেকে শুরু করে সবচেয়ে ছোট আকর্ষণীয় অ্যান্টিলোপ পর্যন্ত। সমভূমি পুবে বাঁক নিয়ে আসা একটা ছোট মোহনায় দ্বিখণ্ডিত, একটা হ্রদে শেষ হয়েছে ওটা। অল্প দূরত্বের জন্যে চলাচলের উপযোগি, ফ্লোটিলার জন্যে একটা নিরাপদ নোঙরের ব্যবস্থা করেছে। ঘোড়া নামাল ওরা, পুরুষরা নদীর তীরে তাবু খাটাল। পায়ের নিচে কঠিন মাটির ছোঁয়া পেয়ে খুশি হয়ে উঠল ওরা। পরদিন সকালে ঘোড়ার পিঠে চেপে রওয়ানা হওয়ার সময় উৎসবমুখর অনুভূতি হলো ওদের। তিনাত ওর শিকারীদের মোষ শিকারের নির্দেশ দিয়ে গাভী আর বাছুর নিয়ে আসতে বলল; বুড়ো ষাঁড়ের চেয়ে ওগুলোর মাংস অনেক স্বাদু-ষাঁড়ের মাংস শক্ত ও গন্ধযুক্ত, বলতে গেলে অখাদ্য।
তামাফুপায় পাওয়া আঘাত থেকে অনেকটাই সেরে উঠেছে মেরেন ও হিলতো। নাকের ডগায় দানবীয় শিংঅলা গণ্ডারের পিছু ধাওয়ায় নেতৃত্ব দেবে ওরা। নাকোন্তো ও ফেন দর্শক হিসাবে থাকবে পেছনে। শেষ মুহূর্তে কর্নেল তিনাত এসে তাইতাকে বলল, আমি আপনার সাথে খেলাটা দেখতে যেতে চাই। আশা করি, আমার উপস্থিতিতে আপত্তি করবেন না।
অবাক হলো তাইতা। এমন একজন গগোমড়ামুখো মানুষের কাছ থেকে এমনি বন্ধুত্বপূর্ণ আগ্রহ আশা করেনি। তোমাকে সাথে পেলে বরং খুশিই হবো, কর্নেল। তুমি জানো, নাকের ডগায় শিংঅলা জানোয়ারগুলোর একটাকে ধরার চেষ্টা করছি। আমরা।
ততক্ষণে ঘোড়সওয়ারীদের বিভিন্ন দল চিৎকার ছেড়ে মোষের পাল তাড়া করে সমতলের উপর দিয়ে ছুটতে শুরু করেছে। খুব কাছে থেকে আগে বাড়ছে যাতে বর্শা চালাতে পারে। সাহসী ও দ্রুত গতির জানোয়ারগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়লে ওদের উদ্দেশ্য করে ক্রমাগত তীর ছুঁড়ে ওরা। অচিরেই তৃণভূমির উপর ছড়িয়ে পড়ল কালো লাশ। বেদিশা হয়ে সমভূমির এদিক ওদিক ছুটতে লাগল সন্ত্রস্ত পশুগুলো। শিকারীদের হাত থেকে বাঁচতে মরিয়া।
পশুর পাল ও ঘোড়সওয়ারদের বিভ্রান্ত ভীড়ে না পড়তে ও গণ্ডারগুলোকে বেছে শিকার করার মতো একটা উন্মুক্ত জায়গার খোঁজে বনের ভেতরের ফাঁকা জায়গা ছেড়ে সরে এলো মেরেন, তীর বরাবর ঘোড়া হাঁকাল। ওরা জাহাজের দৃষ্টিসীমার বাইরে না যাওয়া পর্যন্ত বাকিরা অনুসরণ করল। একসময় মাঠে ওরা ছাড়া আর কেউ রইল না। সামনে তৃণভূমির উপর বেশ কয়েকটা মাদী ও বাছুর ছড়িয়ে ছিটিয়ে অপেক্ষা করছে। তবে একটা সর্দারের শিং সংগ্রহ করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ মেরেন। ফারাওকে উপহার হিসাবে মানানসই ট্রফি।
নোঙর করা জাহাজগুলো থেকে ওদের আরও দূরে নিয়ে যাবার সাথে সাথে কর্নেল তিনাতের ভেতর ক্রম পরিবর্তন লক্ষ করল তাইতা। তার গাম্ভীর্য মিলিয়ে যাচ্ছে, এমনকি ফেনের কোনও কোনও কথায় হাসছেও। আপনার সঙ্গী বুদ্ধিমতী তরুণী, মন্তব্য করল সে। কিন্তু বিচক্ষণ তো?
তুমি যেমন বললে, তরুণী ও, এবং ঈর্ষা বা শত্রুতা থেকে মুক্ত। আর একটু শিথিল হলো তিনাত, অন্তর্চক্ষু খুলে লোকটার মানসিক অবস্থা খতিয়ে দেখল তাইতা। দ্বিধায় ভুগছে, ভাবল ও। আমার সাথে স্বাধীনভাবে কথা বলার সময় বড়কর্তাদের চোখে পড়তে চাইছে না। নিজের লোকদের কাউকে ভয় পাচ্ছে। আমি নিঃসন্দেহ, লোকটা ক্যাপ্টেন ওনকা না হয়ে পারে না। সম্ভবত নজরদারি করতে ও বড়কর্তাদের কাছে খবর দেওয়ার জন্যে পাঠানো হয়েছে তাকে। তিনাত আমাকে কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু ভয় পাচ্ছে।
