দিনের পর দিন হ্রদের তীর ঘেঁষে পশ্চিমে এগিয়ে চলল নৌবহর। তাইতার অনুরোধে ওদের ছায়া দিতে ও গোপনীয়তা বজায় রাখতে একটা পাল তুলে দিয়েছে ক্যাপ্টেন তিনাত। তিনাত ও নাবিকদের চোখের আড়ালে ফেনকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজে অগ্রগতি অর্জন করল তাইতা। দক্ষিণে দীর্ঘ যাত্রার সময় একা থাকার তেমন একটা সুযোগ ছিল না ওদের। এখন ওদের ডেকের বিচ্ছিন্ন কোণটা একাধারে আশ্রয় ও পাঠশালায় পরিণত হয়েছে। এখানে ফেনের ধারণা, মনোযোগ ও প্রবৃত্তিকে চমৎকারভাবে গড়ে তোলায় জোর দিতে পারছে ও।
ওকে নতুন নিগূঢ় শিল্পেন নতুন কোনও বৈশিষ্ট্য শেখায়নি। বরং রোজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা আগে রপ্ত করা কৌশলগুলোকেই আরও নিপূণভাবে প্রয়োগের কায়দা শেখাচ্ছে। বিশেষ করে মানসিক ইমেজ ও ভাবনার টেলিপ্যাথিক বিনিময়ের মাধ্যমে যোগাযোগের ব্যাপারে বিশেষভাবে কাজ করছে ও। কেন যেন ওর মনে হচ্ছে অদূর ভবিষ্যতের কোনও এক সময়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে ওরা। তখন এই ধরনের যোগাযোগের উপরই ওদের বাঁচামরা নির্ভর করবে। ওদের যোগাযোগ দ্রুত ও নিশ্চিত হওয়ার পর ওর আভার বিচ্ছুরণ দমনই তাইতার মূল চিন্তা হয়ে দাঁড়াল। ফেন এইসব অনুশীলন ঠিকমতো রপ্ত করেছে নিশ্চিত হওয়ার পরেই কেবল শক্তির শব্দের সম্মিলন পর্যালোচনার কাজে হাত দিতে পারল ওরা।
অনুশীলনের ঘণ্টা ও দিনগুলো এতই কষ্টসাধ্য ও ক্লান্তিকর যে মানসিক ও আধ্যাত্মিকভাবে ফুরিয়ে যাবার কথা ছিল ফেনের। প্রাচীন বিদ্যার বেলায় ও নবীশমাত্র। শরীর ও শক্তির দিক থেকে শিশু। অবশ্য, এমনকি অন্য জীবন যাপনকারী পুরোনো আত্মাকে হিসাবে ধরলেও ওর সামলে নেওয়ার ক্ষমতা বিস্মিত করল তাইতাকে। ওর শক্তি যেন ঠিক নদীর নিচে কাদায় বেঁচে থাকা ওর আত্মার প্রতীক শাপলার মতোই ওর ক্লান্তির উপর ভর করে আবার জেগে ওঠে।
তাইতা অস্পষ্ট বিষয় ছেড়ে মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া রুবি পাথর রঙের ফ্লামিঙো পাখি নিয়ে আলোচনায় নামলেই অপ্রতিভভাবে নিমেষে সিরিয়াস ছাত্র থেকে প্রাণবন্ত মেয়েতে পরিণত হতে পারে ও। রাতে ছামিয়ানার নিচে ডেকে বিছানো মাদুরে ওর কাছাকাছি ঘুমিয়ে থাকার সময় ওকে তুলে জোরে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে যেন খোদ মরণও কেড়ে নিতে না পারে।
*
গালির ক্যাপ্টেন আগাম জানান ছাড়াই হ্রদের উপর দিয়ে দমকা হাওয়া বয়ে যাওয়ার কথা বলেছে ওদের। ডুবে যাওয়া অনেক জাহাজের গল্প বলল সে, এখন হ্রদের নিচে অজানা গভীরতায় পড়ে আছে। রোজ সন্ধ্যায় পানির বিশাল বিস্ত গর জুড়ে জুড়ে রাত নামার সময় ছায়াঅলা কোনও খাড়ি বা গুহায় নোঙর ফেলছে ফ্লোটিলা। সূর্যের প্রথম রশ্মি পুব দিগন্তে আকাশের বুকে ময়ূরের লেজের মতো ফুটে ওঠার পরই আবার পাল তোলে ওগুলো, গলুই ঘুরিয়ে নেয়। মহা হ্রদের বিশালতা হতবাক করে রেখেছে তাইতাকে। তীর রেখা যেন অন্তহীন মনে হচ্ছে।
মধ্য সাগর বা ইন্ডিজের মহাসাগরের মতোই বিশাল। নাকি এর কোনও সীমাপরিসীমা নেই? ভাবল ও। অবসর মুহূর্তে ফেন আর ও প্যাপিরাসের পাতায় ম্যাপ আঁকে বা ফেলে আসা দ্বীপ ও সেগুলোর তীরে দেখা বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের উপর নোট লিখে রাখে।
হাথরের মন্দিরের ভূতাত্ত্বিক পুরোহিতের কাছে নিয়ে যাব এগুলো। ওরা এইসব গোপন ও বিস্ময়কর ব্যাপার জানে না, ফেনকে বলে তাই।
ওর সবুজ চোখে স্বপ্নিল মেঘ দেখা দিল। ওহ, ম্যাগাস, তোমার সাথে আমার আগের জীবনের দেশে ফিরতে চাই। আমাকে অনেক মূল্যবান কথা মনে করতে সাহায্য করেছ তুমি। একদিন আমাকে ওই দেশে নিয়ে যাবে না?
নিশ্চিত থাকতে পারো, কথা দিল ও।
সূর্য, চাঁদ ও অন্যান্য স্বর্গীয় বস্তুর অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে তাইতা হিসাব কষে বের করল যে হ্রদের তীর ক্রমে দক্ষিণে দিকে বাঁক নিচ্ছে। আমার বিশ্বাস, আমরা হ্রদের পশ্চিম সীমান্তে পৌঁছে গেছি, অচিরেই বাঁক নিয়ে দক্ষিণে এগোব, বলল ও।
তাহলে পৃথিবীর শেষ সীমায় পৌঁছে আকাশের বুকে ঝরে পড়ার সময় হয়েছে আমাদের। এমন একটা বিপর্যয়ের সম্ভাবনা সত্ত্বেও ফেনকে কেমন নির্বিকার ঠেকল। আমরা কি চিরকাল পড়তে থাকব, নাকি শেষ পর্যন্ত আরেকটা পৃথিবীতে বা আরেক সময়ে পৌঁছে যাব? তোমার কী ধারণা, ম্যাগাস?
আশা করি সামনে শূন্যতাকে মুখ হাঁ করে থাকতে দেখলেই ঘুরে দাঁড়ানোর মতো বুদ্ধি আমাদের ক্যাপ্টেনের আছে। তাহলে আর সময় ও স্থানের ভেতর দিয়ে উল্টে পড়তে হবে না। এখানেই আমি যথেষ্ট সম্ভষ্ট, খুশি। হাসল তাইতা। ফেনের কল্পনার জাল বোনার ক্ষমতা দেখে খুশি হয়েছে ও।
সেদিন বিকেলে ওর উরুর ক্ষত পরখ করল তাইতা, পরিষ্কার সেরে গেছে দেখে খুশি হয়ে উঠল। ঘোড়ার পশমের সেলাইয়ের চারপাশের জায়গাটা টকটকে লাল ও গরম হয়ে আছে। খুলে ফেলার সময় হওয়ার পরিষ্কার লক্ষণ। গিঁট ছিঁড়ে ফোরসেপ দিয়ে তুলে আনল ও। সামান্য হলদে পুঁজ বেরিয়ে এলো ওগুলোর ফুটো থেকে। গন্ধ শুঁকে হাসল ও। মিষ্টি, ক্ষতিকর নয়। এরচেয়ে ভালো ফল আশা করতে পারতাম না। দেখ, কী সুন্দর একটা ক্ষতচিহ্ন রেখে গেছে ওটা, ঠিক তোমার শাপলার পাপড়ির মতো।
ক্ষত পরখ করার সময় একদিকে মাথা কাত করে রাখল ফেন। ওর কনিষ্ঠ আঙুলের নখের চেয়ে বড় হবে না ওটা। তুমি অনেক চালাক, ম্যাগাস। আমি নিশ্চিত ইচ্ছা করেই ওটা করেছ। ইম্বালির টাট্ট ওর কাছে যত প্রিয় এটা আমার কাছে তারচেয়ে অনেক বেশি ভালো লাগছে। খুব ঈর্ষা হবে ওর!
