দাস, অনুমান করল মেরেন। নিরীহ পর্যটকদের বাঁচানোর সাথে দাস পাকড়াও করার কাজটাও মিলিয়ে নিয়েছে তিনাত।
কোনও মন্তব্য না করলেও নিজেদের অবস্থান আর মর্যাদা ভেবে দেখল তাইতা। আমরাও কি বন্দি, নাকি সম্মানিত অতিথি? আমাদের স্বাগত জানানোর বিষয়টি অস্পষ্ট রয়ে গেছে। ক্যাপ্টেন ওনকাকে জিজ্ঞেস করবে কিনা ভাবল একবার, কিন্তু জানে সেটা হবে নেহাতই ব্যর্থ প্রয়াস। ওনকা তার অধিনায়কের মতোই চাপা।
তামাফুপা ছেড়ে নীলের শুকনো পথ ধরে দক্ষিণে হ্রদের দিকে এগিয়ে চলল ওরা। অচিরেই লাল জোড়া-পাথর ও উপরের ব্লাফের পরিত্যক্ত মন্দিরের দেখা মিলল, কিন্তু এখান থেকে নদী ছেড়ে হ্রদের পাশের পথ ধরে পুবদিকে এগোল। ওনকার সাথে মন্দির ও জোড়া-পাথর নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করল তাইতা, কিন্তু ওনকার ভাণ্ডারে একটাই জবাব: আমি এসব কিছুই জানি না, ম্যাগাস। আমি একজন সাধারণ সৈনিক, মহান সন্ত নই।
আরও কয়েক লীগ এগিয়ে হ্রদের উপরের আরেকটা ব্লাফে উঠে একটা আচ্ছাদিত উপসাগরের দিকে তাকাল ওরা। সৈকতের মাত্র কয়েক কিউবিট দূরে প্রশান্ত জলে নোঙর ফেলা ছয়টা যুদ্ধ গালির একটা বহর এবং বেশ কয়েকটা বিশাল পরিবহন বার্জ দেখে অবাক হয়ে গেল তাইতা ও মেরেন। বাহনগুলোর নকশা অন্যরকম, মিশরের জলে এরকম কখনও দেখেনি; দুই মাথাঅলা খোলা ডেক ওগুলোর। এটা পরিষ্কার, একক দীর্ঘ মাস্তুল খসিয়ে খোলের দৈর্ঘ্য বরাবর শুইয়ে রাখা যায়। খরস্রোতা নদীর জলপ্রপাত ও খাড়া প্রবাহের শাদা পানিতে চলাচল উপযোগি করে নকশা করা হয়েছে তীক্ষ্ণ গলুই আর পেছনের। চতুর নকশা, মেনে নিল তাইতা। পরে জানতে পেরেছিল, খোলসগুলো চারটে ভিন্ন ভিন্ন অংশে বিচ্ছিন্ন করে জলপ্রপাত বা অন্যান্য বাঁধা পাশ কাটিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।
উপসাগরে নোঙর ফেলে রাখা নৌবহরটা দেখে সুদর্শন ও কাজের মনে হচ্ছে। পানি নির্মল, টলটলে, মনে হচ্ছে, খোলসগুলো যেন পানিতে নয় বরং হাওয়ায় ভাসছে।হ্রদের নিচে পরিষ্কার ফুটে রয়েছে ওদের ছায়া। ওগুলো ঘিরে পাক খেয়ে চলা মাছের ঝাক পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছে তাই ক্রুদের ফেলে দেওয়া আবর্জনায় আকৃষ্ট হয়ে এগিয়ে এসেছে।
খোলের ওই নকশা অচেনা, মন্তব্য করল মেরেন। মিশরিয় নয়।
প্রাচ্যে সফরের যাওয়ার সময় সিন্ধু নদীর ওধারে এই ধরনের জাহাজ দেখেছিলাম আমরা, সায় দিয়ে বলল তাইতা।
কীভাবে এরকম জাহাজ মানচিত্রের বাইরের অভ্যন্তরীণ সাগরে এলো।?
একটা জিনিস নিশ্চিতভাবে জানা আছে, মন্তব্য করল তাইতা। ক্যাপ্টেন ওনকাকে এসব জিজ্ঞেস করে ফায়দা হবে না।
কারণ সে সাধারণ সৈনিকমাত্র, মহান সাধু নয়, তামাফুপা ছেড়ে আসার পর এই প্রথম হাসল মেরেন। গাইডকে অনুসরণ করে সৈকতে চলে এলো ওরা, প্রায় সাথে সাথে শুরু হয়ে গেল জাহাজে ওঠার পর্ব। বার্জে তোলা হলো বন্দি বাসমারাদের, ঘোড়া ও তিনাত-বাহিনীকে তোলা হলো অন্যগুলোয়।
উইন্ডস্মোক ও ওয়ার্লউইন্ডকে জরিপ করতে গিয়ে রীতিমতো বাঁচাল হয়ে উঠল কর্নেল তিনাত আনকুর। কী দারুণ জুটি। নিশ্চিতভাবেই মা আর বাচ্চা, তাইতার উদ্দেশে মন্তব্য করল সে। জীবনে এদের সাথে পাল্লা দেওয়ার মতো খুব বেশি হলে তিন থেকে চারটা ঘোড়া দেখেছি। পাগুলো দারুণ, শক্তিশালী বুক কেবল হিব্রাইট বংশেই দেখতে পাবেন। বাজি ধরে বলতে পারি, এগুলো একবাতানার সমতলে জন্ম নিয়েছে।
ঠিক ধরেছ, প্রশংসার সুরে বলল তাইতা। তোমার তারিফ করি। ঘোড়ার দারুণ সমঝদার তুমি।
আরও খুশি হয়ে উঠল তিনাত। ওর জাহাজের যাত্রী তাইতা, ফেন ও মেরেনের জন্যে আলাদা থাকবার ব্যবস্থা করল সে। সবাই উঠলে সৈকত থেকে রওয়ানা হয়ে গেল নৌবহর, এগোল হ্রদের দিকে। রওয়ানা দেওয়ার কাজ শেষ হলে তীর বরাবর পশ্চিমে বাঁক নিল ওরা। খোলা ডেকে খাবার ভাগাভাগি করতে তিনজনকে নিমন্ত্রণ জানাল তাইতা। ওরা কেবুই ছেড়ে আসার পর গত বছরগুলোর সামান্য খাবারের তুলনায় এখানকার রাধুনীর রান্না রীতিমতো খাসা। সদ্য শিকারের পর ঝলসানো হ্রদের মাছের পর এলো বিচিত্র সজি ও লাল মদের অ্যামফোরার একটা ঝর্না। লাল মদের মান এমনকি খোদ ফারাওর টেবিলকেও সম্মানিত করত।
সামনের জলের বুকে সূর্যাস্তের সময় নীলের মুখের লাল পাথরের সাথে একই স্তরে চলে এলো নৌবহর। একটা দীর্ঘ ব্লাফের নিচে নোঙর ফেলল ওরা, ওটার চূড়ায় ইয়োসের মন্দির। দুই বাটি মদ খাওয়ায় দরদী আন্তরিক মেজবানে পরিণত হয়েছে তিনাত। তার হালকা মেজাজের সুযোগ নিতে চাইল তাইতা। ওই দালানটা কীসের? জলের উপর ইশারা করল। দেখে মন্দির বা প্রাসাদের মতো লাগছে, কিন্তু এই রকম নকশা মিশরে কোনওদিন দেখিনি। কারা ওটা বানিয়েছে ভাবছি।
ভুরু কোঁচকাল তিনাত। ওটা নিয়ে তেমন ভাবিনি, কারণ স্থাপত্যে আমার বিশেষ কোনও আগ্রহ নেই, অবশ্য আপনার কথা ঠিক হতে পারে, ম্যাগাস। ওটা মন্দির বা উপাসনালয় হয়ে থাকবে; কিংবা শস্যের গুদামও হতে পারে। কাঁধ আঁকাল সে। আরেকটু মদ দেব আপনাকে? স্পষ্টতই প্রশ্নটা তাকে বিরক্ত করেছে। আবারও দূরবর্তী ও শীতল সৌজন্যমূলক হয়ে উঠল সে। তাছাড়া, এটা পরিষ্কার যে গালি ক্রুদের ওদের সাথে কোনও রকম কথাবার্তা বলতে নিষেধ বা ওদের প্রশ্নের জবাব না দিতে নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে।
