বৃত্তের মাঝখানে হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ছোট দলটা। নিজেদের আর শত্রু ঘাম-রক্তে নেয়ে গেছে ওরা। বোকার মতো পরস্পরের দিকে তাকাল ওরা, এখনও বেঁচে আছে কেন বুঝতে পারছে না। পা আর খুরের আঘাতে ওড়া ধুলোর কারণে এখনও রণক্ষেত্র আবছা হয়ে রয়েছে, ওদিকে জ্বলন্ত বেড়া থেকে হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে ধোয়ার অবশিষ্টাংশ। গাছপালার সারি দেখা যায় না বললেই চলে।
ঘোড়া! দাঁতে দাঁত চেপে বলল মেরেন। খুরের আওয়াজ পেয়েছি।
তোমার কল্পনা, একই রকম কর্কশ কণ্ঠে বলল তাইতা। এটা সম্ভব নয়।
না, মেরেনের কথাই ঠিক, বলে উঠল ফেন, গাছপালার দিকে ইশারা করল ও। ঘোড়া!
ধুলো আর ধোঁয়ায় চোখ পিটপিট করল তাইতা। পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে না। ওর দৃষ্টি আবছা, ক্ষীণ। জামার হাতায় চোখ মুছে ফের চোখ তুলে তাকাল। অশ্বারোহী বাহিনী? বিড়বিড় করে বলল ও, কণ্ঠে অবিশ্বাস।
মিশরিয় অশ্বারোহীবাহিনী, চিৎকার করে উঠল মেরেন। ক্র্যাক টুপ! ওদের সামনে নীল পতাকা উড়ছে। বাসমারাদের সারির ভেতর দিয়ে ছুটছে অশ্বারোহী বাহিনী, প্রথমে বর্শায় গাঁথছে ওদের, তারপর পাঁই করে ঘুরে এগিয়ে যাচ্ছে। তলোয়ার দিয়ে কাজ শেষ করার জন্যে। অস্ত্রশস্ত্র ফেলে ভয়ে কেটে পড়ছে বাসমারারা।
এ হতে পারে না, বিড়বিড় করে বলল তাইতা। মিশর থেকে দুই হাজার লীগ দূরে রয়েছি আমরা। ওরা এখানে আসে কী করে? এ সম্ভব নয়।
বেশ, নিজের চোখকে তো বিশ্বাস করতে হয়-নাকি বলব, একটা ভালো চোখকে? খুশির সাথে বলে উঠল মেরেন। ওরা আমাদের দেশি লোক! কয়েক মিনিটের ভেতর কেবল মৃত বা অচিরেই মরতে বসা বাসামারারা ছাড়া আর কেউ রইল না। প্রহরীদল এখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। আহতদের ঘাই মারতে জিন থেকে সামনে ঝুঁকে পড়ছে। উচ্চ পদস্থ তিনজন কর্মকর্তা অশ্বারোহী বাহিনীর মুল দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রেহাই পাওয়া ছোট দলটার দিকে দুলকি চালে এগিয়ে আসতে শুরু করল।
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নীল দলের কর্নেল, বলল তাইতা।
গোল্ড অভ মেরিট ও লাল পথের ভ্রাতৃসঙ্রে ক্রস পরেছে, বলল মেরেন। আসলেই যোদ্ধা!
তাইতার সামনে এসে লাগাম টানল কর্নেল। অভিবাদন জানাতে ডান হাত উঁচু করল। আমরা হয়তো দেরি করে ফেলেছি ভেবে ভয় হচ্ছিল, মহান ম্যাগাস। কিন্তু দেখতে পাচ্ছি এখনও আপনি বহাল তবিয়তে আছে। সকল দেবতাকে তাদের করুণার জন্যে ধন্যবাদ জানাই।
তুমি আমাকে চেনো? আরও অবাক হয়ে গেল তাই।
গালালার তাইতাকে সারা দুনিয়া চেনে। অবশ্য, ভুয়া পয়গম্বরের পরাজয়ের পর আপনার সাথে রানি মিনতাকার দরবারে দেখা হয়েছিল আমার, তবে সেটা অনেক বছর আগের কথা, তখন আমি এনসাইন ছিলাম। সেটা আপনার স্মৃতি থেকে মুছে গেছে, এখানে বিস্ময়ের কিছু নেই।
তিনাত? কর্নেল তিনাত আনকুত? লোকটার চেহারার স্মৃতি জাগিয়ে তুলল তাইতা।
কৃতজ্ঞতার হাসি দিল কর্নেল। আপনার স্বীকৃতি দিয়ে আমাকে সম্মানিত করলেন।
তিনাত আনকুত সুদর্শন, শক্তিশালী ও বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা, অবিচল দুষ্টি। অন্তর্চক্ষু দিয়ে ওকে দেখল তাইতা। আভায় কোনও রকম দুর্বলতা বা ত্রুটি দেখতে পেল না। যদিও ওটার গভীরে একটা গম্ভীর নীল ঝিলিক এক ধরনের আবেগজাত অস্থিরতার প্রতীক তুলে ধরছে। সাথে সাথে বুঝে গেল ও, তিনাত সম্ভষ্ট মানুষ নয়। আদারি দুর্গ হয়ে আসার সময় তোমাদের খবর পাই আমরা, ওকে বলল তাইতা। কিন্তু ওখানে রেখে আসা তোমার লোকদের ধারণা ছিল বুনো এলাকায় মারা গেছ তোমরা।
দেখতেই পাচ্ছেন, ম্যাগাস, ওদের ভুল হয়েছে, হাসল না তিনাত। কিন্তু এখন এখান থেকে চলে যেতে হবে। আমার লোকেরা আরও হাজার হাজার এই বুনো বর্বরদের আমাদের দিকে এগিয়ে আসার আলামত পেয়েছে। আমাকে যে দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছিল–আপনাকে নিরাপদ হেফাযতে নিয়ে যাওয়া-সেটা পালন করেছি। আমাদের আর সময় নষ্ট না করে এখুনি এখান থেকে সরে পড়তে হবে।
আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে, কর্নেল তিনাত? আমরা এখানে আছি, আমাদের সাহায্য প্রয়োজন, কেমন করে জানলে তুমি? কে তোমাকে আমাদের উদ্ধার করতে পাঠিয়েছে? জানতে চাইল তাইতা।
যথা সময়ে আপনার প্রশ্নের উত্ত দেওয়া হবে, ম্যাগাস। কিন্তু দুঃখের সাথে বলছি সেটা আমার দ্বারা নয়। আপনাদের প্রয়োজনের দিকে খেয়াল রাখতে কপ্টেন ওনকাকে এখানে রেখে যাচ্ছি। আবার অভিবাদন জানিয়ে ঘোড়া ঘুরিয়ে নিল সে।
ঘোড়া দাঁড় করাল ওরা। বেশির ভাগই আহত; দুটোর আঘাত এমন মারাত্মক যে ওদের মেরে ফেলা ছাড়া গতি নেই। কিন্তু উইন্ডস্মোক ও ওয়ার্লউইন্ড অক্ষত রয়ে গেছে। ওদের কাছে তেমন মালসামান না থাকলেও তাইতার ডাক্তারি সরঞ্জাম ভারি ও বিশাল। সব কিছু বহন করার মতো পশু ছিল না বলে ক্যাপ্টেন ওনকা আরও প্যাক হর্স আনার হুকুম দিল। নিজ দলের লোক আর ঘোড়াগুলোর ক্ষতস্থানের পরিচর্যা করে দিল তাইতা। ওনকা অধৈর্য, কিন্তু এ কাজে তাড়াহুড়ো করার জো নেই। ওরা রওয়ানা হতে হতে আরও খানিকটা সময় কেটে গেল।
*
ওদের নিয়ে যেতে অশ্বারোহী বাহিনীর একটা স্কোয়াড্রন পাঠালো কর্নেল তিনাত। ওদের মাঝখানে থেকে বেশ সুরক্ষিত অবস্থায় আগে বাড়ল ওরা। আরেকটা বিশাল কলাম ওদের পেছনে খেটে মরছে, সাথে কয়েক শো বিলাপরত বন্দি, বেশিরভাগই বাসমারা মেয়ে।
