সর্দারকে লুটিয়ে পড়তে দেখল বাসমারারা, মরিয়া আর্তনাদ ছেড়ে পিছিয়ে গেল। কঠিন ছিল লড়াইটা। অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ওদের-রণক্ষেত্রের ছোট বৃত্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে মৃতদেহ। মিশরিয়রা সংখ্যায় কম, কিন্তু শেষ করার জন্যে তাড়াহুড়ো করল না ওরা। নিজেদের অবস্থান জোরদার করার জন্যে বিরতির সুযোগ নিল তাইতা। ঘোড়াগুলোকে শুয়ে পড়তে বাধ্য করল। সব অশ্বারোহী সেনাকেই এই কৌশল শিক্ষা দেওয়া হয়। বাসমারাদের বর্শার হাত থেকে কিছুটা আড়াল যোগাল ওদের শরীর। পেছনে তীরন্দাজদের মোতায়েন করে ইম্বালিকে দায়িত্ব দিল ও। ওর সাথে মাঝখানে রয়েছে ফেন ও আওকা। এবার নিজেই ফেনের পাশে অবস্থান নিল ও। শেষ পর্যন্ত ওর সাথে থাকবে ও, ঠিক যেভাবে অন্য জীবনে ছিল। এইবার, ভাবল ও, ব্যাপারটা ওর জন্যে দ্রুত ও সহজতর করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ও।
বৃত্তের অন্যদের দিকে তাকাল ও। হাবারি, শোফার ও শেষ দুজন যোদ্ধা মারা গেছে। শাবাকো ও হিলতো এখনও খাড়া থাকলেও আহত। ক্ষতস্থানের পরিচর্যা নিয়ে মাথা ঘামায়নি ওরা। মুঠো ভর্তি ধুলো চেপে রক্তক্ষরণ বন্ধ করেছে কেবল। ওদের ওপাশে হাঁটু গেড়ে বসে নাকোন্তোর উরুতে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিচ্ছে ইম্বালি। কাজ শেষ হলে তাইতার দিকে চোখ তুলে তাকাল, ওর চোখে যোদ্ধার চেয়ে বরং নারীসুলভ দৃষ্টিই বেশি ফুটে উঠল।
ঘোড়া থেকে উল্টে পড়ার সময় উপুড় হয়ে পড়েছিল মেরেন। ওর গালে আঘাত লেগেছে, নষ্ট চোখে ফের রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে। রক্তের একটা ধারা চামড়ার পট্টির নিচ দিয়ে নাকের পাশ ঘেঁষে উপরের ঠোঁটের কাছে গড়িয়ে নামছে। শান দেওয়ার পাথরে তলোয়ারের ফলায় শান দেওয়ার সময় জিভ দিয়ে মুছে ফেলল ও। শত্রুপক্ষের নিবিড় ঘেরাওয়ের ভেতর থেকে, যেভাবে আহত আর ভেঙে পড়েছে ওরা, তাতে কারও মাঝেই বীরত্বের কিছু নেই।
কোনও অলৌকিক ঘটনাবলে আজকের দিনে বেঁচে গেলে ওদের জন্যে রণ কাব্য লিখে দেব, যে শুনবে তার চোখে জল এসে যাবে, গম্ভীর চেহারায় নিজেকে কথা দিল তাইতা।
তীক্ষ্ণ কণ্ঠের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে নীরবতা ভঙ্গ করল একটা কণ্ঠস্বর। আমরা মেয়েমানুষ নাকি বাসমারা শয়তানের চ্যালাদের সাথে যুদ্ধ করছি? আবার গুঞ্জন। শুরু করল জনতা। দুলছে, পা দিয়ে মাটিতে আঘাত করছে।
প্রথম প্রশ্নের উত্তর দিল আরেকটা কণ্ঠস্বর। আমরা পুরুষ, আমরা হত্যা করতে এসেছি!
মারো! বর্শা নিয়ে এসো! বর্শা কাজে লাগাও! চড়া হয়ে উঠল গানের আওয়াজ। নাচতে নাচতে পা দিয়ে মাটিতে আঘাত করতে করতে এগোতে শুরু করল দলটা। নাকোন্তোর পাশে দাঁড়িয়েছিল ইম্বালি, ওর ঠোঁটে ক্ষীণ ক্রুর হাসি। মাথার চুল ঠিক করে নিয়েছে হিলতো আর শাবাকো। আবার হেলমেট চাপিয়েছে মাথায়। ঠোঁট থেকে রক্ত মুছে ফেলেছে মেরেন, দৃষ্টি পরিষ্কার ও তীক্ষ্ণ করে নিতে ভালো চোখটা পিটপিট করল একবার। তলোয়ার খাপে পুরে ধনুক বের করে নিল; শত্রুপক্ষকে এগিয়ে আসতে দেখার সময় ওটার উপর ভর দিয়ে দাঁড়াল। আড়ষ্টভাবে উঠে দাঁড়াল ফেন। আহত পা-টাকে বাঁচাচ্ছে। তাইতার হাত ধরল ও।
ভয় পেয়ো না, পিচ্চি, ওকে বলল ও।
ভয় পাইনি, বলল ফেন, কিন্তু তুমি আমাকে তীর ঘেঁড়া শেখালে ভালো করতে। এখন তোমার অনেক উপকারে লাগতাম।
আইভরি বাঁশি বেজে উঠল। ওদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল শত্রুবাহিনী। আত্মরক্ষাকারীদের ছোট দলটা পর পর দুবার ওদের বিরুদ্ধে তীরধনুক দিয়ে লড়াই করল। তারপর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ধনুকে তীর জোড়া যায় তত তাড়াতাড়ি তীর ছুড়ল। কিন্তু ওদের সংখ্যা কম, কালো শরীরের জলোচ্ছ্বাসের ভেতর বলতে গেলে একটা তরঙ্গও সৃষ্টি করতে পারল না।
বৃত্তে ঢুকে পড়ল বাসমরারা। ফের হাতাহাতি লড়াই লেগে গেল। গলায় আঘাত পেয়েছে শাবাকো, মারা যাবার সময় ওর গলা থেকে হারপুনে গাঁথা তিমির মতো রক্ত বের হয়ে আসতে লাগল। অসংখ্য দেহের চাপে ভেঙে পড়ল ছোট বৃত্তটা। পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইম্বালি ও নাকোন্তা, আক্রমণ শানাচ্ছে ওরা। আওকা মারা গেছে। পিছু হটে ফেন তাইতা আর ওর মাঝখানে না আসা পর্যন্ত সরে গেল মেরেন। আরও খানিকটা সময় হয়তো লড়াই করে যেতে পারবে ওরা, কিন্তু তাইতা জানে অচিরেই ফেনকে ছেড়ে দিতে হবে। চট করে ওকে অনুসরণ করবে ও। একসাথে থাকবে ওরা।
সোজা হৃৎপিণ্ড বরাবর আঘাত হেনে এক লোককে শেষ করল মেরেন। ঠিক একই সময়ে ওর পাশের লোকটাকে ফেলে দিল তাইতা।
ওর দিকে ফিরল মেরেন। সময় হয়েছে, ম্যাগাস, আপনি চাইলে আপনার জন্যে কাজটা করব আমি, ভাঙা কণ্ঠে বলল ও। তৃষ্ণা আর ধূলিতে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেছে।
তাইতা জানে মেরেন এখন ফেনকে কত ভালোবাসে, ওকে হত্যা করা তার জন্যে কত কষ্টকর হবে। উঁহু, সৎ মেরেন, তবে তোমাকে এর জন্যে ধন্যবাদ জানাই। এটা আমার কাজ। স্নেহের চোখে ফেনের দিকে তাকাল তাইতা। প্রিয় আমার মেরেনকে চুমু দিয়ে বিদায় শুভেচ্ছা জানাও, কারণ তোমার আসল বন্ধু ও। তাই করল ফেন। তারপর বিশ্বাসের সাথে তাইতার দিকে ফিরল। মাথা নিচু করে চোখ বন্ধ করল ও। খুশি হলো তাইতা। ওই সবুজ চোখজোড়া ওর দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থায় কোনওদিনই কাজটা করতে পারত না। তলোয়ার ওঠাল ও, কিন্তু আঘাত হানার আগেই সামলে নিল। বাসমারাদের যুদ্ধের গান এখন হতাশা ও ত্রাসের বিশাল গোঙানিতে পরিণত হয়েছে। ওদের সারিগুলো ছত্রভঙ্গ হয়ে নেকড়ে দাঁত বারাকুড়ার আক্রমণের মুখে সারদিনে ঝাঁকের মতো ছুটে পালাচ্ছে।
