দুলকি চালে আগে বাড়ো! চিৎকার করে বলল ও। বনের সীমানার দিকে ছুটল ঘোড়াগুলো। বাসমারাদের ভেতর বিরাট চিৎকার উঠল। রঙচর্চিত চেহারাগুলো ফিরে গেল ওদের দিকে। প্রত্যেকটা চোখে রক্তের নেশা। প্রান্তরের সব দিক থেকে ছোট অশ্বারোহী দলটার দিকে ধেয়ে আসতে শুরু করল ওরা।
দৌড়া! উইন্ডস্মোককে তাগিদ দিল তাইতা। কিন্তু দুজন বিশালদেহীকে বইছে সে। সবকিছু যেন স্বপ্নের মতো ধীর ভঙ্গিতে ঘটতে শুরু করেছে। ওরা পেছনে ধেয়ে আসা যোদ্ধাদের আগে আগে ছুটলেও ডান দিক থেকে বর্শাধারীদের আরেকটা ফর্মেশন ছুটে আসতে শুরু করেছে।
জলদি! যত তাড়াতাড়ি পারিস! আবার তাগিদ দিল তাইতা। বাসমাকে ওদের বিচ্ছিন্ন করতে নেতৃত্ব দিতে দেখেছে ও। ডান কাঁধে বর্শা নিয়ে সামনে থেকে ছুটে আসছে, নির্ভুল নিশানা করতে তৈরি। শিকারের গন্ধে হাউন্ডের মতো গর্জন করছে তার লোকজন।
জলদি! চিৎকার করে উঠল তাইতা। কোণ আর গতি যাচাই করেছে ও। আমরা পার পাবই।
ঘোড়সওয়ারদের দলটা তিরিশ কদম দূর দিয়ে পার হয়ে যাবার সময় একই হিসাব কষল বাসমাও। ওদের পেছনে বর্শা ছুঁড়ে দিতে ছোটার গতি ও হতাশার শক্তিকে কাজে লাগাল। উঁচুতে লাফিয়ে উঠল সে, তেড়ে এলো মেরেনের বোঝাই বে গেল্ডিংয়ের উদ্দেশে।
মেরেন! চেঁচিয়ে সাবধান করল তাইতা, কিন্তু বর্শাটা ছিল ওর অন্ধ পাশে। ঠিক জিনের পেছনে ওর ঘোড়ার পিঠে বিধল ওটা। বের পা ভেঙে পড়ল। পোড়া জমিনের উপর দলামোচা হয়ে ছিটকে পড়ল মেরেন আর আওকা। ধাওয়ায় ক্ষান্ত দিতে যাচ্ছিল বাসমারারা, কিন্তু এবার খুশিতে সর্দারের নেতৃত্বে ধেয়ে এলো ওর দিকে। গড়ান দিয়ে উঠে দাঁড়াল মেরেন। অন্য ঘোড়সওয়ারদের ওদের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখল, নিজেদের ঘোড়া টেনে নিয়ে যাচ্ছে ওদের। চলে যাও! চিৎকার করে বলল ও। নিজেদের বাঁচাও, কারণ আমাদের বাঁচাতে পারবে না তোমরা। দ্রুত ওকে ঘিরে ফেলতে শুরু করেছে বাসমারারা।
ওয়ার্লউইন্ডের ঘাড় স্পর্শ করল ফেন, হাঁক দিল ওটার উদ্দেশে। হোয়া! ওয়ার্লউইন্ড, হোয়া!
উড়ন্ত অবস্থায় চড়াই পাখির মতো পাঁই করে ঘুরল ধূসর কোল্ট। কী হচ্ছে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেরেন যেখানে আওকার সাথে দাঁড়িয়েছিল সেদিকে ধেয়ে গেল ফেন। ফেনকে ওর দিকে আসতে দেখে মুহূর্তের জন্যে এতটাই হতবাক হয়ে গেল মেরেন যে, মুখে রা সরল না ওর। ওর রেকাবে ঝুলছে ইম্বালি, কুড়োল হাঁকাচ্ছে। হাতের ইশারায় ওকে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করল মেরেন। চলে যাও! কিন্তু ফেন ঘুরে দাঁড়ানোর সাথে সাথে তাইতাও ঠিক একই রকম আত্মঘাতী কাণ্ড করে বসেছে। বিভ্রান্তিতে পড়ে গেল দলের বাকি সবাই। ঘোড়াগুলো পিছিয়ে যাচ্ছে, ঝাঁপ দিচ্ছে, একটার উপর আরেকটা উল্টে পড়ছে; অশ্বারোহীরা আবার ওদের নিয়ন্ত্রণে না আনা পর্যন্ত এমনি বিশৃঙ্খলা চলল। তারপর একসাথে উল্টো পথ ধরল সবাই।
সর্দারের নেতৃত্বে সবচেয়ে কাছের বাসামারারা এখন প্রায় ওদের উপর এসে পড়েছে। এগিয়ে আসার সাথে সাথে বর্শা ছুঁড়ছে। প্রথমে হিলতোর, তারপর শাবাকোর ঘোড়া আঘাত পেল, হুড়মুড় করে পড়ে গেল ওগুলো, পড়ার সময় সওয়ারিদের ছুঁড়ে ফেলল পিঠ থেকে।
চট করে একবার চোখ বুলিয়ে বদলে যাওয়া পরিস্থিতি দেখে নিল তাইতা। ওদের সবাইকে বইবার মতো যথেষ্ট ঘোড়া নেই এখন। আত্মরক্ষামূলক চক্র গড়ে তোল! চিৎকার করে বলল ও। এখানেই ওদের মোকাবিলা করতে হবে।
জিন থেকে খসে পড়া লোকগুলো অনেক কষ্টে উঠে খোঁড়াতে খোঁড়াতে এগিয়ে এলো ওর দিকে। অক্ষত ঘোড়ার পিঠে যারা ছিল, তারা লাফ দিয়ে নেমে টেনে একটা বৃত্তের কেন্দ্রে নিয়ে গেল ওদের। ধনুক খসিয়ে নিল তীরন্দাজরা। কুড়োল হাতে নিল ইম্বালি ও আওকা। বাইরের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছে ওরা। বর্শাধারীদের জমাট বাঁধা ফর্মেশনকে ধেয়ে আসতে দেখার পর পরিণতি সম্পর্কে ওদের মনে কোনও সন্দেহ রইল না।
এটাই শেষ লড়াই। আমাদের মনে থাকার মতো একটা শিক্ষা দাও ওদের! খুশির সাথে চেঁচাল মেরেন। সামনাসামনি বাসমারারদের প্রথম দলটার মোকাবিলা করল ওরা। হিংস্রভাবে যারপরনাই মরিয়া হয়ে লড়াই করে চলল ওরা। পিছিয়ে দিল হানাদারদের। কিন্তু সর্দার বাসমা ফের ওদের এক করল। লাফাচ্ছে, চিৎকার করছে সে। আবার ওর সাথে আক্রমণ শানাতে এগিয়ে এলো ওরা। নাকোন্তোর দিকে ধেয়ে গেল সে। ওর বর্মকে ফাঁকি দিয়ে উরু লক্ষ্য করে আঘাত হানল।
ওর পাশে ছিল ইম্বালি, ক্ষতস্থান থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়ে আসতে দেখে সঙ্গীকে বাঁচাতে ক্ষেপে ওঠা সিংহীর মতো উড়ে গেল বাসমার দিকে। নিজেকে বাঁচাতে ঘুরে দাঁড়াল বাসমা, কুড়োলের আঘাত ঠেকাতে বর্শা ওঠাল। ইম্বালির কোপে দুভাগ হয়ে গেল বর্শার হাতল, যেন প্যাপিরাসের আগাছা। বাসমার ডান কাঁধে আঘাত করল ওটার ফলা। টলে উঠে পিছিয়ে গেল সে। অর্ধেক খসে পড়া হাতটা পাশে ঝুলছে। ফলাটা এক ঝটকায় আলগা করেই ফের আঘাত করল ইম্বালি। এইবার মাথা লক্ষ্য করে। পরিষ্কার ফ্লামিঙ্গো পালকের মুকুট দুভাগ করে নেমে গেল ওটা। দাঁত পর্যন্ত কেটে দুর্ফাঁক করে দিল বাসমার মাথার খুলি। এক মুহূর্তের জন্যে বিভক্ত চোখ দুটো ফলার উল্টো দিক থেকে পরস্পরের দিকে পিটপিট করল। তারপর ওটা মুক্ত করে নিল ইম্বালি। বেরিয়ে আসার সময় হাড়ের সাথে মাংসের ঘর্ষণের আওয়াজ উঠল। সেই সাথে বেরিয়ে এলো হলদে ঘিলু।
