নির্দেশ নিয়ে সারি বরাবর এগিয়ে গেল মেরেন। ফিরে এলো অচিরেই। কী করতে হবে, সবাই জানে, ম্যাগাস। ফায়ার পটগুলো তৈরি আছে। ছক্কার গুটি কৌটায় ঘোড়ার জন্যে তৈরি আছে। নীরব রইল তাইতা; শত্রুবাহিনীর দিকে চোখ। ওর। আবার পরিচিত রণহুঙ্কার শুরু হওয়ার আওয়াজ পেল ওরা। বর্মের দামামা। আর শত শত নগ্ন পায়ের দাপানি।
আসছে ওরা, মৃদু কণ্ঠে বলল মেরেন।
বেড়ায় আগুন লাগিয়ে দাও, নির্দেশ দিল তাইতা। শুকনো ডালপালার তূপের কাছে অপেক্ষমান লোকজন ছুটে গেল ওগুলোর কাছে, ফায়ার পটের জ্বলন্ত জিনিস ছিটকে দিল। মাদুর দিয়ে বাতাস শুরু করল। নিমেষে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল অগ্নিশিখা।
পিছিয়ে যাও! হুঙ্কার দিল মেরেন। জ্বলন্ত প্যারাপেট থেকে লাফ দিল জীবিতরা। অন্যরা যখন ল্যাঙচাচ্ছে বা খোঁড়াচ্ছে, তখন কয়েকজন যন্ত্রণাকরভাবে তাদের সাহায্য করল। ওদের গমনপথের দিকে তাকিয়ে সহসা ক্লান্ত বোধ করল তাইতা, নিজেকে নাজুক ও বয়স্ক মনে হচ্ছে ওর। এখানেই, জগতের এই প্রত্যন্ত বুনো প্রান্তরেই শেষ হয়ে যাবে সব? এত কষ্ট, ভোগান্তি ও মৃত্যু বিফলে যাবে? ওকে লক্ষ করছিল মেরেন। কাঁধ সোজা করে দাঁড়াল সে। এখন তার পক্ষে হার মানা ঠিক হবে নাঃ মেরেন ও বাকি লোকজনের প্রতি একটা দায়িত্ব রয়েছে ওর, তারচেয়ে বড় কথা ফেনের প্রতি ওর দায়িত্ব আছে।
যাবার সময় হলো, ম্যাগাস, আস্তে করে বলল মেরেন। মই বেয়ে নামতে সাহায্য করতে ওর হাত তুলে নিল। ওরা ঘোড়র কাছাকাছি পৌঁছতে পৌঁছতে গোটা সীমানা প্রাচীর হুহু শব্দ তোলা দাউদাউ লেলিহান শিখায় ঢাকা পড়ে গেছে। গা পোড়ানো ভীষণ তাপ থেকে বাঁচতে কুঁকড়ে গেল ওরা।
ঘোড়া বের করে নিয়ে গেল সৈনিকরা। ঘোড়া বরাদ্দ দিতে সারি বরাবর আগে বাড়ল মেরেন। ফেন অবশ্যই ওয়ার্লউইন্ড হাঁকাবে, ওকে পাহারা দিতে রেকাবে তুলে নেবে ইম্বালিকে। উইন্ডস্মোক পাবে তাইতা, ওর রেকাবের দড়িতে ঝুলে থাকবে নাকোন্তো। বে হাঁকাবে মেরেন, ওর নষ্ট চোখের পাশে থাকবে আওকা। বাকি সওয়ারিরা যার যার ঘোড়ায় চাপবে। একটা খচ্চরও বেঁচে না থাকায় বাড়তি দুটো ঘোড়ার পিঠে খাবার আর মালসামান বোঝাই করা হয়েছে। ওগুলোর লাগাম হাতে তুলে নিয়েছে হিলতো ও শাবাকো।
জ্বলন্ত বেড়ার আড়াল নিয়ে বাইরের দরজার মুখোমুখি ঘোড়ায় চাপল ওরা। লস্ত্রিসের সোনালি মাদুলিটা উঁচু করে ধরল তাইতা, নিজেদের উপর আড়াল করার মন্ত্র পাঠ করতে লাগল। শত্রুপক্ষের চোখের আড়ালে নিয়ে গেল নিজেদের। ঘোড়া ও মানুষের একটা বিশাল দলকে আড়াল করার সমস্যা জানে ও। কিন্তু অদিম বাসমারারা সহজেই ওর সৃষ্টি মায়ায় ভুলে যাবে।
জ্বলন্ত বেড়া পেরিয়ে আসার কোনও চেষ্টাই করল না বাসমারারা। ওরা স্পষ্টতই ধরে নিয়েছে প্রতিপক্ষ ভেতরে আটকা পড়েছে, তাই ওদের খতম করার সুযোগের অপেক্ষা করছে। অগ্নিশিখার অন্যপ্রান্তে চিৎকার করছে ওরা, গান গাইছে। আগুনের শিখা বাইরের গেট পর্যন্ত পৌঁছে হুড়মুড় করে মাটিতে লুটিয়ে পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল তাইতা।
এইবার! নির্দেশ দিল ও। ধোয়ার ভেতর দিয়ে ছুটে গেল হিলতো ও শাবাকো, লুটিয়ে পড়া গেটের উপর দিয়ে দড়ির ফাস ছুঁড়ে দিল। একপাশে সরিয়ে নিয়ে গেল ওগুলো। এখন পথ উন্মুক্ত; আবার দৌড়ে অন্যদের পাশে চলে এলো ওরা।
একসাথে থাকবে, যত কাছে থাকা যায় ততই মঙ্গল, আমাকে অনুসরণ করো, বলল তাইতা। জাদুর ক্ষমতা প্রমাণিত হবে গেট দিয়ে বের হয়ে ওপাশের উন্মুক্ত প্রান্তরে পৌঁছানোর পর। বেরুনোর পথ আগুনের কাঠামো পেয়েছে, জীবন্ত পুড়ে মারা যাবার আগেই পথে বের হয়ে যেতে হবে।
দুলকি চালে সামনে বাড়, নীরবে নির্দেশ জারি করল তাইতা। শক্তির কণ্ঠ ব্যবহার করল ও, লাইনের প্রতিটি লোকের কানে পৌঁছে গেল ওর কথা। জ্বলন্ত গেটের দিকে ধেয়ে গেল ওরা। দেয়ালের মতো ওদের বাধা দিচ্ছে তাপ। কয়েকটা ঘোড়া পিছিয়ে আসার চেষ্টা করল, কিন্তু চাবুক ও স্পারের সাহায্যে ওদের সামনে যেতে বাধ্য করল সওয়ারিরা, তাপে কেশর আর চামড়া পুড়ে যাচ্ছে। লোকজনের চেহারাও পুড়ে যাওয়ার যোগাড়। তবে নিবিড় দলে থেকেই অবশেষে খোলা প্রান্তরে বের হয়ে এলো ওরা।
বাসমারারা ওদের চারপাশে নাচছে, হুঙ্করা ছাড়ছে। এ দিকে তাকালেও ওদের উপর দিয়ে ফাঁকা পার হয়ে যাচ্ছে ওদের দৃষ্টি, চলে যাচ্ছে জ্বলন্ত বেড়ার দিকে। তাইতার জাদুতে কাজ হচ্ছে।
নীরবে, দ্রুত, সতর্ক করল তাইতা। খুব কাছাকাছি থেকো। হুট করে কেউ নড়াচড়া করে বসো না। মাদুলিটা উঁচু করে ধরে রাখল ও। পাশে ফেনও তাই করছে। সোনার তালিসমানটা উঁচু করে রেখেছে ও, ওকে শিখিয়ে দেওয়া কথার পুনরাবৃত্তি করে চলেছে। জাদু শক্তিশালী করে তোলার কাজে সাহায্য করছে তাইতাকে। প্রায় পরিষ্কার জায়গায় না পৌঁছানো পর্যন্ত খোলা প্রান্তরের উপর দিয়ে এগিয়ে চলল ওরা। বনের সীমানা এখন দুইশো কদমের চেয়ে কম দূরে। কিন্তু এখনও গোত্রীয় লোকগুলোর চোখে ওদের অস্তিত্ব ধরা পড়েনি। তারপর ঘাড়ের পেছনে শীতল হাওয়ার একটা ছোঁয়া টের পেল তাইতা। ওর পাশে ঢোক গিলে তালিসমানটাকে ওটার চেইনে ছেড়ে দিল ফেন। পুড়িয়ে দিচ্ছে! চিৎকার করে বলে উঠল ও, চেয়ে রইল আঙুলের ডগায় লাল দাগের দিকে। তারপর ভীত চেহারায় তাইতার দিকে তাকাল। কিছু একটা আমাদের জাদু নষ্ট করে দিচ্ছে। ঠিক বলেছে ও। দমকা হাওয়ার ঝাপ্টায় ছিঁড়ে যাওয়া নাজুক পালের মতো ছিঁড়ে ফানা ফানা হয়ে যাচ্ছে, টের পাচ্ছে তাই। আড়াল করা জোব্বা থেকে নগ্ন করে ফেলা হচ্ছে ওদের। আরেকটা প্রভাব কাজ করছে ওদের উপর। সেটা ঠেকাতে বা ফেরাতে পারছে না ও।
