মদ পান করল ওরা, ক্ষতস্থান পরিচর্যা করল, ভোঁতা তলোয়ারের জায়গায় নতুন তীক্ষ্ণ তলোয়ার নিল। কিন্তু বিরতিটা ছিল অল্পায়ুর, আবার চিৎকার শোনা গেল। যার যার অস্ত্র তুলে নাও! আবার আসছে ওরা!
মেরেনের লোকেরা সূর্যাস্তের আগে আরও দুটি ধাওয়ার মুখোমুখি হলো, কিন্তু শেষেরটা ছিল ব্যয়বহুল। বর্শা বা মুগুরের আঘাতে বাসমারাদের আবার ফেরত পাঠানোর আগে প্রাণ হারাল আটজন পুরুষ ও ইম্বালির দুটি মেয়ে।
সৈনিকদের অল্প কজনই অক্ষত অবস্থায় দিনটা পার করতে পেরেছে। কয়েক জনের সামান্য কেটে ছিঁড়ে গেছে, ভারি বাসমারা মুগুরের আঘাতে হাড় ভেঙেছে দুজনের। আরও দুজন রাতের শেষ দেখতে পাবে নাঃ পেট আর ফুসফুসে গাঁথা বর্শা ভোরের আগেই পরপারে নিয়ে যাবে ওদের। অনেকেই এত ক্লান্ত যে খাওয়া বা নিজেদের কুঁড়ের আশ্রয়ে টেনে নেওয়ার শক্তি পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছে। তৃষ্ণা মেটানোর পরপরই ফের প্যারাপেটের কাছে চলে এলো ওরা, ঘামে ভেজা বর্ম ও রক্তাক্ত ব্যান্ডেজ নিয়েই ঢলে পড়ল ঘুমে।
এখানে আরও একটা দিন টিকতে পারব না, তাইতাকে বলল মেরেন। গ্রামটা মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। বাসমারারা এতটা নাছোড় হবে ভাবিনি। এখান থেকে যেতে হলে সবকটাকে মারতে হবে। ক্লান্ত, হতাশ দেখাচ্ছে ওকে। চোখের কোটরে ব্যথা হচ্ছে ওর-বারবার পট্টি তুলে হাতের গিঁট দিয়ে ডলছে।
ওকে এমন কাহিল অবস্থায় কমই দেখেছে তাইতা। এই সীমানা সামলে রাখার মতো যথেষ্ট লোকবল নেই আমাদের, সায় দিল ও। ভেতরের রেখার ভেতরে চলে যেতে হবে আমাদের। দেয়াল ঘিরে রাখা চূড়ান্ত প্রতিরক্ষা চক্রের দিকে তাকাল ওরা। রাতের অন্ধকারে কাজটা করা যাবে। তারপর সকালে শত্রুপক্ষের প্রথম দলটা ধেয়ে এলেই সীমানা প্রাচীরে আগুন ধরিয়ে দেব। আগুন না নেভা পর্যন্ত কয়েক ঘণ্টা আটকে রাখা যাবে ওদের।
তারপর?
ঘোড়াগুলোকে জিন পরিয়ে রাখব, শহর থেকে সটকে পড়ার সুযোগের অপেক্ষায় থাকব।
কোথায়?
জানতে পেলেই জানাব তোমাকে, কথা দিল তাইতা, উঠে দাঁড়াল আড়ষ্টভাবে। সীমানা পাহারায় যারা আছে তাদের সাথে আগুনের পট আছে কিনা নিশ্চিত করো। আমি ফেনের কাছে গেলাম।
কুঁড়েয় ঢুকে তাই দেখল ফেন ঘুমাচ্ছে। পা পরখ করতে গিয়ে ওকে জাগিয়ে দিতে চাইল না, কিন্তু গাল স্পর্শ করতেই শীতল ঠেকল। তপ্ত বা জ্বরাক্রান্ত নয়। ক্ষতস্থান পচেনি। নিজেকে আশ্বস্ত করল ও। লায়লাকে বিদায় করে ফেনের পাশে শুয়ে পড়ল ও। তিনটা শ্বাস টানার আগেই ঢলে পড়ল গভীর অন্ধকার ঘুমে।
*
ভোরের অনিশ্চিত আলোয় জেগে উঠল ও। ওর মুখের কাছে উদ্বিগ্ন চেহারায় বসে আছে ফেন। ভেবেছিলাম তুমি মরে গেছ, তাই চোখ খুলতেই বলে উঠল ও।
আমিও তাই ভেবেছিলাম, উঠে বসল তাইতা। তোমার পা দেখি। ব্যান্ডেজ খুলে দেখল ক্ষতস্থানটা সামান্য লাল হয়ে আছে, কিন্তু সেটা ওর হাতের চেয়ে তপ্ত নয়। সামনে ঝুঁকে সেলাইয়ের গন্ধ শুকল। পচনের কোনও লক্ষণ নেই। পোশাক পরে নাও। আমাদের দ্রুত সটকে পড়তে হতে পারে। ওকে টিউনিক আর নেংটি পরতে সাহয্য করার সময় বলল, তোমাকে একটা ক্রাচ বানিয়ে দিচ্ছি, তবে তার ব্যবহার শেখার সামান্য সুযোগই পাবে। সূর্যাস্তের সময় ফের আক্রমণ করবে বাসমারারা। চট করে একটা হালকা ছড়ি দিয়ে ক্রাচ আর একটা বাঁকানো ক্রসপিস বানিয়ে ফেলল ও, বাকল দিয়ে গদি বানিয়ে দিল ক্রসপিসে। শরীরের সমস্ত ভর ওটার উপর ছেড়ে দিল ফেন। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ওকে ঘোড়ার আস্তাবলে যেতে সাহায্য করল তাইতা। দুজনে মিলে ওয়ার্লউইন্ডের পিঠে জিন চাপাল, লাগাম পরাল। সতর্ক বাণী ভেসে এলো সীমানা থেকে।
ওয়ার্লউইন্ডের সাথেই থাকো, ওকে বলল তাইতা। তোমার খোঁজে ফিরে আসছি আমি। দ্রুত পায়ে সীমানার দিকে ফিরে গেল ও। মেরেন ওর জন্যে অপেক্ষা করছিল।
ফেন-কেমন আছে ও? মেরেনের প্রথম প্রশ্ন ছিল এটাই।
ঘোড়া হাঁকাতে পারবে, ঘোড়া নিয়ে অপেক্ষা করছে, বলল তাইতা। এখানে কী হচ্ছে?
উন্মুক্ত মাঠের উপর দিয়ে ইশারা করল মেরেন। দুই শো কদম দূরে বনের কিনারে অবার দলবদ্ধ হচ্ছে বাসমারা বাহিনী।
এত কম, মন্তব্য করল তাইতা। গত সন্ধ্যার অর্ধেক।
দক্ষিণের দেয়ালের দিকে তাকান, বলল মেরেন।
বিশাল হ্রদের দিকে তাকাতে পাঁই করে ঘুরে দাঁড়াল তাই। বেশ! গত কাল যেটা করা উচিত ছিল আজ তবে সেটাই করছে, শুষ্ক কণ্ঠে বলল ও। এবার দুই দিক থেকে আক্রমণ করবে। এক এক মুহূর্ত ভেবে তারপর জানতে চাইল, আজ সকালে কয়জন অস্ত্র তুলে নেওয়ার মতো সুস্থ আছে?
রাতে তিন জন মারা গেছে, আমাদের চারজন সৈনিক ওদের শিলুক বেশ্যা আর বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে রাতের অন্ধকারে সটকে পড়েছে। বেশি দূরে যাবার আগেই বাসমারাদের হাতে ধরা খাবে বলে আমার ধারণা। তো, নাকোন্তো আর ওর গোত্রীয় বোন আওকাসহ আমাদের সাথে আছে মোটে ষোল জন।
লোকজন আর তাদের মালসামান বইবার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী ঘোড়া আছে আমাদের, বলল তাইতা।
বাসমারাদের আরেকটা হামলার মোকাবিলা করার কোনও সুযোগ আছে। আমাদের, নাকি সীমানা প্রাচীরে আগুন লাগিয়ে ধোয়ার ভেতর সটকে পড়ব?
সিদ্ধান্ত নিতে বেশি সময় নষ্ট করল না তাইতা। এখানে থাকলে অনিবার্যকে একটু পিছিয়ে দেওয়াই সার হবে, বলল ও। আমরা ঘোড়ার পিঠে একটা সুযোগ নেব, পালানোর চেষ্টা করে দেখব। সবাইকে আমাদের ইচ্ছার কথা জানিয়ে দাও।
