বাসমারাদের নিবিড় সারিগুলো ঝড়ের বেগে মার্কারের বাইরের চিহ্ন পার হলো; তারপর শুরু করল রণহুঙ্কার। বর্মে আঘাত হানছে ওদের বর্শা। প্রতি পঞ্চম পদক্ষেপে সমবেতভাবে নগ্ন পায়ে মাটিতে আঘাত করছে ওরা। ওদের গোড়ালিতে বাঁধা ঝুমঝুমিতে বাড়ি পড়ছে। আঘতে লাফিয়ে উঠছে জমিন। ভস্মীভূত শহরের ছাইয়ের গাদা থেকে কোমর পর্যন্ত উঠে আসছে সূক্ষ্ম ধুলিকণা, মনে হচ্ছে পানি ভেঙে আগে বাড়ছে ওরা। এক শো কদম মার্কারের কাছে পৌঁছাল ওরা। চিৎকার আর ঢাকের আওয়াজ উন্মাদনা লাভ করল।
সামলে! চিৎকার ছাড়ল মেরেন, যাতে শোরগোল ছাপিয়ে ওর কণ্ঠস্বর পৌঁছে যায়। হাতে হাত ধরো! সামনের সারিটা পঞ্চাশ কদমের চিহ্নের কাছে এসে গেছে। বাসমারাদের মুখের বিচিত্র নকশার খুঁটিনাটি সব দেখতে পাচ্ছে ওরা। নেতারা এখন চিহ্ন পার হয়ে গেছে, এত কাছে এসে পড়েছে যে সীমানা প্রাচীরের তীরন্দাজরা ওদের দেখতে পাচ্ছে।
এইবার নিশানা করো! গর্জে উঠল মেরেন। উঁচু হলো ধনুকগুলো। তীরন্দাজরা ছিলা টেনে ধরায় বেঁকে গেল ওগুলো। দণ্ড বরাবর লক্ষ্য স্থির করায় ছোট হয়ে গেল ওদের চোখ। বাহু ব্যথা করতে শুরু করা পর্যন্ত ওদের তীর ধরে রাখতে দেওয়া ঠিক হবে না, জানে মেরেন। আগের নির্দেশের পায়ে পায়ে এলো ওর পরের নির্দেশ। ঠিক সেই মুহূর্তেই তিরিশ কদম চিহ্নে এসে পা রাখল নিবিড় শত্ৰুসারি।
এবার! চিৎকার করে বলল মেরেন। একযোগে তীর ছুঁড়ে মারল ওরা। এই দূরত্বে একটা তীরও ফস্কাল না। নিবিড় ঘন মেঘের মতো উড়ে গেল ওগুলো। দুই তীরন্দাজ একই বাসমারা যোদ্ধাকে লক্ষ্য করেনি, এটা ওদের নৈপূণ্যের একটা লক্ষণ। প্রথম সারিটা এমনভাবে লুটিয়ে পড়ল যেন পৃথিবীর বুকে একটা গহ্বরে পড়ে গেছে।
ইচ্ছামতো ছেড়ো! হুঙ্কার ছাড়ল মেরেন। চৰ্চিত নৈপূণ্যের সাথে ফের ছিলায় তীর পরাল তীরন্দাজরা। টেনে ধরেই এক সাথে ছেড়ে দিল আবার। দেখে সহজ, শিথিল একটা ভঙ্গি মনে হলো। বাসমারাদের পরের সারিও লুটিয়ে পড়ল। কয়েক মুহূর্ত বাদে ওদের উপর লুটাল পরের সারি। ওদের পেছনে যারা ছিল তারা ক্রমবর্ধমান লাশের স্তূপে হোঁচট খেতে লাগল।
তীর লাগবে এখানে! প্যারাপেটের ছাদ বরাবর বয়ে গেল চিৎকারটা। কাঁধের উপর রাখা তীরের ভারে উবু হয়ে দ্রুত ছুটে এলো শিলুক মেয়েরা। এগিয়ে আসছে বাসমারারা, তীর ছুঁড়ে চলল তীরন্দাজরা, যতক্ষণ না ওরা সীমানা প্রাচীরের নিচে এসে দেয়ালের খুঁটিতে বেয়ে ওঠার মতো একটা কিছু পাওয়ার চেষ্টায় কিলবিল করতে লাগল। কেউ কেউ উপরে উঠে এলো, কিন্তু নাকোন্তা, ইম্বালি আর ওর মেয়েরা অপেক্ষায় ছিল ওদের। যুদ্ধের কুড়োলগুলো ওঠানামা করল যেন লাকড়ি চিড়ছে। ঘাই মারার বর্শা চালানোর সময় ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল নাকোন্তোর চিৎকার।
অবশেষে হাতির দাঁতের বাঁশির তীক্ষ্ণ শিষের আওয়াজ সহসা যুদ্ধে বিরতি ডেকে আনল। ছাইয়ে আবৃত মাঠের উপর দিয়ে উধাও হয়ে গেল বাহিনী। জীবিতদের ফের একজোট করতে ওখানে অপেক্ষা করছিল বাসমা।
প্যারাপেট বরাবর দ্রুত আগে বাড়ল মেরেন। কেউ চোট পেয়েছে? পায়নি? ভালো। তীর তুলে আনতে গেলে যারা মরার ভান করে আছে তাদের বেলায় সাবধান থেকো। ওই শয়তানগুলোর এটা একটা প্রিয় কৌশল।
গেট খুলে তীর জড়ো করতে দ্রুত ছুটে গেল ওরা। অনেক তীরের ফলাই মরা মাংসে গেঁথে গেছে, কুড়োল দিয়ে কেটে বের করতে হলো সেগুলো। বিভৎস কাজ, অচিরেই কসাইদের মতো রক্তে মাখামাখি হয়ে গেল ওরা। তীর সংগ্রহ শেষ হলে মৃত বাসমারাদের বর্শাও সংগ্রহ করল ওরা। তারপর দৌড়ে সীমানায় ফিরে দড়াম করে দরজা আটকে দিল।
মেয়েরা শুকনো মাছ আর ধুরা পিঠা ভর্তি ঝুড়ি ও চামড়ার পানির পাত্র নিয়ে এলো। বেশির ভাগ পুরুষই তখনও খাবার চিবুচ্ছিল, এমন সময় ফের শুরু হলো গান, ক্যাপ্টেনরা আবার প্যারাপেটে তলব করল ওদের। যার যার অস্ত্র তুলে নাও!
নিবিড় সরল রেখায় ফের আগে বাড়ল বাসমারারা। কিন্তু এইবার নেতাদের হাতে রয়েছে দীর্ঘ খুঁটি, বনে বসে বানিয়েছে ওগুলো। দেয়ালের তীরন্দাজদের হাতে আঘাত খাওয়ার সময় পেছনের লোকেরা ওদের ফেলে দেওয়া খুঁটি তুলে নিয়ে আবার আগে বাড়ছে। খুঁটিগুলো সীমানার বাইরের প্রাচীরের কাছে আসার আগে পঞ্চাশ জন লোক প্রাণ হারাল। খুঁটির এক প্রান্ত উপরে দেয়ালের চূড়ার সাথে ঠেস দিতে সামনে ছুটে এলো বাসমারারা। সাথে সাথে খুঁটি বেয়ে ভীড় করে ওঠা শুরু করে দিল ওরা। দাঁত দিয়ে ছোট বর্শা ধরে রেখেছে।
খুঁটির উপর ওদের ভার চেপে বসায় প্রতিরোধকারীদের পক্ষে সেগুলোকে উল্টে দেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। আক্রমণকারীরা দেয়ালের চূড়ায় পৌঁছানোর পর হাতাহাতি মারপিট করতে বাধ্য হলো ওরা। পুরুষদের সাথে সার বেধে দাঁড়াল ইম্বালি ও ওর মেয়েরা, যুদ্ধ কুড়োলে ভীষণ হত্যালীলা চালিয়ে গেল। কিন্তু বাসমারারা যেন লোক্ষয়ে নির্বিকার। সতীর্থদের লাশের উপর দিয়ে বেয়ে উঠছে, ধেয়ে আসছে হামলা করতে, অধীর ও অদম্য।
শেষে ছোট একটা দল যুদ্ধ করে প্যারাপেটে উঠে এলো। শেষ শত্ৰুটিকে আবার পিছু হটতে বাধ্য করার আগে প্রচণ্ড যুদ্ধ হলো। তবে, নতুন স্রোত ধেয়ে এলো ওদের জায়গা দখল করতে। ঠিক যখন মনে হচ্ছিল ক্লান্ত আত্মরক্ষাকারীরা কেবল রঙচঙে লাশের ওজনের কাছেই হার মানবে, ঠিক তখনই ফের তীক্ষ্ণ সুরে বাঁশি বেজে উঠল। দূরে হারিয়ে গেল হানাদাররা।
