ঘোড়ার পশম দিয়ে সেলাইয়ের শেষ ফোড় দিচ্ছে তাইতা, এমন সময় উত্তরে প্রহরা মিনার থেকে চিৎকার শুনতে পেল ওরা। ক্ষতস্থানের মুখ বন্ধ করতে ব্যান্ডেজের গিঁট বাঁধতে গিয়ে মেরেনের দিকে তাকাল না তাইতা। মনে হয় বাসমারারা এসে গেছে। এবার তোমাকে নিজের কাজে যেতে হবে। ইম্বালিকে নিতে পারো সাথে। সাহায্যের জন্যে ধন্যবাদ, সৎ মেরেন। ক্ষতটা না পাকলে বেচারা তোমাকে ধন্যবাদ জানানোর ভাষা খুঁজে পাবে না।
ফেনের পায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধার পর কুঁড়ের দরজায় এসে দাঁড়াল তাই। সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও বুদ্ধিমতী শিলুক স্ত্রী লায়লাকে ডাকল। ফেন আর ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এক সাথে অনেক সময় কাটিয়েছে ওরা, আলাপ করে বাচ্চাদের নিয়ে খেলে। ফেনকে ফ্যাকাশে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে বিলাপ শুরু করে দিল লায়লা। ওকে শান্ত করতে কিছুটা সময় নিল তাইতা। তারপর ভালো করে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিল ওকে। লাল শেপেনের প্রভাবে ঘুমন্ত ফেনের দিকে খেয়াল রাখতে বলে সরে এলো।
*
কোনওমতে বানানো মই বেয়ে উঠে প্রাচীরের উত্তর দেয়ালে মেরেনের সাথে খোযোগ দিল তাইতা। গম্ভীরভাবে ওকে স্বাগত জানাল মেরেন। বিনা বাক্য ব্যয়ে উপত্যকার দিকে ইঙ্গিত করল সে। তিনটা ভিন্ন ভিন্ন ফরমেশনে দুলকি চালে এগিয়ে আসছিল বাসমারারা। এগোনোর সময় বাতাসে দুলছে ওদের শিরস্ত্রান। বনের ভেতর দিয়ে দীর্ঘ কালো সাপের মতো একেবেকে এগোচ্ছে সারিগুলো। আবার গান শুরু করেছে ওরা, গভীর পুনরাবৃত্তিমূলক সঙ্গীত, প্রতিরক্ষায় নিয়োজিতদের রক্ত হিম করে দিচ্ছে, শিরশির করছে গায়ের চামড়া। ঘাড় ফিরিয়ে প্যারাপেটের উপর চোখ বোলাল তাইতা। ওদের পূর্ণ শক্তি সমবেত হয়েছে এখানে। সামান্য সংখ্যা দেখে গম্ভীর হয়ে গেল ও।
আমরা মোট বত্রিশ জন, মৃদু কণ্ঠে বলল ও। আর ওরা অন্তত ছয় শো।
তাহলে সমানে সমানই আছি, ম্যাগাস। বাজি ধরে বলছি বেশ ভালো একটা খেলা খেলতে যাচ্ছি আমরা, এড়িয়ে গেল মেরেন। ওদের উপর আসন্ন ঝড়ের মুখে এমনি নিস্পৃহতা দেখে কপট অবিশ্বাসে মাথা নাড়ল তাই।
প্যারাপেটের দূর প্রান্তে ইদালি ও নিজের মেয়েদের নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নাকোন্তো। ওদের দিকে এগিয়ে গেল তাইতা। বরাবরের মতো ইম্বালির অভিজাত নিলোটিক বৈশিষ্ট শান্ত, দূরাগত।
ওদের তুমি চেনো, ইম্বালি। কীভাবে আক্রমণ করবে ওরা? জানতে চাইল ও।
প্রথমে আমাদের সংখ্যা গুনবে, সাহস পরখ করবে, বিনা দ্বিধায় জবাব দিল সে।
সেটা কেমন করে?
সোজা দেয়ালের দিকে তেড়ে আসবে, যাতে আমরা দেখা দিই।
সীমানা প্রাচীরে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করবে?
না, শামান। এটা ওদের নিজেদের শহর। ওদের পূর্বপুরুষদের কবর আছে এখানে। কোনওদিন তাদের কবর পোড়াবে না ওরা।
মেরেনের পাশে ফিরে এলো তাইতা। এবার প্যারাপেট বরাবর পুতুলগুলো বসানোর সময় হয়েছে, বলল ও। শিলুক স্ত্রীদের দিকে নির্দেশটা চালান করে দিল মেরেন। প্যারাপেটের নিচে আগেই পুতুলগুলো বসিয়ে রেখেছিল ওরা। এবার সীমানা প্রাচীর বরাবর দৌড়ে দৌড়ে এমনভাবে ওগুলোকে বসাতে লাগল যাতে দেয়ালের উপর দিয়ে নকল মুণ্ডগুলো বাসমারারা দেখতে পায়।
মনে হচ্ছে এক ধাক্কায় ফাঁড়ির শক্তি দ্বিগুন করে ফেলেছি, মন্তব্য করল তাইতা। আরেকটু সমীহের সাথে আমাদের দেখতে বাসমারাদের সাহায্য করা উচিত।
ছাই-ঢাকা জমিনের উপর বর্শাধারীদের মহড়া দেখতে লাগল ওরা, ওখানে কুঁড়েগুলো পোড়ানো হয়েছে। বাসমারারা ওদের তিনটা রেজিমেন্ট জড়ো করল, সামনে রয়েছে ক্যাপ্টেনরা।
ওই মহড়া শিথিল, ওদের ফরমেশন অগোছাল, বিভ্রান্ত, মেরেনের কণ্ঠস্বর ভর্ৎসনাপূর্ণ। এটা একটা আবর্জনা, সেনাদল নয়।
আবর্জনা বটে তবে অনেক বড়, বলল তাইতা, কিন্তু আমাদের বাহিনীটা অনেক ছোট, যুক্তি দেখাল তাইতা। জেতার আগে পর্যন্ত এসো উৎসব মূলতবী রাখা যাক।
খোঁচানো বন্ধ হলো, মাঠে নেমে এলো নীরবতা। বাসমারাদের সারি ছেড়ে এগিয়ে এলো একটা অবয়ব। সীমানা প্রাচীরের দিকে আধাআধি দূরত্ব পেরিয়ে এলো সে। লোকটার মাথায় উঁচু ফ্লামিঙ্গো শিরস্ত্রান। নিজের লোকদের সামনে দাঁড়িয়ে যোদ্ধার ভাব দেখার সুযোগ করে দিল ওদের তারপর তীক্ষ্ণ কণ্ঠের চিৎকার করে হুকুম দিল। প্রত্যেক বিরতির সময় শূন্যে লাফিয়ে উঠছে, বর্মের উপর সজোরে আঘাত হানছে বর্শা।
কী বলছে? বিভ্রান্ত দেখাল মেরেনকে।
আমাদের সাথে বন্ধুত্বের কথা বলছে না, এটা ধরে নেওয়া যায়, হেসে বলল তাইতা।
একটা তীর পাঠিয়ে উৎসাহ যোগাচ্ছি ওকে।
তোমার সবচেয়ে দূরপাল্লার লক্ষ্য থেকেও সত্তর কদম দূরে আছে সে, ওকে বাধা দিল তাইতা। নষ্ট করার মতো তীর নেই আমাদের।
বাসমারাদের অবিসম্বাদিত নেতা বাসমাকে লক্ষ করতে লাগল ওরা। অপেক্ষমান দলের কাছে ফিরে গেল সে। এবার পেছন সারির পেছনে নেতৃত্বের অবস্থান নিল সে। আবার নীরবতা এলো রণক্ষেত্রে। কোনও নড়াচড়া নেই। এমনকি হাওয়া পর্যন্ত মরে গেছে। ট্রপিকাল বজ্রঝড়ের পূর্ব মুহূর্তের নিস্তব্ধতার মতো অসহনীয় হয়ে উঠেছে টেনশন। তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চিৎকার ছাড়ল সর্দার বাসমা, হাউ! হাউ! সাথে সাথে আগে বাড়ল সেনা দল।
সামলে! নিজের লোকদের উদ্দেশে বলল মেরেন। কাছে আসতে দাও ওদের। তীর সামলে রাখ!
