ওষুধের প্রতিক্রিয়া শুরু হওয়ার অবসরে চামড়ার ডাক্তারি ব্যাগ হাতড়াল তাইতা। একটা আলাদা খুপরি রয়েছে ওটায় যেখানে রূপার চামচগুলো রাখে ও। ওর জানা মতে আর একজন চিকিৎসকের কাছেই এমন একটা সেট ছিল। সে মারা গেছে। তৈরি হওয়ার পর মেরেনকে তলব করল ও। কুঁড়ের দোরগোড়ায় ঘুরঘুর করছিল সে। কী করতে হবে তুমি জানো, বলল ও।
নিশ্চয়ই। আপনি জানেন এর আগে কতবার একাজ করেছি, জবাব দিল মেরেন।
নিশ্চয়ই হাত ধুয়েছ? জিজ্ঞেস করল তাইতা।
মেরেনের অভিব্যক্তি বদলে গেল। হ্যাঁ, সন্দিহান কণ্ঠে বলল সে।
কখন?
সকালে, টহলে বের হওয়ার আগে।
আবার ধুয়ে এসো।
তার কোনও দরকার দেখি না, বিড়বিড় করে বলল মেরেন, বরাবর যেমন করে। কিন্তু আগুনের কাছে গিয়ে বড় পাত্র থেকে গরম পানিতে একটা বাটি ভরে নিল।
আরেকজোড়া হাত লাগবে আমাদের, সিদ্ধান্ত নিল তাইতা। আগুনের উপর রূপার চামচ ধরে রেখেছে। ইম্বালিকে ডেকে পাঠাও।
ইম্বালি? সে তো একটা বর্বর। আমাদের নিজেদের কাউকে ডাকলে হতো না?
মেয়েটা বুদ্ধিমতী, শক্তিশালী, ওর সাথে দ্বিমত পোষণ করল তাইতা। তারচেয়ে বড় কথা মেয়ে সে। আরেকজন পুরুষ ফেনের নগ্ন দেহ ধরে রাখুক, চায় না তাইতা। মেরেনকে কাজে লাগাতে হচ্ছে, এটাই যথেষ্ট খারাপ, তায় আবার আরেক জন কর্কশ সৈনিক-শিলুক মেয়েরা লড়াকু মানুষ। ইম্বালিকে ডাক, আবার বলল ও। সেও যেন হাত ধুয়ে আসে সেটা নিশ্চিত করো।
লাল শেপেন ফেনকে শিথিল করে দিলেও বর্শার ফলাটা নাড়াচাড়া করার সময় গোঙাতে লাগল ও। মেরেনের উদ্দেশে মাথা দোলাল তাইতা। দুজনে মিলে ফেনকে বসার ভঙ্গিতে নিয়ে এলো। ওর পেছনে চলে গেল মেরেন, ওর বুকের উপর হাত নিয়ে এসে শক্ত করে ধরে রাখল।
রেডি, বলল সে।
ইম্বালির দিকে এক নজর তাকাল তাইতা, ফেনের পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। পাটা সোজা করে ধরে রাখ, যেন নড়তে না পারে। সামনে ঝুঁকল ইম্বালি, শক্ত করে চেপে ধরল ফেনের পায়ের গোড়ালি। লম্বা করে দম নিয়ে মনোসংযোগ করল তাইতা। দীর্ঘ হাড়সর্বস্ব আঙুলগুলো নাড়াচাড়া করার সময় নিজের প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি বিচার করে দেখল ও। সাফল্যের মূলে রয়েছে গতি আর দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারটা। রোগী যত দীর্ঘ সময় কষ্ট পাবে, শরীর আর মনে ততবেশি ক্ষতি সৃষ্টি হবে, তাতে সেরে ওঠার সম্ভাবনাও যাবে কমে। চট করে বর্শার ফলা বেঁধে রাখা লিনেনের টুকরোটা কেটে ফেলল ও। আস্তে করে উঁচু করে ধরল ওটা। আবার গুঙিয়ে উঠল ফেন। চামড়ার টুকরোটা তৈরি ছিল মেরেনের হাতে, চট করে ওর দাঁতের মাঝখানে সেঁধিয়ে দিল ওটা, যাতে জিভে কামড়ে দিতে না পারে।
দেখো, ওটা যেন ফেলতে না পারে, বলল তাইতা। সামনে ঝুঁকে ক্ষতস্থান পরখ করল ও। ফলার নড়াচড়ার ফলে এরই মধ্যে বেশ বড় হয়ে গেছে ওটা। তবে গর্তের ভেতর রূপার চামচ ঢোকানোর মতো বড় নয়। ফুলে ওঠা মাংসের উপর হাত বোলাল ও, মহাধমনীর নিয়মিত স্পন্দন টের পেল। গেঁথে থাকা কাঁটার তীক্ষ্ণ ফলার দেখা না পাওয়া পর্যন্ত ক্ষতটাকে টেনে বড় করতে উষ্ণ কাঁচা মাংসের ভেতর তর্জনী ও মধ্যমা ঢুকিয়ে দিল ও। অর্তচিৎকার করে যুঝছে ফেন। কিন্তু বাঁধন শক্ত করে রাখল মেরেন আর ইম্বালি। ক্ষতস্থানের ফোকরটা আরেকটু বড় করল তাইতা। ওর নড়াচড়া অসম্ভব দ্রুত হলেও নিয়ন্ত্রিত, নিখুঁত; কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কাঁটার অবস্থান পেয়ে গেল। মুক্ত হাতে চামমগুলো তুলে নিল ও। ওটা কিনারার উপর রেখে ক্ষতস্থানে বর্শার ফলার দুপাশে দুটো ঢুকিয়ে দিল। তীক্ষ্ণ ফলার উপর দিয়ে আগে বাড়িয়ে ঢেকে ফেলল ওটা যাতে বিনা বাধায় বর্শার ফলাটা বের করে আনতে পারে।
আমাকে মেরে ফেলছ! আর্তচিৎকার করে উঠল ফেন। সর্বশক্তি প্রয়োগ করছে মেরেন ও ইম্বালি, কিন্তু এত জোরে মোচড় খাচ্ছে ও যে ধরে রাখতে পারছে না। দুবার ক্ষতের উপর দিয়ে চামচ নিয়ে যেতে পারল তাইতা, কিন্তু দুবারই ওর মোচড়ের ফলে ফসকে গেল। উপরে উঠে এলো ওগুলো। ক্ষতস্থানের রক্তাক্ত মুখ নড়াচড়ায় বাধা পড়ায় এক ধরনের টান পড়ার শব্দ হচ্ছে। ফেনের মাংসের গভীরে আঙুল থাকায় ওর ধমনীর স্পন্দন টের পাচ্ছে ও। অবিরাম দপদপ করছে। যেন ওর আত্মায় অনুরণন তুলছে। চামচগুলোকে ওটার পাশ দিয়ে পাঠানোর কাজে মনোযোগ দিল ও। পাথরের একটা চল্টাও ঢেকে রাখা ধাতু থেকে বের হয়ে থাকলে ধমনী কেটে যেতে পারে। মসৃণভাবে আরও চাপ প্রয়োগ করল ও। ক্ষতস্থানের মুখটা হার মানতে যাচ্ছে, টের পেল। তারপর সহসা রক্ত ভরে গেল রূপার চামচ, পাথরের ফলাটা মুক্ত হয়ে বের হয়ে এলো। চট করে ক্ষতস্থান থেকে হাত বের করে এনে ফাঁক হয়ে থাকা মুখটাকে চেপে ধরল। মুক্ত হাতে ঝটপট মেরেনের বাড়িয়ে দেওয়া লিনেনের প্যাডটা নিয়ে রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে ক্ষতস্থানের উপর চেপে ধরল। ওর আর্তনাদ মৃদু গোঙানিতে পরিণত হয়েছে। শরীর থেকে টেনশন চলে গেছে। মেরুদণ্ডের আড়ষ্ট বাক শিথিল হয়ে গেছে।
আপনার নৈপূণ্য কখনওই আমাকে অবাক না করে পারে না, ফিসফিস করে বলল মেরেন। যখনই আপনাকে ওভাবে কাজ করতে দেখি, বিস্ময়ে হতবাক হই। আপনি সর্বকালের সেরা শল্যচিকিৎসক।
এসব নিয়ে পরে আলাপ করা যাবে, জবাব দিল তাইতা। এখন ওর ক্ষত সেলাই করতে সাহায্য করো।
