তুন থেকে আরেকটা তীর বের করে আনল তাইতা। মাথা নিচু করো, ফেন, হুকুম দিল ও কণ্ঠের শক্তি দিয়ে। মিশে যাও! সামনে ঝুঁকে পড়ে ওয়ার্লউইন্ডের পিঠের সাথে নিজেকে মিশিয়ে দিল ফেন। ধনুকটা উঁচু করল তাইতা, ছিলাটা ওর নাক আর কান স্পর্শ না করা পর্যন্ত টানটান করে ধরে রাখল, তারপর ছেড়ে দিল তীরটা। ইতিমধ্যে তীর ছোঁড়ার ভঙ্গিতে সামনে ঝুঁকে পেড়েছে বর্শাধারী, কিন্তু তাইতার পাথরের তীরের ফলা তার গলার গোড়ার ফোকরে গিয়ে বিধল, নিমেষে ভবলীলা সাঙ্গ করে দিল তার। অবশ্য, বর্শাটা আগেই তার মুঠো থেকে বেরিয়ে এসেছে। অসহায়ের মতো চেয়ে রইল তাইতা। ফেনের দিকে ধেয়ে আসছে ওটা। মুখ নিচে করে রাখায় দেখতে পায়নি ও। কিন্তু ওয়ার্লউইন্ড দেখতে পেয়েছে। ওটা তার নাকের উপর দিয়ে পিছলে যাবার সময় ভয়ানকভাবে একপাশে সরে গেল। মাথা উঁচু করে ফেলায় মুহূর্তের জন্যে চোখের আড়ালে চলে গেল বর্শাটা। মনে মনে ভাবল ওটা ফেনকে লাগেনি, স্বস্তির একটা ধাক্কা বোধ করল। কিন্তু তারপরই যন্ত্রণা আর বিস্ময়ের কান্নার শব্দ কানে এলো। কোল্টের পিঠে কুঁকড়ে যেতে দেখল ওকে।
ব্যথা পেয়েছ? চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল তাইতা। কিন্তু ফেন জবাব দিল না। তারপর ওয়ার্লউইন্ডের শরীরের পাশে বর্শাটা ঝুলে থাকতে দেখল ও। ওর পেছনে মাটিতে ঘেঁষটাতে ঘেঁষটাতে আসছে।
কোল্টের পেছনে উইন্ডস্মোককে ঘুরিয়ে নিল তাইতা, সাথে সাথে দেখল বর্শার মাথা ফেনের নগ্ন উরুতে গেঁথে আছে। লাগাম ছেড়ে দুই হাতে কোল্টের ঘাড় ধরে রেখেছে ও। ওর দিকে ফিরল সে। তাই দেখল মেয়েটার চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, ওর দিকে তাকানোর সময় মনে হচ্ছে ওর চোখজোড়া চেহারার অর্ধেকটা ভরে রেখেছে। জমিনের উপর দিয়ে লাফিয়ে যাবার সময় বর্শার বাটটা ধাক্কা দিচ্ছে, ঠেলা মারছে। ফলাটার তীক্ষ্ণ ধার ওর মাংসের ভেতর নিষ্ঠুরভাবে কাজ করে চলেছে, বুঝতে পারল তাইতা, ক্ষতস্থানটাকে আরও বড় ও বিপজ্জনক করে তুলছে। ফেমেরাল আর্টারির খুব কাছেই বিঁধেছে ওটা। সবুজ রক্তবাহী ধমনী ছিঁড়ে ফেললে কয়েক মিনিটের মধ্যেই মারা যাবে ও।
শক্ত করে এঁটে থাকো, প্রিয়া আমার, ডেকে বলল ও। কাঁধের উপর দিয়ে পেছনে তাকাল একবার। একদল বাসমারাকে ওদের পিছে ধেয়ে আসতে দেখল। বনের ভেতর দিয়ে সবেগে ধেয়ে আসার সময় হাঁক ছাড়ছে। থামা চলবে না। থামলে নিমেষে আমাদের উপর চড়াও হবে ওরা। তোমাকে নিতে আসছি আমি।
তলোয়ার বের করে কোল্টের পাশে চলে এলো তাই। হিসাব করে আঘাত হানল। মনে হচ্ছে মেয়েটার এমনি যন্ত্রণাকতর চেহারা দেখার পর অনেক আগে হারিয়ে গেছে বলে ভেবেছিল যে শক্তি তা ফের ফিরে এসেছে। দোল খাওয়া বর্শার দিকে সমস্ত মনোযোগ নিবদ্ধ বরল ও। ভারি ব্রোঞ্জের ফলাটা ঘোরানোর সময় শক্তির একটা মন্ত্র উচ্চারণ করল ও। কিদাশ!
ওর হাতের মুঠোয় অস্ত্রটা যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে মনে হলো। নিখুঁত ভারসাম্যের ফলার উপর একটা বিন্দু থাকে, যেখানে আঘাতের সম্পূর্ণ ভর ও শক্তি কেন্দ্রিভূত। ফলার শ্যাংকটাকে চামড়ার বাঁধনের ঠিক এক আঙুল উপরে শক্ত কাঠের বাটটাকে ধরেছে সেখান দিয়ে ছিন্ন করল যেন ওটা একটা সবুজ ডাল। বাটটা পড়ে গেল। মুহূর্তের জন্যে ফেনের মুখে স্বস্তির ছাপ দেখতে পেল ও।
তোমাকে নিতে আসছি আমি, ওকে বলল তাইতা, আবার খাপে ভরল ফলাটা। তৈরি থেকো। উইন্ডস্মোককে ওর কোল্টের পাশে নিয়ে এলো ও। আস্থার সাথে ওর দিকে হাত মেলে দিল ফেন। হাত বাড়িয়ে ওর কোমর জড়িয়ে ধরল তাইতা, ফাঁকা জায়গার উপর দিয়ে তুলে নিয়ে এলো। ওকে উহন্ডস্মোকের পিঠে একপাশে করে জিনের উপর বসিয়ে দিতেই গলা জড়িয়ে ধরল ফেন।
কী যে ভয় পেয়েছিলাম, তাইতা, ফিসফিস করে বলল ও, তুমি আসার আগ পর্যন্ত। এখন জানি আর কোনও সমস্যা নেই।
শক্ত করে ধরে রাখো, বলল তাইতা। নইলে সব কেঁচে যাবে। দাঁত দিয়ে ফেনের টিউনিকের হেম থেকে এক টুকরো লিনেন ছিঁড়ে নিল ও, ওর বর্শার ভাঙা অংশ ক্ষতস্থানে চেপে ধরে লিনেন দিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল। এখন অনেক সুন্দর আর পরিষ্কার হয়েছে, বলল ও। তবে আমার দেখা সবচেয়ে সাহসী মেয়ে তুমি। আমরা তামাফুপায় যা নওয়া পর্যন্ত ওটা শক্ত করে আঁকড়ে থাকবে।
পিছু ধাওয়ারত বাসমারা পিছিয়ে গেল। গাছপালার ভেতরে অচিরেই দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেল ওরা। লাগাম টেনে ঘোড়াগুলোকে দুলকি চালে হাঁকাতে পারল ওরা। তারপরেও দিগন্তের ওপাশে সূর্য ডুব দেওয়ার আগই তামাফুপার তোরণ পার হয়ে এলো।
ফাঁড়ি সশস্ত্র অবস্থায় রাখো মেরেনকে নির্দেশ দিল তাইতা। এক ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই ফের চড়াও হবে শয়তানগুলো। উইন্ডম্মেকের পিঠ থেকে ফেনকে নামাল ও। ওদের কুঁড়েয় নিয়ে এলো। আস্তে করে শুইয়ে দিল মাদুরে।
৫. বর্শার ফলা
বর্শার ফলার চারপাশে জমাট বাঁধা কালো রক্ত ধুয়ে ফেলার সময় আশ্বাসের ভঙ্গিতে ফেনের সাথে কথা বলল তাইতা। তারপর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ওর পায়ের ক্ষত পরীক্ষা করল। অপরাশেনের জন্যে তৈরি না হওয়া পর্যন্ত বেঁধে রাখা লিনেনের বাঁধন খুলবে না ও।
তুমি বরাবরই দেবতাদের প্রিয় পাত্র, অবশেষে বলল তাইতা। ধমনী থেকে তোমার কনে আঙুলের নখের সমান দূর দিয়ে চলে গেছে ফলাটা। আমরা না থামলে তীক্ষ্ণ ফলাটার ভেতরে নড়াচড়া না থামালে ছিঁড়ে ফেলত ওটা। এখন, চুপ করে শুয়ে থাকো, তোমার জন্যে একটা পানীয় তৈরি করে দিচ্ছি। একটা সিরামিকের বাটিতে, লাল শেপেন পাউডারের খানিকটা আন্দাজ করে নিয়ে কেন্দ্রীয় ফায়ারপ্লেসে রাখা পাত্র থেকে গরম পানি নিয়ে ঢালল। এটা খেয়ে নাও, ব্যথা থেকে রেহাই দেবে তোমাকে, ঘুমঘুম লাগবে।
