আরও এক মুহূর্ত বেশি সময় তাকিয়ে রইল ওরা, তারপর প্রতিক্রিয়া দেখাল মেরেন। বাসমারা শয়তান বলে উঠল ও। পিচ্চিটা একটা টোপ ছিল।
ছেলেটা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে বড় জোর পঞ্চাশ কদম দূরে নিবিড় ঢঙে বসে আছে ওদের সারিগুলো। কাঠের মুগুর, লম্বা বর্শা আর তীক্ষ্ণ পাথরের ডগা লাগানো ছোট ঘাই মারার আসেগেইতে সশস্ত্র। পিঠের ওপর ঝোলানো র-হাইড বর্ম, যুদ্ধের মুখোশের মতো একটা ভাব তৈরি করতে ওদের চেহারা রঙিন কাদায় লেপা। মাথায় পশম আর পালকের শিরস্ত্রান, হাতির দাঁতের পিন নাক আর কানের লতি ফুটো করেছে। হাতির দাঁত আর উটপাখির খোলের
অন্যদিকে ব্রেসলেট আর অ্যাঙ্কলেট হাত পা অলঙ্কৃত করেছে।
তাইতা ও মেরেন ওদের দিকে তাকিয়ে থাকার সময়ই বিরক্ত করা মৌচাকের গুঞ্জনের মতো একটা শব্দ বেরিয়ে এলো নিবিড়ভাবে বসে থাকা দলটার ভেতর থেকে। একক সমন্বিত ঢঙে যুদ্ধের বর্ম আলগা করল ওরা, বর্শা দিয়ে তাল ঠুকতে লাগল ওগুলোর ওপর। তারপর যুদ্ধ সঙ্গীতে ফেটে পড়ল ওরা। গভীর সুরেলা কণ্ঠস্বর ক্রমে চড়তে লাগল, ঢাকের আওয়াজের সাথে বাড়ছে। অ্যান্টিলোপের শিঙ্গার আওয়াজে ছিন্ন হলো সেই আওয়াজ। এটা ছিল সৈন্যদের প্রতি উঠে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত। একসাথে দল বেধে ঢাল বেয়ে উঠতে শুরু করল ওরা।
ঘোড়ার কাছে ফিরে চলো, বলল তাইতা।
ওদের আসতে দেখল ফেন, উইন্ডস্মোক আর মেরেনের ঘোড়াসহ দ্রুত ছুটে এলো ওদের সাথে যোগ দিতে। ঝটপট জিনে উঠে বসল ওরা, বাসমারা যোদ্ধারা ওদের পেছনে চূড়া পেরিয়ে ধেয়ে আসতে শুরু করতেই ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিল। হানারি আর টহলদারদের সদস্যরা যেখানে অপেক্ষা করছিলে ছুটে চলল সেদিকে।
ওরা আগেই আমাদের ঠেকাতে লোক পাঠিয়ে দিয়েছে, বলে উঠল ফেন, কাবের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বনের দিকে ইঙ্গিত করল ও। এবার গাছপালার ন, বিভিন্ন অবয়ব আলাদা করতে পারল ওরা, ওদের ঘেরাও করতে তেড়ে আসছে।
আমার রেকাবের রশি ধরো! নাকোন্তোর উদ্দেশে চিৎকার করে বলল তাইতা। লুপ থেকে ঝাঁকি মেরে বাম পা বের করে নিতেই নাকোন্তো আঁকড়ে ধরল সেটা।
মেরেন, তোমার অন্ধ দিক কাভার করতে ইম্বালিকে তুলে নাও। বাঁক নিল মেরেন, ডান পাশের লুপটা কেড়ে নিল ইম্বালি। ঘোড়া টেনে নিয়ে চলল ওকে আর নাকোন্তোকে। মাটিতে পিছলে যাচ্ছে ওদের পা।
জোরসে চলো! চিৎকার করে বলল তাইতা। ওরা ঘিরে ফেলার আগেই বেরিয়ে যেতে হবে। বাসমারাদের ভেতর ক্ষিপ্র সওয়ারিরা অন্য সঙ্গীদের চেয়ে সামনে এগিয়ে আসছে। ফেন, মেরেন আর আমার মাঝখানে থাকো। আমাদের কাছ থেকে আলাদা হয়ো না।
ছুটন্ত বাসমারাদের চারজন ওদের একেবারে সামনে এসে পড়ল, তাইতা যে ফোকরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল সেটাকেই রুদ্ধ করে দিতে যাচ্ছে। আগুয়ান সওয়ারিদের মুখোমুখি হতে ঘুরে দাঁড়াল ওরা। লম্বা বর্শা পিঠে ঝোলানো থাকায় অস্ত্র ব্যবহারের জন্যে হাত মুক্ত। ওদের ক্ষুদে বাঁকানো ক্যাভালরি তীর পাশ কাটিয়ে গেল তাইতা আর মেরেন। ঘোড়ার পিঠ থেকে ছোঁড়ার জন্যে নকশা করা হয়েছে ওগুলোর। কাছে আসামাত্রই কাঁধের উপর থেকে ছুঁড়েছে। লাগাম বাহনের কাঁধের উপর ফেলে পা আর হাঁটুর চাপে ঘোড়াকে আগে বাড়িয়ে সোজা বর্শাধারীদের দিকে এগিয়ে গেল ওরা। একজন অশ্বারোহী বর্শা ছুঁড়ে মারল। মেরেনকে লক্ষ্য করেছিল সে, কিন্তু অনেক লম্বা পাল্লা থাকায় প্রতিক্রিয়া দেখানোর মতো সময় পেল মেরেন। পায়ের আঙুলের স্পর্শে বে-টাকে ঘুরিয়ে নিল ও, ওর বাম কাঁধের উপর দিয়ে উড়ে গেল বর্শাটা। নিজের ধনুক তুলে নিয়ে পরপর দ্রুত তীর ছুঁড়ল ও। একটা লোকটার মাথার প্রায় এক হাত উপর দিয়ে উড়ে চলে গেল-আরও পঞ্চাশ কদম সামনে-এমনি অল্প দূরত্বে তীরটা দরুণ শক্তিশালী। কিন্তু দ্বিতীয় তীরটা ঠিক বুকের মাঝখানে গিয়ে আঘাত করল বাসমারার, শরীর ভেদ করে বের হয়ে গেল। রক্তের ফোয়ারা তুলে দুই কাঁধের হাড়ের মাঝখান দিয়ে বের হয়ে এলো ওটা। জমিন স্পর্শ করার আগেই অক্কা পেল সে।
ওদিকে বর্শা ছোঁড়ার জন্যে হাত পেছনে নিয়ে গেছে ডান দিকের দ্বিতীয় অশ্বারোহী। এই লোকও মেরেনের দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করছিল। মেরেনের অন্ধ এলাকায় রয়েছে সে। ওকে দেখতে না পাওয়ায় আত্মরক্ষার প্রয়াসই পেল না মেরেন। রেকাবের রশিতে ভর দিয়ে বাইরে ঝুঁকে পড়ল ইম্বালি, ছুঁড়ে মারল ওর কুড়োল, বাতাসে পাক খেয়ে উড়ে গেল ওটা। পেছনের পায়ের উপর ছিল বাসমারার শরীরে ভর-বর্শা ছুঁড়ে মারার মুহূর্তে ছিল সে, পাশ কাটানো বা বাউলি কাটার উপায় ছিল না-কপালের ঠিক মাঝখানে লাগল কুড়োলটা, খুলির গভীরে বসে গেল। পাশ দিয়ে ঝড়ের বেগে চলে যওয়ার সময় ওটা উদ্ধার করতে ঝুঁকে পড়ল ইম্বালি। তৃতীয় বর্শাধারীকে লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়ল তাইতা। ছুঁড়ে মারতে যাচ্ছিল সে হাতের অস্ত্র, ফেলে দিল সেটা, পেট থেকে তীর বের করে আনার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু গভীরে বসে গেছে ফলাটা।
চতুর্থ ও শেষ যোদ্ধা অটল রইল। বর্শা ছুঁড়ে মারার জন্যে তৈরি সে। ডান কাঁধের উপর রাখা তার বর্শার হাতল। যুদ্ধের উন্মত্ততায় লাল হয়ে আছে তার চোখজোড়া। তাইতা লক্ষ করল ফেনের দিকে দৃষ্টি তার। ওয়ার্লউইন্ডের পিঠে বসা ফেন চমৎকার লক্ষ্যবস্তু। ভারি বর্শাটা ওর দিকে ছুঁড়ে মারার কসরত করতে গিয়ে মুখ বাকাল বাসমারা।
