এখান থেকে কিয়োগার দূরত্বের কথা ভাবলেও এতদিনে ওদের আবার ফিরে আসার কথা, মেরেনকে বলল তাইতা, ক্যাম্পফায়ারের পাশে বসে রাতের খাবার খাচ্ছিল ওরা। কাল আমি আর তুমি এলাকা রেকি করতে বেরুব একবার।
আমিও যাব তোমাদের সাথে, বলে উঠল ফেন।
সেটা সময় হলে দেখা যাবে, গম্ভীর কণ্ঠে বলল তাইতা।
ধন্যবাদ, প্রিয় তাইতা, বলল ফেন, মিষ্টি, উজ্জ্বল চেহারায় হাসল।
আমি তা বোঝাইনি, জবাব দিল তাইতা, কিন্তু ওরা দুজনই জানে তাই বুঝিয়েছে।
বাচ্চাটা সীমাহীন আকর্ষণীয়। ওর উপস্থিতিতে খুশি হয়ে ওঠে তাই। মেয়েটা ওর আপন সত্তার একটা বর্ধিত অংশ হয়ে গেছে বলে মনে হয়।
টহল পার্টি যখন রওয়ানা হলো, তাইতা ও মেরেনের মাঝখানে রইল ফেন। নাকোন্তো ও ইদালি চিহ্ন পড়ার জন্যে ট্র্যাকার হিসাবে ওদের সামনে রইল। দীর্ঘ পায়ের কল্যাণে ইদালি অনেক লম্বা পথে নাকোন্তোর সাথে পাল্লা দিতে পারে। হাবারি আর দুই সৈনিক রয়েছে পেছনে। একবারের জন্যে খাপে ওর কোমরে ঝোলানো খাপে ভরা তলোয়ার বহন করছে তাইতা, তবে ছড়িটা রয়েছে ওর হাতে।
পাহাড়ের চূড়া বরাবর আগে বাড়ল ওরা। এখান থেকে উপত্যকার পূর্ণ বিস্তারের দিকে নজর চালাতে পারছে। বামে তরঙ্গ তুলে চলে গেছে এলাকাটা, ঘন বনে ছাওয়া। রিজের নিচে হাতির বিরাট পাল চরে বেড়াতে দেখল ওরা। ওদের বিশাল ধূসর শরীর সম্পূর্ণ দেখা যাচ্ছে। ওদের অসীম শক্তির ফলে খানিক পর পরই বড় আকারের ফল ধরা গাছ উপড়ে পড়ার শব্দ হচ্ছে। কোনও গাছ একটা জানোয়ারের পক্ষে বেশি মজবুত হলে অন্য মদ্দাগুলো এগিয়ে আসছে তাকে সাহায্য করতে। ওদের সম্মিলিত শক্তির সামনে টিকে থাকতে পারছে না কোনও গাছই।
গোত্রের লোকজন এলাকা থেকে পালিয়ে যাওয়ায় হাতির দল আর অত্যাচারের মুখে পড়েনি, মানুষের অনেক কাছাকাছি এসে পড়া সত্ত্বেও সতর্ক হলো না ওরা। ওদের প্রথম আবির্ভাবে পালিয়ে যাওয়ার বদলে বরং ঘোড়সওয়াররা পাশ দিয়ে চলে যাবার সময় অটল দাঁড়িয়ে রইল। মাঝে মাঝে হয়তো একটা বদমেজাজি মাদী হাতি ভীতিকর প্রদর্শনীতে মেতে উঠছে, কিন্তু কোনওটাই আক্রমণ করতে এগিয়ে এলো না। বাচ্চা হাতির কাজ কারবার দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল ফেন। শক্তিশালী পশু ও সেগুলোর স্বভাব-অভ্যাস নিয়ে নানা প্রশ্নে পাগল করে তুলল ওকে।
বুনো জানোয়ার হিসাবে কেবল হাতিরই দেখা পেল না ওরা। অ্যান্টিলোপের পাল, খোলা প্রান্তরে জটলা বাধা বা অপেক্ষাকৃত লম্বা গাছের মগডালে উঠে বসে থাকা হলদে বেবুনও রয়েছে। একটা দল আতঙ্কে চেঁচামেচি শুরু করে দিল। মা বেবুনগুলো সটকে পড়ার সময় বাচ্চাগুলোকে খপ করে তুলে পেটের নিচে ঝুলিয়ে নিল। পেছনে শক্তিশালী বাহিনী গড়ে তুলল বিশাল মদ্দাগুলো। কেশর দোলাচ্ছে, মুখে হিংস্র গর্জন ছাড়ছে।
কী হয়েছে ওদের? জানতে চাইল ফেন।
চিতা বা অন্য কোনও শিকারী পশু হবে। তাই কথা বলার সময়ই ঠিক সামনে এক চিলতে ঘেসো জমি থেকে একটা অসম্ভব সুন্দর হলদে-কালো বুটিদার বেড়াল বের হয়ে এলো। লেপার্ডের চিহ্নগুলো পটভূমির সাথে নিখুঁতভাবে মিশে গেছে।
আবার ঠিক বলেছ তুমি, তাইতা। দুনিয়ায় জানার মতো সবই তোমার জানা। সমীহের সাথে বলল ফেন।
ঢাল বেয়ে কোণাকুণিভাবে পরের পাহাড়সারির দিকে উঠতে শুরু করল ওরা, কিন্তু চূড়ায় পৌঁছার আগেই দিগন্তের কাছে যেব্রার একটা বিরাট পাল ধেয়ে গেল। ওদের খুরের ঘায়ে শুকনো মাটি আলগা হয়ে গেল, শূন্য আকাশের বুকে অনেক উপরে উঠে গেল ধুলোর মেঘ। ঘোড়াগুলোর দিকে তেমন একটা নজরই দিল না ওরা। মনে হয় ওদের কয়েক কদম পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ওদের জাতিভাই ধরে নিয়েছে।
নিশ্চয়ই কোনও কারণে ভয় পেয়েছে ওরা, বলল মেরেন।
আগুন নয়তো মানুষ, সায় দিয়ে বলল তাইতা। অন্য কোনও কারণে এমন স্ট্যাম্পিড সৃষ্টি হতে পারে না।
দাবানলের কোনও ধোয়া চোখে পড়ছে না, বলল মেরেন। মানুষই হবে। এবার সিরিয়াসভাবে আগে বাড়ল ওরা। হেঁটে দিগন্তে রেখার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ আবার চিৎকার করে উঠল ফেন, বাম দিকে ইশারা করল। একটা বাচ্চা! একটা কালো বাচ্চা!
তিন চার বছরের একটা নগ্ন বাচ্চা। বাঁকা পায়ে ঢাল বেয়ে আনাড়ী পায়ে উঠে যাচ্ছে। প্রতি পদক্ষেপে দোল খাচ্ছে ওর ছোট্ট পেছনটা।
ওকে তুলে আনতে যাচ্ছি, বলে উঠল ফেন। ছোেটার জন্যে তাগিদ দিল ওয়ার্লউইন্ডকে। কিন্তু ওর লাগাম টেনে ধরল তাই।
ফেন, পাকা টোপ মনে হচ্ছে।
ওকে আমরা চলে যেতে দিতে পারি না, প্রতিবাদ করল ফেন। বাচ্চাটা দিগন্ত রেখার ওপারে উধাও হয়ে গেল। ও হারিয়ে গেছে। একা পড়ে গেছে।
আমরা ওকে অনুসরণ করব, সায় দিল তাইতা। তবে সাবধানে। ওয়ার্লউইভের লাগাম ছাড়ল না ও, এগিয়ে চলল ওরা। রিজের এক শো কদম নিচে এলো ও।
চলো, মেরেন! নির্দেশ দিল ও। জিন থেকে নেমে এলো ওরা, ফেনের হাতে লাগাম তুলে দিল।
এখানে থাকো, ঘোড়াগুলোকে সামলে রাখো, তবে জোরসে ছোটার জন্যে তৈরি থেকো, ওকে বলল তাইতা। পায়ে হেঁটে আগে বাড়ল মেরেন আর ও। পাহাড়ের দূরের ঢালের উপর দিয়ে তাকানোর সময় মাথা উঁচু করতে একটা ছোট ঝোঁপ কাজে লাগাল ওরা। ঠিক ওদের নিচে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা, গোলাকার চেহারায় আমোদিত হাসি নিয়ে ওদের মুখোমুখি। দুই হাতে ছোট্ট শিশ্ন ধরে রেখেছে, রোদে পোড়া বালির উপর হলদে ধারায় পেশাব করছে। চমৎকার একটা দৃশ্য, মুহূর্তের জন্যে মুগ্ধ করে রাখল সবাইকে। সহানুভূতির সাথে হাসতে যাচ্ছিল মেরেন, কিন্তু ওর বাহু আঁকড়ে ধরল তাইতা।পেছনে দেখ!
