রোজ সন্ধ্যায় মেরেনকে খাইয়ে, ওর ডান চোখের শূন্য কোটরে ব্যান্ডেজ বাঁধতে তাইতাকে সাহায্য করার পর ওয়ার্লউইন্ডের কাছে চলে আসে ফেন, ওর পছন্দের ধুরা পিঠা খাওয়ায়।
নতুন সীমানার প্রাচীরের বাইরে পড়ে যাওয়া পুরোনো শহরের বাকি অংশে আগুন ধরাতে অনুকূল বাতাসের অপেক্ষা করছে তাই। ছাউনি এবং কাঠের দেয়ালে শুকিয়ে খটখটে হয়েছিল, দ্রুত পুড়তে লাগল সেগুলো, বাতাসের ধাক্কায় নতুন দেয়ালের দিক থেকে দূরে ভেসে গেল অগ্নিশিখা। সেদিন রাত নেমে আসতে আসতে পুরোনো শহর জ্বলন্ত ছাইয়ের মাঠে পরিণত হলো।
এবার ভোলা মাঠের উপর দিয়ে আক্রমণ করতে আসুক বাসমারার দল, সন্তোষের সাথে বলল হিলতো, ব্যটাদের হকচকিয়ে দেব।
এবার সীমনার সামনে মার্কার বসাতে পারো, ওকে বলল তাইতা। বিশ, পঞ্চাশ ও এক শো কদম দূরে দুরে নদীর শাদা পাথর এনে স্তূপ করল ওরা, যাতে তীরন্দাজরা প্রতিপক্ষ হানাদারদের ঠিকমতো নিশানা করতে পারে।
তীর বানাতে নদীর তলদেশ থেকে শুকনো আগাছা কেটে আনতে ইদালি ও তার সঙ্গীদের পাঠাল তাইতা। কেবুই দুগের অস্ত্রাগার থেকে অতিরিক্ত তীরের ফলা নিয়ে এসেছে ও। সেগুলো কাজে লাগানোর সময় দেয়ালের নিচে পাহাড়ের ধারে একটা পাথরের উঁচু হয়ে থাকা অংশ দেখতে পেল। পাথরের টুকরো কেটে বর্শার ফলায় রূপান্তরিত করার কায়দা মেয়েদের শিখিয়ে দিয়েছে ও। দ্রুত শিখে নিয়েছে। ওরা। বাকলের রশি দিয়ে আগাছার দণ্ডে বেঁধে নিয়েছে ফলাগুলো। কঠিন ও শক্ত করে তুলতে পানিতে ভিজিয়ে নিয়েছে। দেয়ালের বিশেষ বিশেষ জায়গায় ঠেস দিয়ে রেখে দিয়েছে বাড়তি তীরগুলো।
দশ দিনের মধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ হলো। পুরুষ ও ইম্বালির মেয়েরা অস্ত্রশস্ত্র শানিয়ে নিল; সম্ভবত শেষ বারের মতো সাজসরঞ্জাম পরখ করে নিল।
একদিন বিকেলে লোকেরা যখন রাতের খাবার খেতে আগুনের পাশে জড়ো হয়েছে, হঠাৎ করে একটা বেমানান জোড়া আগুনের আলোয় এসে হাজির হতেই আকিস্মিক আলোড়ন আর হুল্লোড় লেগে গেল। টলমল পায়ে দাঁড়িয়ে আছে মেরেন, কিন্তু ফেনের কাঁধে হাত রেখে নিজেকে সামলে তাইতা ক্যাপ্টেনদের নিয়ে যেখানে বসেছিল সেখানে এলো। সবাই লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল, ওকে ঘিরে হাসি ঠাট্টা, আলিঙ্গন করতে লাগল। দ্রুত সেরে ওঠায় অভিনন্দন জানাল। ওর শূন্য কোটর ঢেকে রেখেছে একটা লিনেনের ব্যান্ডেজ। আগের চেয়ে মলিন ও শীর্ণ দেখাচ্ছে ওকে। তবে পুরোনো দৃঢ়তার সাথে হাটার প্রয়াস পাচ্ছে ও। সমান শক্তিতে অফিসারদের আক্রমণ ঠেকাচ্ছে। অবশেষে তাইতার সামনে এসে দাঁড়াল ও। ওকে স্যালুট করল।
হো, মেরেন, বিছানায় শুয়ে শিবিরের সব মেয়ের সেবা পেতে পেতে ক্লান্ত? হাসি মুখে কথা বলেছে তাইতা, কিন্তু ফেনের কমনীয় কাঁধে কঠিন যোদ্ধার হাত দেখে অনুভূত ঈর্ষার খোঁচাটা আড়াল করতে কষ্ট হলো ওর। ওর জানা আছে শরীর আর সৌন্দর্য আরও পরিপূর্ণ হয়ে ওঠার সাথে সাথে এই ঈর্ষা আরও বেড়ে উঠবে। ওর অন্য জীবনেও এমনি ক্ষতিকর আবেগের মোকাবিলা করেছে ও।
*
পরদিন সকালে তীরন্দাজদের সাথে অনুশীলনের টিলায় ছিল মেরেন। প্রথম প্রথম একটা মাত্র চোখ দিয়ে নিজেকে সামলাতে গিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখতে কষ্ট হচ্ছিল ওর, কিন্ত ভয়ানক মনোসংযোগের সাহায্যে অবাধ্য ইন্দ্রিয়কে বাগে এনে নতুন করে সেগুলোকে দীক্ষা দিল ও। এরপরে সমস্যা হলো লক্ষ্যবস্তুর দূরত্ব আন্দাজ করা ও নিশানার উপর স্থির থাকা। ওর তীর হয় লক্ষ্যবস্তুর কাছে পৌঁছানোর আগেই মাটিতে লুটাচ্ছে বা অনেক উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। গম্ভীর চেহারায় কাজ চালিয়ে গেল ও। রানি লস্ত্রিসের সেনাবাহিনীতে সকল সেনাদলের ভেতর সেরা তীরন্দাজ ছিল তাইতা, ওকে সবক দিতে লাগল সে, প্রথম তীরটাকে একটা মার্কার হিসাবে ছুঁড়ে ওটাকে দ্বিতীয় তীরের লক্ষ্য স্থির করার কাজে ব্যবহার করতে শেখাল। ঠিক পরপরই সেটা ছুঁড়ে দিল সে। অচিরেই প্রথমটা শূন্যে থাকতেই দ্বিতীয় তীর ছুঁড়তে সক্ষম হয়ে উঠল মেরেন। বিশ্রী কোটরটা ঢাকতে চামড়ার একটা পট্টি বানিয়ে দিল ফেন ও ওর শিলুক স্ত্রী। ওর ত্বক স্বাভাবিক স্বাস্থ্যবান রঙ ফিরে পেল, অবশিষ্ট চোখ তার পুরোনো ঝিলিক।
রোজ সাকলে অশ্বারোহী টহল দল পাঠায় তাইতা, কিন্তু রোজই বাসমারা বাহিনীর কোনও আলামত না দেখার খবর নিয়েই ফিরে আসে ওরা। ইম্বালি আর ওর অন্য মেয়েদের সাথে ব্যাপারটা নিয়ে পরামর্শ করল তাইতা।
সর্দার বাসমাকে ভালো করে চিনি আমরা। প্রতিশোধ পরায়ণ, নিষ্ঠুর মানুষ, বলল ইম্বালি। আমাদের কথা ভোলেনি সে। বিশাল রীফের উপত্যকায় বিক্ষিপ্ত অবস্থায় আছে ওর বাহিনী-নদীর গোর্জ আর হ্রদের জলাভূমিতে। ওদের জড়ো করতে সময় লাগবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে আসবে। এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকতে পারি আমরা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি শেষ হয়ে যাওয়ায় তাইতার হাতে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কাজ নেই। কাদামাটির পিণ্ড আর ঘাস দিয়ে লম্বা খুঁটির মাথায় মানুষের নকল মাথা বানানোর কায়দা শিখিয়ে দিয়েছে মেয়েদের। দূর থেকে দেখে বিশ্বাসযোগ্য মনে না হওয়া পর্যন্ত এসবে প্রাকৃতিক রঙ লাগিয়েছে ওরা। তীর বানানোর চেয়ে একাজটা বেশি ভালো লাগল ওদের। অবশ্য, অপেক্ষার ফলে ওদের স্নায়ুর উপর ভালো চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
