এখন চলে গেছে সে। তোমার মেয়েরা ওকে হটিয়ে দিয়েছে, ওকে শান্ত ও আশ্বস্ত করার প্রয়াস পেল তাই।
কিছুই মানতে চাইল না কালুলু। সে ফিরে আসবে, হাত বাড়িয়ে তাইতার কব্জি আঁকড়ে ধরল ও। খাটিয়ার উপর দিয়ে ঝুঁকে পড়ল। শহরে গিয়ে প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে আপনাকে। বাহিনী নিয়ে ফিরে আসবে বাসমা।
তামাফুপা ছেড়ে যাবার সময় তোমাকে নিয়ে যাব আমি, কালুলু। তোমার সাহায্য ছাড়া আমাদের ডাইনীর অনুসন্ধান শেষ হবে না।
আমার পেটের গভীরে রক্ত ক্ষরণ টের পাচ্ছি। আপনার সাথে যাওয়া হবে না আমার।
সূর্যাস্তের আগেই মারা গেল কালুলু। তামাফুপার সীমানার ঠিক বাইরে একটা বিরাট পরিত্যক্ত পিপড়ার ঢিবির একপাশে একটা কবর খুঁড়ল ওর চার দেহরক্ষী। এক টুকরো অপরিষ্কার লিননের কাপড়ে লাশে কাফন পরাল তাইতা, তারপর সঁতসেঁতে কাদার সুড়ঙে নামিয়ে দিল ওটা। বড় বড় পাথরে টুকরো দিয়ে ঢেকে দিল যাতে হায়েনার দল খুঁড়ে লাশ বের করে আনতে না পারে।
তোমার পূর্ব পূরুষের দেবতারা তোমাকে স্বাগত জানাবেন, শামান কালুলু, তুমি ছিলে সত্যের পক্ষে, বিদায় জানাল তাইতা।
কবর থেকে সরে আসার পর চার দেহরক্ষী ওর সামনে এসে দাঁড়াল। শিলুক ভাষায় সবার হয়ে কথা বলল ইম্বালি। আমাদের মনিব চলে গেছেন। দেশ থেকে অনেক দূরে একা পড়ে গেছি আমরা। আপনি একজন শক্তিমান শামান, কালুলুর চেয়েও মহান। আমরা আপনাকে অনুসরণ করব।
নাকোন্তোর দিকে তাকাল তাইতা। এই মেয়েদের সম্পর্কে কী ধারণা তোমার? ওদের সাথে নিলে তোমার অধীনে গ্রহণ করবে? জিজ্ঞেস করল ও।
গম্ভীরভাবে প্রশ্নটা উল্টেপাল্টে দেখল নাকোন্তো। ওদের লড়তে দেখেছি। ওদের সাথে পেলে খুশিই হবো।
মাথাটাকে আঁকাল ভঙ্গিতে কাত করে ওর উপস্থিতি ও কথাগুলো মেনে নিল ইম্বালি। যতদিন আমাদের মনে চাইবে ততদিন আমরা এই তোতলা শিলুক মরদের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যাব, কিন্তু পেছনে কখনও নয়, তাইতাকে বলল সে।
নাকোন্তার সাথে প্রায় চোখে চোখ রেখে তাকাল ইম্বালি। স্পষ্ট ভসনার দৃষ্টিতে পারস্পরের দিকে তাকিয়ে রইল অসাধারণ জুটিটা। অন্তর্চক্ষু খুলল তাইতা, ওদের আভায় পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ প্রতিফলিত হতে দেখে মৃদু হাসল। ঠিকাছে, নাকোন্তো? জিজ্ঞেস করল ও।
ঠিকাছে, আবার সম্মতিসূচক বেপরোয়া একটা ভঙ্গি করল নাকোন্তো। আপাতত।
*
ফেন ও শিলুক শিবির-অনুসারীরা মেরেনের জন্যে বড়সড় একটা কুঁড়ে ঝাড় দিয়ে পরিষ্কার করে দিল। তারপর উক্ত আগুনে তাইতার কিছু বিশেষ ভেষজ লতা পোড়াল ফেন। সুবাসিত ধোয়ায় কুঁড়েটাকে আবাস করে নেওয়া পোকামাকড় আর মাকড়শা তাড়াল। টাটকা ঘাসের একটা তক্তপোষ বানাল ওরা, তারপর মেরেনের মাদুর বিছিয়ে দিল ওটার উপর। ব্যথায় এমন কাতড়াচ্ছে সে, ফেনের বাড়িয়ে ধরা বাটি থেকে খাবার জন্যে মাথা পর্যন্ত তুলতে পারছে না। মেরেন ফের দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার মতো সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত চার ডিভিশনের দায়িত্ব নিতে হিলতো-বার-হিলতোকে পদোন্নতি দিল তাইতা।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যাচাই করতে গোটা শহর জরিপ করল তাইতা ও হিলতো। পানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই ছিল ওদের প্রথম চিন্তা। গ্রামের ঠিক মাঝখানে একটা গভীর কূপ রয়েছে। কূপের সাথে একটা সংকীর্ণ মাটির সিঁড়ি নেমে গেছে পানির দিকে। পানি বেশ ভালো। শোফারের অধীনে একটা দলকে বাসমারাদের আক্রমণের প্রয়াসের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসাবে সমস্ত লাউ আর চামড়ার পানির পাত্র ভর্তি রাখার নির্দেশ দিল তাইতা। লড়াইয়ের প্রচণ্ডতার ভেতর তৃষ্ণার্ত মানুষ কুপ থেকে পানি তোলার সুযোগই পাবে না।
তাইতার পরের ভাবনার বিষয় ছিল বাইরের দেয়ালের অবস্থা। ওটাকে এখনও মেরামতযোগ্য একটা পর্যায়ে অবিষ্কার করেছে ওরা-ঘুনে খুঁটি খেয়ে নেওয়া বিশেষ কয়েকটা জায়গা ছাড়া। এটা অবশ্য অবিলম্বে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, এত বিশাল এলাকা পাহারা দিয়ে রাখতে পারবে না ওরা। তামাফুপা বিরাট শহর, এক সময় বিরাট একটা গোত্রের আবাস ছিল। দেয়ালটা পরিধির দিক থেকে প্রায় আধা লীগের মতো। এটা ছোট করে আনতে হবে আমাদের, হিলতোকে বলেছে তাইতা। তারপর শহরটা পুড়িয়ে প্রবেশপথগুলো পরিষ্কার করে তীরন্দাজদের পুরো এলাকা আয়ত্তে আনতে সাহায্য করতে হবে।
আমাদের কঠিন দায়িত্ব দিয়েছেন, ম্যাগাস, মন্তব্য করল হিলতো। জলদি কাজে নেমে পড়া দরকার।
তাইতা নতুন সীমানা ঠিক করার পর নারী-পুরুষ কাজে লেগে গেল। এখনও সবচেয়ে মজবুত খুঁটিগুলো তুলে তাইতার জরিপ করা নতুন সীমানা রেখা বরাবর পুঁতল। স্থায়ী প্রতিরক্ষা গড়ে তোলার মতো সময় নেই বলে ফোকরগুলো কিতার কাঁটা ঝোঁপ দিয়ে ভরে ফেলল ওরা। নতুন সীমানার চার কোণে চারটা উঁচু প্রহরাবানাল ওরা, উপত্যকার উপর দিয়ে চারপাশে অনেক দূর পর্যন্ত ভালোভাবে দেখা যাবে এখান থেকে।
সীমানা বরাবর বনফায়ারের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিল তাইতা। জ্বালানোর পর রাতের বেলায় বেলায় সীমানা প্রাচীর আলোকিত রাখবে ওগুলো। কাজটা শেষ হলে দেয়াল ঘিরে একটা অন্তস্থ প্রাচীর গড়ে তুলল ও, বাসমারারা শহরে ঢুকে পড়লে এটাই হবে ওদের শেষ প্রতিরক্ষা। এই অন্তস্থ ঘাঁটির ভেতর ধুরার অবশিষ্ট ব্যাগ, বাড়তি অস্ত্র-শস্ত্র আর অন্যান্য মূল্যবান রসদ তুলে রাখল ও। অবশিষ্ট ঘোড়াগুলোর জন্যে একটা আস্তাবল বানাল ওরা। উইন্ডস্মোক ও ওটার বাচ্চা এখনও ভালো অবস্থায় আছে, কিন্তু বাকিগুলো অনেকেই দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়ার ধকল সইতে গিয়ে হয় অসুস্থ বা মরতে বসেছে।
