কালুলুকে ঘিরে ধরে চট করে পিছিয়ে এলো ইম্বালি আর অন্য মেয়েরা, খাটিয়ার র-হাইড স্ট্র্যাপ ধরে তুলে নিল ওটা। তারপর ধাক্কা মারার অস্ত্রের মতো ওটা নিয়ে ধেয়ে গেল বাসমারাদের দিকে। কুড়োলের ফলা শূন্যে পাক খেয়ে শিষ তোলার সময় বিকট স্বরে উলু ধ্বনি করতে লাগল। এ্যাচ এ্যাচ করে মাংস আর হাড়ে বিধতে লাগল সেগুলো।
দ্রুত একাট্টা হলো বাসমার লোকজন। পরস্পরের সাথে লাগানো বর্ম নিয়ে ওদের মুখোমুখি হলো। ওদের মাথা লক্ষ্য করে দীর্ঘ বর্শা ছুঁড়ে দিল। একজন লুটিয়ে পড়ল, গলায় পাথরের ফলা ঢুকে পড়ায় নিমেষে প্রাণ হারাল সে। অন্যরা খাটিয়া উঁচু করে বর্মের সারির উপর আঘাত হানল। দুপক্ষই একে অন্যের উপর চাপ দিতে লাগল। বাসমারাদের একজন হাঁটু ভেঙে বসে খাটিয়ার তলা দিয়ে সারির মাঝখানের মেয়েটার পেটে আঘাত হানল। খাটিয়া ছেড়ে পেছনে পাক খেল সে। সরে যাবার চেষ্টা করল, কিন্তু ঝটকা দিয়ে বর্শা আলগা করে নিল হানাদার, ফের ওর কিডনি লক্ষ্য করে আঘাত করল। গভীরে গেঁথে গেল আঘাতটা, বর্শাটা মেরুদণ্ডের পাশ ঘেঁষে যাবার সময় এক লহমায় জীবনের জন্যে পঙ্গু করে দিল ওকে, আর্তচিৎকার করে উঠল বেচারা।
কয়েক কদম পিছিয়ে গেল কালুলুর দেহরক্ষীরা, আহত মেয়ের শূন্যস্থান পূরণ করে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল খাটিয়াটা। বৰ্ম উঁচু করে ধরল বাসামারারা, তারপর আরও একবার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তেড়ে এলো। খাটিয়ার দিকে ছুটে আসার সময় বর্মের নিচের প্রান্ত দিয়ে আঘাত হানল ওরা, কুঁচকি ও পেট ওদের নিশানা। বর্মের রেখা সামনে পেছনে আসা যাওয়া করছে। আরও দুটো মেয়ে লুটিয়ে পড়ল। একজনের উরুর উপরে লেগেছে আঘাত, ফলে ফেমারের ধমনী ছিন্ন হয়েছে। পিছিয়ে গেল সে, ক্ষতস্থানের ভেতরে আঙুল ঢুকিয়ে ধমনীর রক্তক্ষরণ থামানোর প্রয়াসে চিমটি দিয়ে ধরে রাখল। উবু হয়ে থাকায় পিঠ অরক্ষিত হয়ে পড়ল তার, এক বাসমারা মেরুদণ্ডে আঘাত হানল। দুই কশেরুকার মাঝখানে আশ্রয় নিল বর্শার ফলা। আড়ষ্ট পা হাল ছেড়ে দিল তার। ফের তাকে আঘাত করল লোকটা, কিন্তু মেয়েটাকে হত্যায় ব্যস্ত থাকায় খাটিয়ার নিচে দিয়ে বাউলি কেটে এগিয়ে এসে তার মাথায় কুড়োল বসিয়ে দিল ইম্বালি।
খাটিয়ার উপর অসমান চাপ ওটার ঘূণী কমিয়ে দিয়েছে। একপাশে অরক্ষিত পড়ে আছে কালুলু। এই মুহূর্তটাকেই বেছে নিল সর্দার বাসমা: বর্মের প্রাচীর ছেড়ে স্যাৎ করে বের হয়ে এসেই খাটিয়ার একপাশ দিয়ে ঝুপ করে বসে দৌড়ে এলো ওর দিকে। ওকে আসতে দেখল কালুলু, চট করে হাতের উপর অবস্থান নিল সে। বিস্ময়কর ক্ষিপ্রতার সাথে কিতার কাটার গাছের ঝোঁপের দিকে ধেয়ে গেল। প্রায় পৌঁছে গেছে, এমন সময় তাকে ধরে ফেলল বাসমা, দুবার আঘত করল।
বেঈমান! চিৎকার করে উঠল সর্দার। পিঠের ঠিক মাঝখানে অঘাত করল তার বর্শার ডগা। অনেক চেষ্টায় হাতের উপর খাড়া হয়ে থাকল কালুলু। লাফ দিয়ে আগে বাড়তে লাগল, কিন্তু আবার ওর নাগাল পেল বাসমা। ডাইনীর চ্যালা! আর্তনাদ করে উঠল সে। ফের আঘাত করল, এবার ক্ষুদে মানুষটার চুপসানো ঢোকানো কুঁকচি হয়ে পেটে। আর্তনাদ করতে করতে হাঁচড়ে-পাছড়ে বনের দিকে ছুটতে লাগল কালুলু। ওর ট্র্যাক অনুসরণের প্রয়াস পেল বাসমা। কিন্তু চোখের কোণ দিয়ে মাথার উপর কুড়োল তুলে ওর দিকে ছুটে আসতে দেখল ইম্বালিকে। চট করে বসে পড়ল সে, ইষালির কুড়োল তার কানের পাশ দিয়ে শিস তুলে চলে যাওয়ামাত্র ওর পাল্টা আঘাত থেকে সরে গেল, ছুট লাগাল। ওকে পালাতে দেখে অনুসরণ করল তার লোকেরা, ঢাল বেয়ে নেমে যাচ্ছে দূরে।
জাদুকর মরেছে! চিৎকার করে বলল বাসমা।
গলা মেলাল তার যোদ্ধারা। কালুলু মরেছে! শয়তার আর দানোদের লোককে মারা হয়েছে!
ওদের জন্ম দেওয়া কুত্তীদের কাছে ফিরে যেতে দাও, পিছু ধাওয়া থেকে নিজের মেয়েদের ঠেকাল ইম্বালি। আমাদের মনিবকে বাঁচাতে হবে।
ওকে ঘন ঝোপে যখন আবিষ্কার করল, কালুলু গোল বলের মতো ব্যথায় কাঁদছে। যত্নের সাথে ওকে কাটা ঝোঁপ থেকে উদ্ধার করে আনল ওরা, তারপর আবার খাটিয়ায় তুলে দিল। ওই মুহূর্তে আরও নিচের ঢাল থেকে ভেসে আসা একটা চিৎকার ওদের বাধা দিল।
সেই প্রবীন লোকের কণ্ঠস্বর, তাইতার কণ্ঠস্বর চিনতে পেরেছে ইম্বালি। ওদের পথ দেখাতে উলু ধ্বনি করল সে।
অচিরেই দৃষ্টিসীমায় এলো তাইতা ও ফেন। খুব কাছে থেকে ওদের অনুসরণ করছে মেরেনকে খাটিয়ায় বয়ে আনা দলটা।
কালুলু, তুমি মারাত্মক আহত হয়েছ, আস্তে করে বলল তাইতা।
উঁহু, ম্যাগাস, আহত নই, যন্ত্রণাদায়কভাবে মাথা নাড়ল কালুলু। মনে হচ্ছে মরে গেছি।
জলদি শিবিরে নিয়ে চলো ওকে! ইদালি ও তার তিন জীবিত সঙ্গীকে বলল তাইতা। আর তোমরা পুরুষরা! মেরেনের খাটিয়া অনুসরণকারী চারজনকে বেছে নিল ও। এখানে তোমাদের সাহায্য লাগবে!
দাঁড়ান! তাইতার হাত জাপ্টে ধরে ওকে ঠেকাতে চাইল কালুলু। বাসমার কাজ এটা, বাসমারাদের প্রধান সর্দার।
সে তোমাকে হামলা করতে গেল কেন? নিশ্চয়ই ওর শিষ্য ছিলে তুমি?
বাসমার ধারণা আপনারা মন্দির নির্মাণকারী গোত্রের লোক, এখানে এসেছেন আরও বিপর্যয় আর দুর্যোগ ঘটাতে। তার ধারণা আমি আপনাদের সাথে যোগ দিয়েছি দেশ, নদী, হ্রদ ধ্বংস আর বাসমারাদের শেষ করার জন্যে।
