ম্যাগাস, যুদ্ধে ছিল ওরা, বলল খাটিয়াবাহকদের একজন শোফার।
ওদের উদ্দেশে হক দাও! নির্দেশ দিল তাইতা। চিৎকার করে হাত নাড়ল শোফার। যোদ্ধাদের কেউই এতটুকু প্রতিক্রিয়া দেখাল না। ফের চিৎকার করল শোফার। ফ্লামিঙ্গো পালকের শিরস্ত্রাণ পরা সর্দার নির্দেশ দেওয়ার ভঙ্গিতে বর্শা উঁচু করল। সাথে সাথে দিগন্ত থেকে উধাও হয়ে গেল তার লোকজন। খাখা করতে লাগল পাহাড়ের শরীর। ওরা অদৃশ্য হওয়ার পরপরই দূরাগত একটা আর্তচিৎকার ভেসে এসে নীরবতা ভেঙে দিল।
শহর থেকে আসছে শব্দটা, চট করে সেদিকে চোখ ফেরাল ফেন। ওখানে ঝামেলা হচ্ছে।
*
লাল জোড়া-পাথরের কাছে তাইতাকে রেখে আসার পর দেহরক্ষীরা নদীর উপত্যকা দিয়ে বয়ে তামাফুপার দিকে বয়ে নিয়ে গেছে কালুলুকে। মানুষটা দারুণ বিপর্যস্ত অবস্থায় থাকায় ধীরে, সাবধানে পথ চলেছে ওরা। ওকে ওষুধের লাউ থেকে খেতে দিতে আর মুখ ভেজাতে ও ভেজা কাপড়ে মোছার জন্যে কয়েক শো গজ পরপরই থামতে হয়েছে ওদের। সূর্যের বাঁকা পথের হিসাবে উপত্যকা থেকে বের হয়ে ঢাল বেয়ে তামাফুপার তোরণের উদ্দেশে বাইতে শুরু করতে গিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা লেগে গেল।
নিবিড় কিতার কাঁটা ঝোঁপের ভেতর পৌঁছতেই এক দীর্ঘদেহী আগন্তুক ওদের সামনে এসে দাঁড়াল। কালুলু আর মেয়েরা চিনতে পারল তাকে। কেবল ফ্লামিঙ্গো পালকের শিরস্ত্রাণের কারণে নয়। খাটিয়া নামিয়ে রেখে প্রণত হলো মেয়েরা।
আমরা আপনাকে দেখেছি, মহান সর্দার, সমবেত কণ্ঠে বলে উঠল ওরা। কোনওমতে একটা কনুইয়ে ভর দিয়ে উঠে বসল কালুলু। সভয়ে তাকাল আগন্তুকের দিকে। বাসমা হচ্ছে তামাফুপা আর কিওগাদের দেশের মাঝখানে বাসিন্দা বাসমারা গোত্রের অবিসম্বাদিত সর্দার। মন্দির নির্মাণকারী ও হ্রদের গভীর থেকে লাল পাথর তুলে আনা আগন্তুকদের আগমনের আগে শক্তিমান শাসক ছিল সে। এখন তার গোত্র ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে, শাসন বিক্ষিপ্ত।
হে, শক্তিমান বাসমা, সম্মানের সাথে বলল কালুলু। আমি আপনার কুকুর।
বাসমা ছিল ওর চির শত্রু, প্রতিপক্ষ। এতদিন খ্যাতি আর মর্যাদার কারণে সুরক্ষিত ছিল কালুলু। এমনকি বাসমারাদের সর্দারও ওর মতো ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী শামানের ক্ষতি করার সাহস করে ওঠেনি। অবশ্য কালুলু জনত, নীলের বুকে বাধ ওঠার পর থেকে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল বাসমা।
তোমার উপর নজর রাখছিলাম আমি, জাদুকর, শীতল কণ্ঠে বলল বাসমা।
আপনার মতো এমন শক্তিশালী একজন সর্দার আমার মতো এক নগণ্য প্রাণীর কথা ভেবেছেন জেনে নিজেকে সম্মানিত মনে করছি। বিড়বিড় করে বলল কালুলু। ঝোঁপ থেকে বের হয়ে এলো দশজন বাসমারা যোদ্ধা। সর্দারের পেছনে অবস্থান নিল।
গোত্রের শত্রুদের পথ দেখিয়ে তামাফুপায় নিয়ে এসেছ তুমি। আমার শহর দখল করে নিয়েছে ওরা।
ওরা শত্রু নয়, জবাব দিল কালুলু। আমাদের বন্ধু, মিত্র। ওদের নেতা একজন মহান শামান, আমার চেয়েও অনেক বেশি জ্ঞানী ও শক্তিশালী। লাল জোড়া পাথর ধ্বংস করে নীল নদকে আবার প্রবাহিত করার জন্যে পাঠানো হয়েছে তাকে।
কী কাঁচা মিথ্যা এসব, ব্যাটা পাহীন বিশ্রী বস্তা? এরাও নদীর মুখে মন্দির নির্মাতাদের মতোই জাদুকর, অন্ধকারের আত্মার অভিশাপ বয়ে এনেছে অন্যদের মতোই, যারা হ্রদের জলকে টগবগিয়ে ফুটিয়েছে, পৃথিবীর বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। ওরাই গভীর থেকে পাথরটাকে তুলে এনেছে, আমাদের বাবা-মা মহান নদী রুদ্ধ করেছে।
ব্যাপারটা তা নয়, খাটিয়া থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ল কালুলু, বাসমার মুখোমুখি হতে কাটা পায়ের উপর ভর দিয়ে সামনে এগোল। ওরা আমাদের বন্ধু।
আস্তে করে বর্শা তুলে বামনের বুক তাক করল বাসমা। এটা শাস্তির একটা ভঙ্গি। নিজের দেহরক্ষীদের দিকে তাকাল কালুলু। ওরা বাসমার অধীন কোনও গোত্রের সদস্য নয়, ওদের বেছে নেওয়ার এটাও একটা কারণ ছিল। অনেক উত্তরের এক যোদ্ধা গোত্র থেকে এসেছে ওরা। অবশ্য, বাসমা ও ওর মাঝে যেকোনও একজনকে বেছে নিতে হলে ওরা কার পক্ষে যাবে নিশ্চিত করে বলতে পারবে না ও। যেন ওর অনুক্ত প্রশ্নের জবাবেই ওকে ঘিরে অবস্থান দৃঢ় করল আটজন মেয়ে। ইম্বালি-ফুল-ওদের নেতা। হয়তো বা আত্মাসাইট কুঁদে বের করা হয়ে থাকতে পারে ওর শরীর। ওর কালো ত্বকে তেল মাখানো বলে রোদ লেগে চিকচিক করছে। সূক্ষ্ম, চ্যাপ্টা পেশিতে কিলবিল করছে হাত পা। উঁচু, দৃঢ় বুক ওর, আচরিক ক্ষতের নকশা করা। দীর্ঘ গ্রীবা, গর্বিত। চোখজোড়া হিংস্র। কোমরের কাছে ফুটোয় ঝোলানো যুদ্ধ-কুড়োলটা আলগা করে নিল সে। বাকিরা ওর নজীর অনুসরণ করল।
এখন আর তোমার বেশ্যারা তোমাকে বাঁচাতে পারবে না, কালুলু, বিতৃষ্ণার সাথে নাক সিঁটকাল বাসমা। জাদুকরকে মেরে ফেল, নিজের যোদ্ধাদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলল সে। কালুলুর দিকে বর্শা ছুঁড়ে দিল।
আগেই আঁচ করেছিল ইম্বালি। সামনে ঝাঁপ দিল সে। ডান হাতে পাঁই করে ঘোরাল যুদ্ধ-কুড়োল, মাঝপথেই আঘাত করল বর্শাটাকে। সোজা শূন্যে পাঠিয়ে দিল ওটা, নিচে নেমে আসতেই বাম হাতে নিপূণভাবে ধরে ফেলল। ফলাটা এগিয়ে দিল আগুয়ান যোদ্ধাদের মোকাবিলায়। প্রথম লোকটা সোজা ওটার দিকেই তেড়ে এসে ঠিক স্টার্নামের নিচে শূলবিদ্ধ হলো। পিছিয়ে গিয়ে পেছনে ছুটে আসা লোকটার উপর পড়ল। ভারসাম্য হারাল সে। লুটিয়ে পড়ল মাটিতে পেটে বেঁধা ফলা নিয়েই হাত পা ছুঁড়তে লাগল। তার লাশের উপর দিয়ে মোহনীয় ভঙ্গিতে লাফ। দিল ইম্বালি, সামলে ওঠার আগেই পেছনের লোকটাকে কায়দা করল। মাথার ওপর তুলে আনল কুড়োলটা, পরক্ষণে কনুই থেকে আলগা করে নিল লোকটার বর্শা ধরা হাত। সাথে সাথে পাই করে ঘুরে ভরবেগ কাজে লাগিয়ে তৃতীয় লোকটার ধড় থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করল। সামনে ছুটে আসছিল সে। বসার ভঙ্গিতে লুটিয়ে পড়ল মুণ্ডহীন লাশটা, কাটা ধমনী থেকে ফিনকি দিয়ে উজ্জ্বল লাল রক্ত বের হয়ে আসতে লাগল। এবার জমিনে লুটিয়ে পড়ল সে, রক্তে ভিজে যেতে লাগল জমিন।
