তলোয়ারের ডগা দিয়ে ওটার গায়ে টোকা দিল মেরেন। নিরেট আওয়াজ উঠল। রাগের সাথে আরও জোরে আঘাত হানতে মাথার উপর তলোয়ার তুলল ও। হতাশা দূর করতে চায়। ওদের ঢেকে রাখা বাস্পের মেঘ ভেজা-ভেজা, উষ্ণ। সহসা প্রবল বৈপরীত্য অনুভব করল তাইতা: হাত ও মুখে বরফের শীতলতা। সাথে সাথে অন্তর্চক্ষু খুলল ও। মেরেন যেখানে আঘাত হেনেছে সেখানে ছাইয়ে কালো হয়ে যাওয়া পাথরে সূক্ষ্ম ফুটো দেখতে পেল। লাল আভা বিলোচ্ছে ওটা। তারপর বেড়ালের থাবার আকার নিল ওটা-ভোরের ইয়োসের প্রতীক।
পিছিয়ে যাও! হুকুম দিল তাইতা। নির্দেশ জোরাল করতে শক্তির কণ্ঠস্বর ব্যবহার করল। একই সাথে সামনে লাফ দিয়ে ফেনের হাত জাপ্টে ধরেই সাঁৎ করে সরিয়ে নিয়ে এলো ওকে। কিন্তু মেরেনকে সতর্ক করতে গিয়ে দেরি করে ফেলেছে। মেরেন সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও উজ্জ্বল জায়গাটায় আঘাত করল ওর তলোয়ারের ডগা। কাঁচ ভাঙার মতো আওয়াজ করে বাইরের দিকে বিস্ফারিত হলো ইয়োসের প্রতাঁকের ঠিক নিচে পাথরের ছোট একটা অংশ, বিচ্ছিন্ন টুকরোগুলোর একটা ঝটকা এসে লাগল ওর চোখে মুখে। বেশির ভাগই ছোট ছোট টুকরো হলেও সূচের মতো তীক্ষ্ণ। পেছনে ধাক্কা খেল ওর মাথা। তলোয়ার ফেলে দুই হাতে মুখ ঢাকল ও। হাতের ফাঁক গলে রক্ত বুকের উপর ঝরতে লাগল।
ওর দিকে ছুটে গেল তাইতা, হাত ধরে স্থির করল ওকে। জমিনে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে ফেনকে। কিন্তু হাঁছড়েপাছড়ে উঠেই ছুটে এলো সাহায্য করতে। দুজনে মিলে ধোয়া-ওঠা পাথরের কাছ থেকে মেরেনকে সরিয়ে আনল, এক চিলতে ছায়া খুঁজে বসাল ওকে।
সরে যাও! বাকি লোকদের নির্দেশ দিল তাইতা। ওদের অনুসরণ করে এগিয়ে এসেছিল ওরা, চেপে আসছিল। আমাদের কাজ করার মতো জায়গা দাও। ফেনের উদ্দেশে বলল, পানি নিয়ে এসো।
দৌড়ে গিয়ে একটা লাউ নিয়ে এলো ও। মেরেনের মুখ থেকে ওর হাত সারাল তাইতা। ভয়ে আঁতকে উঠল ফেন। ভুরু কুঁচকে ওকে চুপ থাকতে ইশারা করল তাইতা।
এখনও সুন্দর আছে আমার চেহারা? হাসার চেষ্টা করল মেরেন। কিন্তু চোখজোড়া শক্ত হয়ে এঁটে বসেছে। চোখের পাতা ভারি, রক্ত জমাট বেঁধে গেছে।
ভালোই উন্নতি হয়েছে, ওকে আশ্বস্ত করে বলল তাইতা। রক্ত ধুতে শুরু করল ও। কয়েকটা ক্ষত কেবল উপরের, তবে তিনটা বেশ গভীর। একটা ওর নাকের পাটার উপর দিয়ে গেছে, দ্বিতীয়টা গেছে ওপরের ঠোঁটের ওপর দিয়ে, আর তিন নম্বরটা সবচেয়ে খারাপ, ডান পাশের চোখের পাতা ভেদ করে গেছে। চোখের কোটরে পাথরের একটা টুকরো আটকে থাকতে দেখল তাইতা।
আমার ওষুধের ব্যাগটা নিয়ে এসো, ফেনকে বলল ও। ওদের সরঞ্জাম রাখার জায়গার দিকে দৌড়ে গেল ফেন, চামড়ার থলেটা নিয়ে ফিরে এলো।
অস্ত্রপচারের বান্ডিলটা খুলল তাইতা। প্রোবসহ একটা আইভরি ফোরসেপ বেছে নিল।চোখ খুলতে পারবে? আস্তে করে জিজ্ঞেস করল ও।
চেষ্টা করল মেরেন, বাম চোখটা সামান্য খুলল। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত চোখের পাতা কাপলেও ডান চোখটা বন্ধই রইল।
নাহ, ম্যাগাস, চাপা কণ্ঠে বলল মেরেন।
অনেক ব্যথা? দরদের সাথে জানতে চাইল ফেন। বেচারা মেরেন। ওর হাত ধরল সে।
ব্যথা? মোটেই না। তোমার ছোঁয়ায় অনেক ভালো লাগছে।
মেরেনের দাঁতের ফাঁকে এক টুকরো চামড়া গুঁজে দিল তাইতা। কামড়ে থাকো। পাথরের টুকরোর উপর ফোরসেপের দুই মাথা চেপে ধরল। একটা মাত্র দৃঢ় প্রয়াসে বের করে আনল ওটা। গুঙিয়ে উঠল মেরেন। বিকৃত হয়ে গেল ওর চেহারা। ফোরসেপটা একপাশে নামিয়ে রেখে আঙুল দিয়ে আস্তে করে খুলল দুই চোখের পাতা পেছনে ফেনের আঁতকে ওঠার আওয়াজ পেল।
বেশি খারাপ? জানতে চাইল মেরেন।
চুপ থাকল তাইতা। অক্ষিগোলক ফেটে গেছে, গাল বেয়ে নেমে আসছে রক্তাক্ত জেলি। নিমেষে তাইতা বুঝে গেল এই চোখে আর কোনওদিনই দেখতে পাবে না মেরেন। আস্তে করে অন্য চোখের পাতা খুলল ও। তাকাল ওটার ভেতরে। চোখের মণি বড় হয়ে ঠিকমতো স্থির হচ্ছে, লক্ষ করল ও। অন্য হাতটা উঁচু করল ও। কয়টা আঙুল? জিজ্ঞেস করল ও।
তিনটা, জবাব দিল মেরেন।
তাহলে পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যাওনি, বলল তাইতা। কঠিন যোদ্ধা মেরেন। ওকে সত্য থেকে দূরে রাখা প্রয়োজন বা উচিত নয়।
অর্ধেকটা পথ চলে গেছি? তীর্যক হেসে জিজ্ঞেস করল মেরেন।
সেজন্যেই দেবতারা তোমাকে দুটি চোখ দিয়েছেন, বলল তাইতা। শাদা লিনেনের টুকরোয় নষ্ট চোখটা বাঁধতে শুরু করল ও।
ডাইনীটাকে আমি ঘৃণা করি। এটা তার কাজ, বলল ফেন। মৃদু স্বরে কাঁদতে লাগল ও। ওকে আমি ঘৃণা করি। ঘৃণা করি।
কর্নেলের জন্যে একটা খাটিয়া বানাও, লোকদের নির্দেশ দিল তাইতা, কাছেই অপেক্ষায় ছিল ওরা।
লাগবে না, প্রতিবাদ করল মেরেন। আমি হাঁটতে পারব।
অশ্বারোহী বাহিনীর প্রথম আইন হচ্ছে, ওকে মনে করিয়ে দিল তাইতা, চড়তে পারলে কোনও সময়ই হাঁটবে না।
খাটিয়া তৈরি হলে মেরেনকে ওটায় উঠতে সাহায্য করল ওরা। তারপর তামাফুপার উদ্দেশে রওয়ানা দিল। অল্প কিছু সময় চলার পর তাইতাকে ডাকল ফেন। ওদিকে অচেনা লোকজন আমাদের দিকে নজর রাখছে। শুকিয়ে যাওয়া নদীপথের দিকে ইঙ্গিত করে বলল ও। দিগন্ত রেখায় দাঁড়িয়ে আছে একটা ছোট দল। গুনল ফেন। পাঁচজন।
নেংটি পরে থাকলেও শরীর নগ্ন। সবার কাছেই বর্শা আর মুগুর। দুজনের কাছে তীর-ধনুক দেখা যাচ্ছে। ওদের ভেতর সবচেয়ে লম্বা জন রয়েছে সামনে। লাল ফ্লেমিঙ্গো পালকের শিরস্ত্রাণ পরেছে। ওদের হাবভাব উদ্ধত, বৈরী। সর্দারের পেছনে দুজনকে আহত বা চোট পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে। সতীর্থরা সাহায্য কর ওদের।
