ব্যস, এই? জিজ্ঞেস করল তাইতা।
দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়ল কালুলু। আরও আছে। প্রকৃতি যেন উত্তাল অবস্থায় পড়ে গিয়েছিল। আপনাদের ক্ষেতের ফসল হলদে হয়ে মরে গেছে। গরুছাগলের পেট থেকে বাচ্চা বের হয়ে গেছে। আমাদের গোত্রের স্থায়ী সর্দার সাপের কামড় খেয়ে বলতে গেলে সাথে সাথে মারা গেছে। তার বড় বউ দুই মাথাঅলা একটা ছেলে জন্ম দিয়েছে।
ভীষণ খারাপ লক্ষণ, গম্ভীর দেখাল তাইতাকে।
আরও খারাপ ব্যাপারও আছে। আবহাওয়া ওলটপালট হয়ে গেছে। পাহাড়ের বুকে আমাদের গ্রামের উপর দিয়ে প্রবল হাওয়া সব ছাদ উড়িয়ে নিয়ে গেছে। আগুন লেগে ধ্বংস হয়ে গেছে গোত্রীয় টোটেম; আমাদের পূর্বপুরুষদের বিভিন্ন রেলিক আর জুজু গিলে নিয়েছে। স্থায়ী সর্দারের কবর খুঁড়ে হাড়গোড় খেয়ে ফেলেছে হায়েনার দল।
তোমাদের জনগণ, পূর্বপুরুষ আর ধর্মের উপর প্রত্যক্ষ আক্রমণ ছিল এটা, বলল তাইতা।
তারপর আমাদের পায়ের নিচে জ্যান্ত পশুর মতো নড়তে শুরু করে পৃথিবী। হ্রদের পানি লাফিয়ে শূন্যে উঠে আসে, উত্তপ্ত শাদা, ভয়ানক। মাছের ঝাঁক অদৃশ্য হয়ে যায়। হ্রদের পাখিগুলো পশ্চিমে উড়ে চলে যায়। সৈকতে বাধা আমাদের ক্যানুগুলোকে ভাসিয়ে নেয় ঢেউ। মাছধরার জালগুলো ছিঁড়েখুড়ে ফেলে। লোকজন আমাদের গোত্রের ক্রুদ্ধ দেবতাদের সাথে মধ্যস্ততা করার জন্যে আমার কাছে অনেক আবেদন নিবেদন করেছে।
এমনি একটা অবস্থায় কী করতে পারতে তুমি? জানতে চাইল তাইতা। কঠিন একটা কাজ করতে বলেছিল ওরা তোমাকে।
এখন আমরা যেখানে বসে আছি, সেখানে আসি আমি। আমার সাধ্যমতো সবচেয়ে কার্যকর জাদু সৃষ্টি করি। হ্রদের দেবতাদের শান্ত করতে আমাদের পূর্বপুরুষদের ছায়াকে আহ্বান জানাই। কিন্তু আমার আবেদনে কানে তুলো দিয়ে রেখেছে ওরা। আমার গোত্রের ভোগান্তির প্রতি ক্ষেপই করেনি। মদ্দা হাতি যেভাবে নৃগং বাদাম গাছ আঁকায় ঠিক সেভাবে এই পাহাড়টাকে ঝাঁকিয়েছে তারা। এমনভাবে নাচছিল দুনিয়াটা যে মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। ক্ষুধার্ত সিংহের হায়ের মতো গভীর ফাটল সৃষ্টি হয়েছে, পিঠে বাচ্চা ঝোলানো নারী পুরুষকে গিলে নিয়েছে। চিবুক বেয়ে নগ্ন বুকের উপর অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল তার। একজন দেহরক্ষী একটা লিনেনের কাপড় দিয়ে মুছে দিল।
হ্রদের পানি সৈকতের উপর দিয়ে গর্জন তুলে ভয়ানক হিংস্রতায় গড়িয়ে আসতে দেখেছি আমি। আমাদের নিচের ক্লিফের আধাআধি দূরত্ব পর্যন্ত উঠে আসছিল। প্রবল বৃষ্টির মতো আমার উপর এসে পড়ছিল ফোয়ারার পানি। রীতিমতো অন্ধ আর বধির হয়ে গিয়েছিলাম। মন্দিরে দিকে তাকিয়েছিলাম। মেঘ আর ফোয়ারার ভেতর দিয়ে গেটের সামনে কালো বোরখা পরা ছায়ামূর্তিকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। যুদ্ধ ফেরত স্বামীকে আহ্বান জানানো নারীর মতো উত্তাল হ্রদের দিকে দুই হাত মেলে রেখেছিল সে। শ্বাস নেওয়ার জন্যে হাঁপাচ্ছে কালুলু, শরীর নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুঝছে। তার হাত আর বাহু ঝাঁকি খাচ্ছে, নাচছে; পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগির মতো দুলছে মাথা। মুখে এমন খিচুনী হচ্ছে যেন মূৰ্ছা যাবে।
শান্তি! ওর মাথার উপর একটা হাত রাখল তাইতা। আস্তে আস্তে শান্ত, স্থির হয়ে এলো বামন। কিন্তু এখনও চোখ বেয়ে অশ্রু নেমে আসছে। বেশি খারাপ লাগলে আর বলার দরকার নেই।
আপনার কাছে বলতেই হবে। কেবল আপনিই বুঝবেন। মুখ হাঁ করে বাতাস টেনে নিল সে, তারপর আবার খেই ধরল, পানি দুর্ফাঁক হয়ে ঢেউয়ের ভেতর থেকে গাঢ় বস্তু ঠেলে বের হয়ে এলো। প্রথমে ভেবেছিলাম গভীর থেকে উঠে আসা জ্যান্ত দানো বুঝি। সবচেয়ে কাছের দ্বীপের দিকে ইঙ্গিত করল সে। ওখানে কোনও দ্বীপ ছিল না। হ্রদের পানি ছিল উন্মুক্ত, শূন্য। তারপর ওই পাথরটা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল। এখন যে দ্বীপটাকে দেখতে পাচ্ছেন সেটা হ্রদের জঠর থেকে ঠেলে বের হয়ে আসা নবজাতকের মতো জন্ম নিয়েছে। দ্বীপের দিকে ইঙ্গিত করার সময় ভীষণভাবে কাঁপতে লাগল তার হাত। কিন্তু ওটাই শেষ নয়। আরও একবার জল দুভাগ হয়ে যায়।হ্রদের তলা থেকে আরেকটা পাথরের একটা চাঙর উঠে আসে। ওটাই সেই লাল জোড়া পাথর! হাপরের আগুনের মতো জ্বলজ্বল করছিল। হিসহিস শব্দে বাষ্প হয়ে দুপাশে সরে যাচ্ছিল পানি। পাথর ছিল আধা গলা, গভীর থেকে শূন্যে উঠে আসামাত্রই জমাট বেঁধে যাচ্ছিল। ওগুলোর সৃষ্ট বাষ্পের মেঘ এত ঘন ছিল যে প্রায় সবকিছু অস্পষ্ট করে দিয়েছিল। কিন্তু ফাঁক হয়ে যাবার পর দেখলাম মন্দির অক্ষত আছে। দেয়ালের প্রত্যেকটা পাথর রয়েছে জায়গামতো। ছাদটা মজবুত। কিন্তু কালো জোব্বা পরা অবয়ব অদৃশ্য হয়ে গেছে। অদৃশ্য হয়ে গেছে পুরোহিতরা। ওদের আর দেখিনি। দানবীয় অন্তসত্তা উদরের মতো ক্রমেই ফুলে ফেঁপে উঠছিল জোড়া লাল পাথর, এক সময় শেষে ওই আকার আর কাঠামো পেয়েছে। নীলের মুখ আটকে দিয়েছে। নদী শুকিয়ে উধাও হয়ে গেছে। আর পানির নিচ থেকে বের হয়ে এসেছে পাথর ও বালুময় তীর।
দেহরক্ষীদের ইশারা করল কালুলু। এক জন ছুটে এসে ওর মাথা আগলে ধরল, আরেকজন ঠোঁটের কাছে একটা লাউ ধরে রাখল। শব্দ করে গিলল সে। তরলটায় এক ধরনের তীব্র গন্ধ, মনে হলো নিমিষে তাকে শান্ত করে ফেলেছে। লাউটা ঠেলে সরিয়ে আবার তাইতার সাথে কথা বলতে শুরু করল সে।
