কে জানে? আমি না। তবে ওই দিক থেকেই এসেছিল ওরা। প্রথমে দাসদের সাহায্যে নির্মাণ সামগ্রী নিয়ে আসে। তারপর দেয়াল বানিয়ে কাঠ ও ছাউনি দিয়ে ঢেকে দেয়। আমার গোত্র ওদের খাবারের ব্যবস্থা করেছিল, বিনিময়ে পুঁতি, কাপড় আর ধাতব সরঞ্জাম পেয়েছে। ওটা বানানোর উদ্দেশ্য বুঝতে পারিনি আমরা, তবে নিষ্পাপ মনে হয়েছে, আমাদের পক্ষে হুমকি মনে হয়নি। নিজেদের অনাড়ীপনার স্মৃতি মনে পড়তেই মাথা নাড়ল কালুলু। কাজে আগ্রহী ছিলাম আমি। ওই নির্মাতাদের সাথে খাতির করার চেষ্টা করেছি। ওরা কী করছে সে সম্পর্কে আরও জানতে চেয়েছি, কিন্তু আমাকে নিদারুণ বৈরীভাবে ফিরিয়ে দিয়েছে ওরা। শিবিরের চারপাশে প্রহরা বসিয়েছে, আমি আর কাছে ভিড়তে পারিনি। এখান থেকেই ওদের কাজ দেখতে বাধ্য হয়েছি। নীরবতায় ডুবে গেল কালুলু।
আরেকটা প্রশ্ন করে তাকে উৎসাহিত করল তাইতা। মন্দির শেষ হওয়ার পর কী হলো?
নির্মাতা আর দাসরা চলে যায়। মন্দিরের দেখভাল করতে নয়জন পুরোহিত রেখে যেদিক থেকে সেই পশ্চিমেই আবার কুচকাওয়াজ করে চলে গেছে ওরা।
মাত্র নয়জন? জিজ্ঞেস করল তাইতা।
হ্যাঁ। ওদের সবার চেহারা পরিচিত হয়ে উঠেছিল আমার, এখান থেকেই।
কী কারণে তোমার ওদের পুরোহিত মনে হয়েছে?
লাল ধর্মীয় জোব্বা পরত ওরা। নিবেদনের আচার পালন করত। উৎসর্গ করে বলী আগুনে পোড়াত।
ওদের আচারের বর্ণনা দাও, গভীর মনোযোগের সাথে শুনছে তাই।
খুঁটিনাটি প্রত্যেকটা বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ।
ঠিক দুপুরে পুরোহিতদের তিনজন মিছিল করে নদীর শাখার মাথায় নেমে আসত। সোরাইতে পানি ভরে মন্দিরে নিয়ে যেত। অদ্ভুত ভাষায় নাচত, উল্লাস করত।
তেনমাস ভাষায় না? জানতে চাইল তাইতা।
না, ম্যাগাস। ওই ভাষা চিনতে পারিনি।
ব্যস, এই? নাকি আর কিছু মনে আছে তোমার? বিসর্জনের কথা বলছিলে।
আমাদের কাছ থেকে কালো ছাগল আর কালো মুরগী কিনত ওরা। রঙের ব্যাপারে বেশ খুঁতখুঁতে ছিল। নিখাদ কালোই হতে হবে। ওগুলো মন্দিরে নিয়ে যেত ওরা। গান শুনেছি আমি, পরে ধোয়া আর পোড়া মাংসের গন্ধ পেয়েছি।
এছাড়া আর কী? লেগে রইল তাইতা।
এক মুহূর্ত ভাবল কালুলু। একজন পুরোহিত মারা গিয়েছিল। কারণটা আমার জানা নেই। বাকি আটজন তার মৃতদেহ হ্রদের তীরে নিয়ে আসে। বালির উপর তাকে নগ্ন ফেলে রেখে ব্লাফের ঢাল বেয়ে আবার উপরে উঠে গেছে। ওখান থেকে হ্রদের কুমীর ওটাকে টেনে পানির নিচে নিয়ে যাওয়া দেখেছে। চরম একটা ভঙ্গি করল বামন। কয়েক সপ্তাহর মধ্যে আরেকজন পুরোহিত এসে হাজির হয়েছিল মন্দিরে।
সেই আবার পশ্চিম থেকে? বলে উঠল তাইতা।
জানি না, কারণ তাকে আসতে দেখিনি। একদিন সন্ধ্যায় আটজন ছিল, পরদিন সকালে দেখি ফের নয়জন হয়ে গেছে।
তার মানে পুরোহিতের সংখ্যাটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। জীবনের সঙ্কেত। একটু ভাবল তাইতা, তারপর আবার জিজ্ঞেস করল, এরপর কী হলো?
দুবছরের বেশি সময় ধরে পুরোহিতদের অনুশীলন চালু থাকে। তারপর টের পেলাম যে মারাত্মক একটা কিছু ঘটতে চলেছে। মন্দিরের চারপাশে পাঁচটা অগ্নিসঙ্কেত জ্বালল ওরা। অনেক মাস দিনরাত সারাক্ষণ জ্বালিয়ে রেখেছিল ওগুলো।
পাঁচটা আগুন, বলল তাইতা। আগুনগুলো কোথায় কোথায় জ্বালিয়েছিল ওরা?
বাইরের দেয়ালে পাঁচটা স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছিল। আপনি সেগুলো দেখেছেন? জানতে চাইল কালুলু।
হ্যাঁ। একটা বিরাট পেন্টাগ্রামের বিন্দু গঠন করেছে ওগুলো। উচ্চমার্গীয় এই নকশার উপরই মন্দিরটা দাঁড়িয়ে আছে।
আমি কোনওদিন মন্দিরের ভেতরে যাইনি। কোনও পেন্টাগ্রামের কথা জানি। শুধু জানি বাইরের দেয়াল ঘিরে পাঁচটা জায়গায় আগুন ধরানো হয়েছিল, বলল কালুলু।
অস্বাভাবিক ঘটানা কি কেবল এটাই?
তারপর আরেকজন এসে যোগ দিয়েছিল ওদের সাথে।
আরেকজন পুরোহিত?
মনে হয় না। লাল নয়, তার পরনে কালো পোশাক ছিল। একটা ঢিলেঢালা কালো বোরখা সব বৈশিষ্ট্য আড়াল করে রেখেছিল। তবে ওটা পুরুষ ছিল নাকি মহিলা, নিশ্চিত করে বলতে পারব না। অবশ্য পোশাকের নিচের অবয়বের আকার থেকে মনে হয়েছে মহিলা হতে পারে। রোজ সূর্যোদয়ের সময় মন্দির থেকে বের হয়ে আসত সে। পাঁচটা আগুনের প্রত্যেকটার সামনে বসে প্রার্থনা করে আবার মন্দিরের সীমানায় ফিরে যেত।
তার চেহারা দেখেছ?
সব সময়ই বোরখা পরে থাকত সে। এক ধরনের অলৌকিক আচ্ছন্ন করা জাকের সাথে চলাফেরা করত। অন্য পুরোহিতরা সীমাহীন শ্রদ্ধায় তার সাথে আচরণ করত, তার সামনে নতজানু হতো। নিশ্চয়ই ওদের গোষ্ঠীর প্রধান নারী পুরোহিত ছিল সে।
সে মন্দিরে থাকার সময় আকাশে বা প্রকৃতিতে কোনও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ খেয়াল করেছ?
সত্যিই, ম্যাগাস, অনেক স্বর্গীয় চিহ্ন ছিল। তাকে প্রথমবারের মতো মন্দিরের আগুনের সামনে প্রার্থনা করতে দেখার দিনই সন্ধ্যা তারা কক্ষপথ পাল্টে আকাশের বুকে ভেসে গেছে। এর অল্প পরেই আরেকটা তাৎপর্যহীন, নামহীন তারা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠে আগুনে পুড়ে যায়। তার মন্দিরে থাকার পুরো সময়টায় নানা রঙের অদ্ভুত সব আলো উত্তর আকাশে নেচে বেড়িয়েছে। এইসব লক্ষণ দেখা দিয়েছে প্রকৃতিতে।
তোমার ধারণা, পর্দা ঢাকা সেই মহিলারই কাজ এসব?
আমি শুধু বলব, সে আসার পরেই এসব ঘটেছে। স্রেফ কাকতালীয় হয়ে থাকতে পারে। আমি জানি না।
