*
জোড়া লাল পাথরকে দুই ভাগ করা মাঝখানের ফাটলটা দেখাল মেরেন। এটাই দেয়ালের দৈর্ঘ্য বরাবর দুর্বলতম জায়গা কোনও সন্দেহ নেই তাতে। এটা একটা খাড়া রেখা হতে পারে।
পরীক্ষা শুরু করার জন্যে নিশ্চিতভাবেই এটাই সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা, সায় দিল তাইতা। লাকড়ির কোনও অভাব নেই। পানির উপর বাঁধ সৃষ্টি হওয়ার পর গোর্জের ঢাল ঢেকে রাখা বেশির ভাগ গাছই মরে গেছে। লোকদের শুরু করতে বলল।
বনের ভেতর ওদের ছড়িয়ে পড়তে দেখল ওরা। অচিরেই গোর্জের দিক থেকে ওদের কুড়োলের আওয়াজ ভেসে এলো, ক্লিফের গায়ে প্রতিধ্বনি তুলছে। গাছ লুটিয়ে পড়ামাত্র ঘোড়ায় টেনে দেয়ালের নিচে আনছে ওরা। দৈর্ঘ্য বরাবর কেটে পাথরের দেয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে রাখছে, যাতে একটা চোঙা তৈরি করে আগুনের ভেতর বাতাস টেনে নিতে পারে। দানবীয় দাহ্য পটাকে জায়গামতো বসাতে বেশ কয়েক দিন লেগে গেল। এই সময় দেয়ালের উপর পানি তুলে পাথর তেতে লাল হয়ে ওঠার পর পানি ঢেলে ভেজাতে চারটে ভিন্ন ভিন্ন শাদুফ হুইল বানানোর কাজ তদারকি করল তাইতা।
সবকিছু তৈরি হলে কাঠের তূপে আগুন ধরিয়ে দিল মেরেন। দাউদাউ করে জ্বলে উঠল অগ্নিশিখা, ধেয়ে গেল আকাশের দিকে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই গোটা কাঠের স্তূপটা সগর্জনে জ্বলতে শুরু করল। মাংসের উপর থেকে চামড়া কুঁচকে আসার ঝুঁকি না নিয়ে ওটার এক শো গজের মধ্যে থাকতে পারল না কেউই।
*
আগুন দমে আসার অপেক্ষায় থাকার অবসরে গোর্জের চূড়ায় ব্লাফে কালুলুর সাথে ওপাশে মন্দিরের দিকে তাকিয়ে রইল তাইতা আর ফেন। ওখানে দাঁড়ানো একটা ছোট ধসে পড়া তাবুর ছায়ায় বসে নিজেদের রক্ষা করছে। ওটার ছাদ মেরামত করে নিয়েছে দেহরক্ষীরা।
নদীটা যখন ঠিক ছিল, আমার গোত্র এখানে থাকার সময়, বছরের উত্তপ্ত মৌসুমে এখানে আসার অভ্যাস ছিল আমার, গোটা দুনিয়া যখন রোদের অত্যাচারে গোঙাত। ব্যাখ্যা করল কালুলু। হ্রদ থেকে ভেসে আসা বাতাস অনুভব করতে পারতাম। তাছাড়া, নদীর ওপাশে আগম্ভকদের কাজকর্মে রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে ছিলাম আমি। এটাকে একটা লুকআউটের মতো ব্যবহার করতাম, ওদের উপর নজর রাখতাম এখান থেকে। উল্টোদিকের ব্লাফের উপর দাঁড়ানো মন্দিরের দিকে ইঙ্গিত করল সে। তখনকার সেই দৃশ্য আপনাকে মনে মনে কল্পনা করে নিতে হবে। এখন যেখানে লাল পাথরের দেয়ালটা দাঁড়িয়ে আছে, বেশ কয়েকটা জলপ্রপাতসহ একটা গভীর গোর্জ ছিল ওখানে; এত পানি নিচে গড়িয়ে নামত যে পতনের শব্দে সব ইন্দ্রিয় অবশ হয়ে যেত। মাথার উপর উঠে আসত ফোয়ারার একটা লম্বা মেঘ। হাত উপরে ওঠাল সে। বেশ বাঅয় ভঙ্গিতে উচ্চতার ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করল। বাতাসে পরিবর্তন ঘটলে ফোয়ারা এখান পর্যন্ত পৌঁছে যেত, বৃষ্টির মতেই ঠাণ্ডা আর আরামদায়ক। কথাটা ভেবে হাসল সে। এভাবে এখান থেকে সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহের শকুনের চোখে দেখা ছবি দেখতাম।
মন্দিরটা বানানো দেখেছ তুমি? জানতে চাইল ফেন। তুমি জানো, ওখানে অনেক আইভরি আর আধা মূল্যবান পাথর আছে?
সত্যি জানি, আমার মিষ্টি মেয়ে। আগন্তকদের ওগুলো আনতে দেখেছি। শত শত দাসকে মালবাহী পশুর মতো কাজে লাগিয়েছে ওরা।
কোন দিক থেকে এসেছিল ওরা? জিজ্ঞেস করল তাইতা।
এসেছিল পশ্চিম থেকে, আবছা নীল দূরত্বের দিকে ইঙ্গিত করল কালুলু।
ওদিকে কোন দেশ? জানতে চাইল তাইতা।
সাথে সাথে জবাব দিল না বামন। একটু ভাবল সে, তারপর দ্বিধান্বিত কণ্ঠে জবাব দিল। আমার বয়স যখন কম ছিল, পাজোড়াও সম্পূর্ণ ও শক্তিশালী ছিল, এক ভবঘুরে মোহন্তের কথা শুনে জ্ঞান আর বিদ্যার সন্ধানে গিয়েছিলাম আমি। পশ্চিমের ওই দেশে থাকতেন তিনি।
কী আবিষ্কার করেছিলে তুমি?
বছরের বেশির ভাগ সময় ঘন মেঘে ঢেকে থাকা পাহাড় দেখেছি, বিশাল সব পাহাড়। মেঘ সরে গেলে চূড়াগুলো বের হয়ে পড়ে, আকাশের দিকে উঠে গেছে। ওগুলো, চূড়াগুলোর মাথা চকচকে শাদা।
চূড়ায় উঠেছিলে?
না। অনেক দূর থেকে দেখেছিলাম কেবল।
পাহাড়গুলোর নাম আছে?
ওগুলোর আশপাশে যারা থাকে তারা বলত চাঁদের পাহাড়, কারণ চূড়াটা পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল ছিল।
বিজ্ঞ ও সম্মানিত বন্ধু আমার, আমাকে বলো ওই সফরে আর কোনও অবাক কাণ্ড দেখেছ তুমি?
অবাক কাণ্ডের কোনও সীমাপরিসীমা নেই, জবাব দিল কালুলু। মাটির নিচ থেকে বের হয়ে আসা নদী দেখেছি আমি, উত্তপ্ত কড়াইয়ের পানির মতো টগবগ করে ফুটছিল তার পানি। পাহাড়ের গোঙানি শুনেছি, পায়ের নিচে তার কম্পন টের পেয়েছি, যেন গভীর গুহায় নড়াচড়া করছে কোনও দানব। স্মৃতি উজ্জ্বল করে তুলল তার গাঢ় চোখজোড়াকে। এই পাহাড়সারিতে এমন শক্তি আছে যে একটা চূড়ায় দানবীয় ফার্নেসের মতো আগুন জ্বলছিল, ধোয়া উগড়ে দিচ্ছিল।
জ্বলন্ত পাহাড়! বলে উঠল তাইতা। আগুন আর ধোঁয়া ওগড়ানো পাহাড় দেখেছ তুমি! একটা আগ্নেয়গিরি আবিষ্কার করেছ?
এমনি অলৌকিক কাণ্ডকে যদি তাই বলেন, সায় দিল ক্ষুদে মানুষটা। আশপাশের গোত্রগুলো ওটাকে ডাকত আলোর মিনার। দৃশ্যটা আমাকে ভয়ে ভরে দিয়েছিল।
যার খোঁজে বের হয়েছিলে, সেই বিখ্যাত মোহন্তের দেখা পেয়েছিলে?
না।
ওই মন্দির নির্মাতারা চাঁদের পাহাড় থেকে এসেছিল? এটাই তোমার বিশ্বাস? ওকে আবার আসল প্রসঙ্গে ফিরিয়ে আনল তাইতা।
