ওগুলো পড়তে পারবে? জিজ্ঞেস করল ফেন।
না, স্বীকার গেল তাইতা। অচেনা। এবার ভয়ের কোনও চিহ্ন আছে কিনা দেখতে ওর চোখের দিকে তাকাল ও। আমার সাথে ভেতরে যাবে?
জবাবে তাইতার হাত তুলে নিল ফেন। এসো, চক্র গড়ে তুলি আমরা, পরামর্শ দিল।
একসাথে দরজাপথে বৃত্তাকার বাইরের বারান্দায় ঢুকে পড়ল ওরা। ধূসর পাথর বিছানো এখানে, ছাদের ফোকর দিয়ে আলোর রশ্মি ঢুকে পড়ছে ভেতরে। ভেতরের দেয়ালে কোনও দরজা নেই। খোদাই করা দহলিজ ধরে পাশাপাশি আগে বাড়ল ওরা। প্রতিটি স্তম্ভের সাথে একই সমতলে আসার পর দেখতে পেল ওদের পায়ের নিচে শাদা মাৰ্বল পাথরে বিছানো হয়েছে পেন্টাগ্রামের বিন্দুগুলো। প্রতিটি বিন্দুর ভেতরে আরেকটা রহস্যময় প্রতীক ঢোকানো : সরীসৃপ, ক্রাক্স আনসাতা, উড়ন্ত শকুন, নীড়ে আরেকটা এবং সবশেষে একটা শেয়াল। শিথিল ছাউনির একটা স্তূপের উপর এসে দাঁড়াল ওরা, কর্কশ হিসহিস শব্দ কানে এলো। তারপর পায়ের নিচে ভীষণ সরসর আওয়াজ। এক হাতে ফেনের কোমর জড়িয়ে ধরে ওকে শূন্যে তুলে নিল তাইতা। ওদের পেছনে মিশরিয় কালো কোবরার ঢাকা মাথা অগোছাল আগাছার ভেতর থেকে মাথা তুলল। ক্ষুদে মার্বলের মতো কালো চোখ দিয়ে কঠিন দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকিয়ে রইল ওটা। লম্বা জিভ লকলক করছে, ওদের গন্ধের খোঁজে বাতাস পরখ করছে। ফেনকে নামিয়ে রেখে ছড়িটা তুলে নিয়ে সাপের মাথা নিশানা করল তাইতা। ভয় পেয়ো না, বলল ও। এটা প্রেতাত্মা নয়। স্বাভাবিক প্রাণী। ছড়ির ডগাটা এপাশ থেকে ওপাশে ছন্দোময় ভঙ্গিতে নাচাতে লাগল ও। কোবরাও দুলুনির সাথে দুলতে লাগল। আস্তে আস্তে শান্ত হলো ওটা। আবার ছাউনির খড়ে মাথা দাবাল। ফেনকে নিয়ে গ্যালারি থেকে বের হয়ে এলো তাই। অলঙ্কৃত দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
উল্টোদিকের দরজা, বলল তাইতা। এটা বাইরের দরজার ঠিক উল্টোদিকে। এটা ভেতরের পবিত্রস্থানকে বাইরের প্রভাব থেকে বাঁচিয়ে রাখে।
অনেকটা পাপড়িঅলা ফুলের মতো ওদের সামনের দরজার আকার। চৌকাঠগুলোয় পলিশ করা আইভরি, মালাকাইট আর বাঘের চোখের নকশা করা। বদ্ধ দরজা কুমীরের নকশা করা চামড়ায় ঢাকা। দরজার উপর শরীরের সম্পূর্ণ চাপ দিতে ছড়ির উপর ঝুঁকে পড়ল তাইতা। হাঁ করে খুলে গেল ওটা। কাঁচকোচ করে উঠল ব্রোঞ্জের কজা। ছাদের গম্বুজের একটা মাত্র ফোকর দিয়ে সূর্যের আলো ঢুকছে ভেতরে। রঙের বিস্ফোরণে ভেতরের পবিত্র মেঝে ভরিয়ে দিচ্ছে।
মেঝে দরাজভাবে নকশা করা পেন্টাগ্রামে সাজানো। টাইলস আর আধা মূল্যবান পাথরের উপর নকশা আঁকা হয়েছে। রোজ কোয়ার্টস্ ও পাথরের স্ফটিক বেরেলিয়াম ও রুবেলাইট চিনতে পারল তাইতা। নিপূণ কারুকাজ। নকশার কেন্দ্রে পলিশ করা মাৰ্বল পাথরের একটা বৃত্ত এমন চমৎকারভাবে পরস্পরের সাথে মিলে গেছে যে জোড়াগুলো দেখাই যায় না। দেখে মনে হবে অখণ্ড আইভরির একটা বর্ম।
চলো ভেতরে যাই, ম্যাগাস, গোলাকার দেয়ালে লেগে প্রতিধ্বনি তুলল ফেনের ছেলেমানুষি উচ্চারণ।
দাঁড়াও! বলল তাইতা। ভেতরে একটা কিছু আছে, এখানকার আত্মা। আমার মনে হয় এটা বিপজ্জনক। এই কারণেই ভয় পেয়েছিল কালুলু। মন্দিরের মেঝেয় এসে পড়া রোদের দিকে ইঙ্গিত করল ও। পেন্টাগ্রামের ঠিক মধ্যখানে এসে পড়তে যাচ্ছে আলোটা। সেটা হবে ভীষণ এক মুহূর্ত।
মেঝের উপর দিয়ে রোদের রশ্মিটার পিছলে আসা দেখতে লাগল ওরা। আইভরি চক্রের কিনারা স্পর্শ করল ওটা। চারপাশের দেয়ালে প্রতিফলিত হলো, বহুগুণ বেড়ে উঠল ঝলক। এবার যেন আরও দ্রুত আগে বাড়তে শুরু করল ওটা। তারপর এক সময় হঠাৎ করেই আইভরি চাকতিটাকে ভরে ফেলল। সাথে সাথে সিস্ট্রাময়ের গুঞ্জন আর ঝনঝন আওয়াজ কানে এলো। ওদের চারপাশের বাতাসে বাদুর ও শকুনের ডানা ঝাপ্টানোর আওয়াজ উঠল। শাদা আলো এমন ঔজ্জ্বল্য নিয়ে পবিত্র এলাকা ভরে ফেলল যে হাত তুলে চোখ ঢাকতে বাধ্য হলো ওর। ঝলকের ভেতর দিয়ে ইয়োসের আত্মার চিহ্নটাকে চাকতির কেন্দ্রে হাজির হতে দেখতে লাগল ওরা: আগুনে ফুটে উঠল বেড়ালের থাবা।
বুনো পশুর গন্ধের মতো ওদের নাক ভরে তুলল ডাইনীর গন্ধ। দরজার কাছ থেকে পিছিয়ে এলো ওরা। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে আইভরি চাকতির উপর দিয়ে চলে গেল রোদের আলো, আগুনে হরফগুলো উবে গেল। মিলিয়ে গেল ডাইনীর দুর্গন্ধ। কেবল রেখে গেল ভেজা ছাউনি আর বাদুরের মলের আবছা গন্ধ। রোদের আলো ফিকে হয়ে গেল। আরও অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে উঠল পবিত্র এলাকা। নিঃশব্দে গ্যালারি বেয়ে বাইরে রোদে বের হয়ে এলো ওরা।
ওখানে ছিল সে, ফিসফিস করে বলল ফেন। হ্রদের শীতল ঠাণ্ডা হাওয়ায় লম্বা করে দম নিল, যেন ফুসফুস পরিষ্কার করছে।
তার প্রভাবের অবশেষ, ছড়ি দিয়ে কুঁজের মতো লাল পাথরের দিকে ইঙ্গিত করে বলল তাইতা। এখনও নিজের নিষ্ঠুর কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
আমরা ওর মন্দির ধ্বংস করে দিতে পারি না? দালানের দিকে পেছন ফিরে তাকাল ফেন। এভাবে তাকে শেষ করে দেব?
না, দৃঢ়কণ্ঠে বলল তাইতা। নিজের ঘাঁটির ভেতরে তার প্রভাব অনেক জোরাল। ওকে ওখানে চ্যালেঞ্জ করা খুবই বিপজ্জনক হবে। তাকে হামলা করার ভিন্ন সময় ও জায়গা আমরা পাব। ফেনের হাত ধরল ও। তারপর ওকে নিয়ে আগে বাড়ল। আগামীকাল দুর্বলতার খোঁজে দেয়াল পরখ করতে আর কালুলুর কাছে গোর্জের উপর কীভাবে লাল পাথর বসানো হলো জানতে আসব আমরা।
