এটা কত শক্ত সেই ব্যাপারে ওই অচেনা লোকটার কথা হুবহু বিশ্বাস করতে হবে এমন কোনও কথা নেই। আমার লোকদের দিয়ে আগুন আর ব্রোঞ্জ দিয়ে পাথরটা পরখ করাতে যাচ্ছি আমি। একটা কথা মনে রাখবেন, ম্যাগাস, পিরামিডগুলো বানাতে যে স্থাপত্য বিদ্যা কাজে লাগানো হয়েছে সেটাকেই আবার ওগুলোকে ধ্বংস করার কাজে লাগানো সম্ভব। এখানেও সেই একই কৌশল কাজে লাগাতে না পারার কোনও কারণ দেখছি না, আমরাও মিশরিয়, পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত প্রাণী।
তোমার কথায় কিছুটা যুক্তি আছে দেখতে পাচ্ছি, মেরেন, সায় দিল তাইতা। তারপর দেয়ালের শেষ প্রান্তের ওধারে একটা কিছু ওর নজর কেড়ে নিল। ভুরু কোঁচকাল ও। আমাদের সামনের ব্লাফের উপর ওটা কি দালান নাকি? প্রশ্নটা কালুলুকে করছি।
পিচ্ছিল পাথুরে শরীর বেয়ে দেহরক্ষীদের ঘেরাওয়ের ভেতর নিজের খাটিয়ায় বসে থাকা বামনের কাছে নেমে এলো ওরা। তাইতা ধ্বংসাবশেষের দিকে ইঙ্গিত করতেই উজ্জ্বল চেহারায় মাথা দোলাল সে। ঠিক বলেছেন, ম্যাগাস। ওটা মানুষের তৈরি মন্দির।
তোমার গোত্র তো পাথর দিয়ে নির্মাণ করে না, তাই না?
না, ওটা অচেনা লোকদের বানানো।
এই অচেনা লোকরা কারা, কবে বানিয়েছে ওটা? জানতে চাইল তাইতা।
প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে প্রথম পাথর বসিয়েছিল ওরা।
কেমন লোক ছিল ওরা? জিজ্ঞেস করল তাইতা।
জবাব দেওয়ার আগে ইতস্তত করল কালুলু। দক্ষিণের লোক নয় ওরা। ওদের চেহারা আপনার আর আপনার লোকদের মতো। একই রকম পোশাক ছিল ওদের পরনে, অস্ত্রশস্ত্রও একই রকম।
ওর দিকে তাকিয়ে রইল তাইতা। বিস্ময়ে নীরব হয়ে গেছে। অবশেষে বলল, বলতে চাইছ ওরা মিশরিয় ছিল। সেটা সম্ভব বলে মনে হয় না। ওরা মিশর থেকে এসেছিল, তুমি নিশ্চিত?
আপনারা কোন দেশ থেকে এসেছেন তার কোনও ধারণা নেই আমার। আমি এমনকি নীল নদ বরাবর মহা জলাভূমি অবধিও যাইনি কোনওদিন। নিশ্চিত করে বলতে পারব না, তবে আমার কাছে ওদের আপনার জাতের লোকই মনে হয়েছে।
ওদের সাথে কথা বলেছিলে?
না, আবেগের সথে বলল কালুলু। ঢাকঢাক গুরগুর একটা ভাব ছিল ওদের ভেতর, কারও সাথে কথা বলত না ওরা।
কত জন ছিল ওরা, এখন কোথায় গেছে? সাগ্রহে জানতে চাইল তাইতা। মনে হচ্ছে নিবিড়ভাবে বামন লোকটার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে ও। কিন্তু ফেন জানে ওর আভা পরখ করছে ও।
তিরিশজনেরও বেশি, অন্তত পঞ্চাশ জন। যেভাবে এসেছিল তেমনি রহস্যজনকভাবেই আবার অদৃশ্য হয়ে গেছে।
লাল পাথর দিয়ে নদীর উপর বাঁধ নির্মাণের পরপরই অদৃশ্য হয়ে গেছে?
ঠিক তাইতা, ম্যাগাস।
খুবই অদ্ভুত, বলল তাইতা। এখন ওই মন্দিরে কে থাকে?
এখন পরিত্যক্ত, ম্যাগাস, জবাব দিল কালুলু, ওটার চারপাশের এক শো লীগ এলাকার মতোই পরিত্যক্ত। আমার গোত্র ও বাকি সবাই এইসব ও অন্যান্য অদ্ভুত ঘটনার পর এখান থেকে পালিয়ে গেছে। এমনকি আমিও জলাভূমিতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছি। এই প্রথম ফিরে এলাম। স্বীকার করছি, আপনার প্রতিরক্ষা ছাড়া কোনওদিনই সেটা পারতাম না।
মন্দিরে যেতে হবে আমাদের, বলল তাইতা। তুমি আমাদের পথ দেখাবে?
আমি কখনও ওই দালানের ভেতরে যাইনি, মৃদু কণ্ঠে বলল কালুলু। কোনও দিন যাবও না। আমাকে সাথে যেতে বলবেন না।
কেন নয়, কালুলু?
ওটা চরম অশুভের জায়গা। আমাদের উপর গজব নামানো শক্তি।
তোমার সতর্কতাকে সম্মান করি। এসব খুবই গভীর ব্যাপার, কিছুতেই হালকাভাবে নেওয়া ঠিক হবে না। মেরেনের সাথে ফিরে যাও, আমি একাই যাব মন্দিরে। মেরেনের দিকে ফিরল ও। শিবির নিরাপদ করার কোনও চেষ্টাই বাদ দেবে না। ভালোভাবে সুরক্ষিত করবে, কড়া পাহারা বসাবে। তুমি কাজ শেষ করার পর লাল পাথরের কাঠিন্য পরখ করতে ফিরে আসব আমরা।
অন্ধকার মেলানোর আগেই আপনাকে শিবিরে ফেরার অনুরোধ করছি, ম্যাগাস, উদ্বেগে পাণ্ডুর দেখাল মেরেনকে। সূর্যাস্তের সময় আপনি না ফিরলে আপনার খোঁজে বেরুব আমি।
দেহরক্ষীরা খাটিয়া তুলে নিয়ে মেরেনকে অনুসরণ করতে শুরু করল। ফেনের দিকে তাকাল তাইতা। মেরেনের সাথে যাও। ওর নাগাল পেতে জলদি পা বাড়াও।
সোজা হয়ে দাঁড়াল ফেন। হাত পেছনে রাখা, মুখ অটলভাবে স্থির। ওর এই অভিব্যক্তি খুব ভালো করেই চেনা হয়ে গেছে ওর। আমাকে যেতে বাধ্য করার মতো কোনও জাদু বানাতে পারব না তুমি, ঘোষণা দিল সে।
ভুরু কোঁচকালে তোমাকে আর সুন্দর লাগে না, ওকে মৃদু কণ্ঠে সতর্ক করল তাইতা।
আমি যে কতটা কুৎসিত হতে পারি, ধারণাও করতে পারবে না, বলল ফেন। আমাকে দূর করে দেওয়ার চেষ্টা করে দেখ, তখন টের পাবে।
তোমার হুমকী আমাকে কাবু করে ফেলে। হাসি ঠেকাতে কষ্ট হলো ওর। তাহলে আমার কাছেই থেক। আমরা কোনও বৈরী উৎসারণের মুখোমুখি হওয়ামাত্রই উল্টো ঘুরতে তৈরি থাকবে।
রাফের দিকে উঠে যাওয়া পথ খুঁজে পেল ওরা। মন্দিরে পৌঁছে দেখল ওটার পাথরের নকশা দারুণ সুন্দরভাবে শেষ করা হয়েছে। খোদাই করা কাঠের তক্তা দিয়ে বানানো হয়েছে গোটা দালানটার ছাদ, উপরে নদীর আগাছার ছাউনি দেওয়া হয়েছে, এখানে ওখানে খসে পড়তে শুরু করেছে এখন। দেয়াল ঘিরে ধীর পায়ে হাঁটতে লাগল ওরা। আনুমানিক পঞ্চাশ কদম বিস্তারের একটা বৃত্তাকার ভিত্তির উপর স্থাপন করা হয়েছে মন্দিরটা। পাঁচটা সমান দূরত্বের বিন্দুতে নিরেট গ্রানিট স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। ব্ল্যাক ম্যাজিশিয়ানের পেন্টাগ্রামের পাঁচটা বিন্দু,মৃদু কণ্ঠে ওকে বলল তাইতা। মন্দিরের প্রবেশ দ্বারে ফিরে এলো ওরা। দরজার চৌকাঠগুলোয় নিগূঢ় প্রতাঁকের বাস রিলিফ খোদাই করা।
