পুত্র হোরাস আর স্বর্গীয় পিতা অসিরিসের পবিত্র নামে, বলে উঠল মেরেন, এটা আবার কোন দুর্গ? কোনও আফ্রিকান সম্রাটের দুর্গ নাকি?
তোমরা যা দেখতে পাচ্ছ সেটাই লাল পাথর, শান্ত কণ্ঠে বলল কালুলু।
কে এখানে বসিয়েছে ওটা? জিজ্ঞেস করল তাইতা তার সঙ্গীদের মতোই বিভ্রান্ত সে।
কোনও মানুষ নয়, জবাব দিল কালুলু। মানুষের হাতের কাজ নয় এটা।
কার তবে?
আসুন। আগে আপনাকে জিনিসটা দেখাই। তারপর কথা বলা যাবে।
সাবধানে লাল পাথরের দিকে এগিয়ে গেল ওরা। অবশেষে নীলকে এক তীর থেকে আরেক তীর পর্যন্ত রুদ্ধ করে রাখা বিশাল পাথুরে প্রাচীরের নিচে এসে দাঁড়ালে ঘোড়া থেকে নেমে ওটার ভিত্তি বরাবর এগিয়ে গেল তাই। ফেন ও মেরেন অনুসরণ করল ওকে। পরখ করতে খানিক পর পর থামছে। প্রবহমান ধারার মতো, মোমবাতির মোমের মতো।
পাথর একবার গলানো হয়েছিল, মন্তব্য করল তাইতা। জমে এই রকম অবিশ্বাস্য চেহারা নিয়েছে।
ঠিক বলেছেন, সায় দিল কালুলু। ঠিক এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে এটার।
অন্তত একটা ফাটল রয়েছে এতে, ম্যাগাস, সামনের দিকে দেখাল ফেন। প্রাচীরে ঠিক মাঝখানে গোড়া থেকে চূড়া অবধি চলে যাওয়া একটা সংকীর্ণ ফাটল ধরা পড়েছে ওর তীক্ষ্ণ চোখ। ওটার কাছে পৌঁছানোর পর ড্যাগার বের করে ফাটলের ভেতর ফলা ঢোকানোর চেষ্টা করল। কিন্তু বড় বেশি সংকীর্ণ। কেবল আঙুলের প্রথম গিটের মতো দূরত্বে ঢুকল ফলাটা।
এই কারণেই আমাদের লোকজন খালি লাল পাথর না ডেকে এটাকে লাল পাথর বলে, ওদের বলল কালুলু, কারণ এটা দুটি ভাগে বিভক্ত।
প্রাচীরের ভিত্তি পরখ করতে হাঁটু গেড়ে বসল তাইতা। পুরোনো নদীর তলদেশের উপর নির্মাণ করা হয়নি এটা। ওটা থেকেই বের হয়ে এসেছে, যেন দানবীয় ব্যাঙের ছাতার মতো পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে বেড়ে উঠেছে। এই দেয়ালের পাথর চারপাশের অন্য সব পাথর থেকে ভিন্ন।
আবার ঠিক ধরেছেন, ওকে বলল কালুলু। এটাকে চারপাশের পাথরের মতো খোঁড়াখুড়ি করা যাবে না। ভালো করে দেখলে এটার নামের কারণ লাল স্ফটিক দেখতে পাবেন।
সামনে চোখ বাড়িয়ে দিল তাইতা, অবশেষে দেয়ালটাকে গঠনকারী সূক্ষ্ম স্কটিকগুলো বোদ লেগে রুবি পাথরের মতো ঝিলিক মেরে উঠল। এখানে অশ্লীল বা অস্বাভাবিক কিছু নেই, মৃদু কণ্ঠে বলল ও। খাটিয়ায় বসে থাকা কালুলুর কাছে ফিরে এলো ও। জিনিসটা এখানে এলো কেমন করে?
নিশ্চিত করে বলতে পারব না, ম্যাগাস, যদিও ঘটনা ঘটার সময় এখানেই ছিলাম আমি।
নিজের চোখে দেখে থাকলে কী করে ঘটল জানবে না কেন?
পরে বুঝিয়ে বলব আপনাকে, বলল কালুলু। তবে এখন এইটুকু বলাটাই যথেষ্ট যে আমার মতো আরও অনেকে এটা দেখেছে, কিন্তু ব্যাখ্যা যোগানোর পঞ্চাশটা ভিন্ন ভিন্ন কাহিনী রয়েছে তাদের।
পুরো দেয়ালটাই অলৌকিক, যুক্তি দেখাল তাইতা। সম্ভবত কিংবদন্তী ও কল্পকাহিনীর ভেতরই লুকিয়ে আছে সত্যির বীজ।
হতে পারে, সায় দিয়ে মাথা কাত করল কালুলু। কিন্তু আসুন আগে দেয়ালের মাথায় উঠি। ওখানে আরও দেখার বাকি আছে। দেয়াল বাইবার মতো একটা জায়গার খোঁজ করতে ফের নদীর তলদেশ ধরে উল্টোপথে ফিরে আসতে হলো ওদের।
আপনার জন্যে এখানে অপেক্ষা করব আমি, বলল কালুলু। ওপরের পথ অনেক কঠিন। কাঁচের মতো চকচকে প্রায় খাড়া দেয়ালের গায়ের দিকে ইঙ্গিত করল সে। ওকে রেখে সাবধানে ওপারে উঠতে শুরু করল ওরা। কোথাও কোথাও হাতে পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে উঠতে হচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লাল জোড়া পাথরের গোলাকার চূড়ায় উঠে দাঁড়াল। এখান থেকে হ্রদের দিকে চোখ ফেরাল ওরা। হাত দিয়ে আড়াল করে পানির উপরি তলে রোদের ঝলক থেকে চোখ বাঁচাল তাই। বেশ কাছেই গোটা কতক ছোটখাট খাড়ি রয়েছে, কিন্তু ওগুলোর মাঝখানে জমিনের কোনও চিহ্নই চোখে পড়ল না। এবার ফেলে আসা পথের দিকে তাকাল ও। অনেক নিচে ছোট হয়ে যাওয়া বামনের কাঠামো দেখা যাচ্ছে। ওর দিকে তাকিয়ে আছে কালুলু।
কেউ কখনও হ্রদের শেষপ্রান্তে যাবার চেষ্টা করেছে? চিৎকার করে নিচের কালুলুকে জিজ্ঞেস করল তাইতা।
শেষ প্রান্ত বলে কিছু নেই, পাল্টা চিৎকার করে বলল কালুলু। আছে কেবল শূন্যতা।
ওদের পা থেকে মাত্র চার কি পাঁচ কিউবিট নিচে ছলাৎছলাৎ করে চলেছে হ্রদের তলের পানি। নদীর তলদেশের দিকে ফিরল তাইতা, মনে মনে দেয়ালের দুপাশের গভীরতার বৈষম্যের একটা আন্দাজ করার চেষ্টা করল।
চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ কিউবিট উচ্চতার পানি আটকে রেখেছে এটা, হাতের ইশারায় হ্রদটাকে দেখিয়ে বলল ও। ওটার সীমাহীন বিস্তারকে আওতায় নিয়ে এলো ওর ভঙ্গি। এই দেয়াল থাকলে এই সমস্ত পানিই নীলের ওই শাখায় পড়ত, চলে যেত মিশরে। আমাদের দেশের ওই হাল হওয়াটা তেমন বিচিত্র কিছু না।
আশপাশের এলাকায় হামলা করে বড়সড় একদল দাস বন্দি করে এনে কাজে লাগিয়ে দিতে পারি, পরামর্শ দিল মেরেন।
কী করবে তারা? জিজ্ঞেস করল তাইতা।
এই বাঁধটাকে গুঁড়িয়ে দেব আমরা, তখন নীল ফের আমাদেরই মিশরের দিকে বয়ে যাবে।
হেসে স্যান্ডেল পরা একটা পা দিয়ে দেয়ালের গায়ে আঘাত করল তাইতা। কালুলু বলেছে, এই পাথরের দেয়ালটা কত শক্ত আর অনড়। এটার আকারটা একবার দেখ, মেরেন। গিযার মহান তিনটা পিরামিড একটার উপর একটা বসালে যত বড় হবে এটা তারচেয়েও ঢের বড়। আফ্রিকার সমস্ত লোক ধরে এনে ওদের আগামী একশো বছর ধরে একাজে কাজ করালেও ওরা সামান্য অংশও নড়াতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে আমার।
