*
আগুনের আলোয় হ্রদের ঝলসানো মাছ আর ধুরা পিঠা খেল ওরা; তারপর সাভোরে হ্রদের তীর বরাবর আগে বাড়ল। আধা লীগ যাওয়ার পরেই একটা শাদা শুকনো নদীর তলদেশে এসে পৌঁছুল। এটা কোন নদী? কালুলুকে জিজ্ঞেস করল তাইতা, যদিও জবাবটা কী হবে জানত ও।
আগেও নীল ছিল এখনও নীলই আছে, সহজ কণ্ঠে জবাব দিল কালুলু।
শুকিয়ে একদম কাঠ হয়ে গেছে! নদীর তলদেশের উপর দিয়ে চোখ বুলিয়ে বলে উঠল তাইতা। এক তীর থেকে আরেক তীরের দূরত্ব চারশো কদম, কিন্তু মাঝখানে এক বিন্দু পানিও বইছে না। ছোটখাট বাঁশের মতো হাতির ঘাস কোনও দীর্ঘদেহী মানুষের চেয়েও উঁচু হয়ে জন্মেছে, ভরে ফেলেছে পুরো জায়গাটা। নদী অনুসরণ করে মিশর থেকে দুই হাজার লীগ দূরে এখানে এসেছি আমরা। সারা পথে একটু পানি হলেও পেয়েছি, স্থবির পুকুর, নিদেন পক্ষে পানির ধারা, বা নালা। কিন্তু এটা একেবারে খটখটে শুকনো, মরুভূমির মতো।
আরও উত্তরে অপনারা যে পানি দেখতে পাচ্ছেন, সেমলিকি নিয়ানযুর উপচে পড়া জল ওটা এটার শাখা থেকে বয়ে গেছে, ব্যাখ্যা করল কালুলু। এটাই ছিল নীল, পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী নদী। এখন কিছুই না।
এটার কী হয়েছে? জানতে চাইল তাইতা। এমন বিশাল প্রবাহ রুদ্ধ করে দিতে পারে কোনও সে নারকীয় শক্তি?
এটা আপনার মতো সবার সব কল্পনা ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো একটা ব্যাপার, ম্যাগাস। আমরা লাল পাথরের কাছে পৌঁছানোর পর নিজের চোখেই সব দেখতে পাবেন।
মেরেনের সুবিধার জন্যে কী বলা হচ্ছে তার তরজমা করে দিচ্ছিল ফেন, এবার আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না সে। আমাদের একটা শুকনো নদী অণুসরণ করতে হলে, জানতে চাইল সে, আমার লোকজন আর ঘোড়ার পানি পাব কোথায়?
ঠিক হাতির মতোই খুঁজে বের করব আমরা, মাটি খুঁড়ে, ওকে বলল তাইতা।
এই যাত্রা কত সময় নেবে? জিজ্ঞেস করল মেরেন।
কথাটা অনুবাদ করা হলে ওর দিকে তাকিয়ে শয়তানী সুলভ হাসি দিল কালুলু। তারপর জবাব দিল, তোমার ঘোড়ার স্ট্যামিনা আর তোমার দুপায়ের শক্তির উপর উপর অনেকখানি নির্ভর করছে।
দ্রুত আগে বাড়ল ওরা, এককালের দুকুল উপচানো ল্যাগুন আর এখন স্থবির পুকুর আর শুকনো পাথুরে গহ্বরের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলল। জলপ্রপাত সগর্জনে লুটিয়ে পড়ত এখানে। মোল দিন পরে নিচু একটা রিজের ধারে হাজির হলো ওরা, নীলের চলার পথের সমান্তরালে চলে গেছে ওটা। এটাই অনেক অনেক লীগের একঘেয়ে জঙ্গলের হাত থেকে প্রথম রেহাই দিল।
ওই উঁচু এলাকায় আছে তামাফুপা শহর, আমার জাতির আবাস, ওদের বলল কালুলু। উঁচু থেকে আপনারা নালুবালের বিশাল জলে বিস্তার দেখতে পাবেন।
চলো ওখানেই যাওয়া যাক, বলল তাইতা। শুকনো নদীর উপরের ঢাল ঢেকে রাখা উজ্জ্বল হলদে কাণ্ডঅলা ফেভার গাছের একটা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে উপরে উঠতে লাগল ওরা। পানির অভাবে মরে গেছে গাছগুলো, ওগুলোর শাখা পাতাহীন, বাতজ্বরের আক্রান্ত হাত-পায়ের মতো বেঁকেচুরে গেছে। নিজের মাথায় উঠে এলো ওরা, নাক ঝেড়ে মাথা দোলাল উইন্ডস্মোক। ওয়ার্লউইন্ডও সমান উত্তেজিত, বেশ কয়েকবার লাফঝাঁপ দিল সে।
দুষ্টু ঘোড়া! হাতের প্যাপিরাসের সুইচ দিয়ে ওটার কাঁধে হালকাভাবে আঘাত করল ফেন। ঠিক থাক! তারপর তাইতাকে ডাকল সে। ওদের উত্তেজনার কারণ কী, ম্যাগাস?
নিজেই গন্ধ শুঁকে দেখ, বলল ও। সৌরভের মতোই মিষ্টি আর ঠাণ্ডা, ওটার নিচে রয়েছে ইথারাল নীলের একটা বাঁক, দিগন্তের গোটা বিস্তার জুড়ে বিছিয়ে আছে।
অবশেষে নালুবালে!
রিজের চূড়া দখল করে রেখেছে হার্ডউড খুঁটির একটা শক্তপোক্ত সীমানা। দরজাগুলো খোলা। ওটা গলে পরিত্যক্ত তামাফুপা গ্রামে প্রবেশ করল ওরা। বোঝাই যায় এককালে সমৃদ্ধ, গতিশীল সম্প্রদায় ছিল এটা-পরিত্যক্ত কুঁড়েগুলো প্রাসাদোপম, আঁকালভাবে ছাউনী দেওয়া-কিন্তু ওগুলোর উপর চেপে বসা বিষাদময় নৈঃশব্দ্য অপার্থিব। আবার গেটের দিকে ফিরল ওরা, দলের বাকি অংশকে ডাকল।
ওদের হাঁকে সাড়া দিয়ে ঘর্মাক্ত, হাঁপাতে থাকা দেহরক্ষীদের হাতে খাটিয়ায় করে ওদের সামনে নিয়ে আসা হলো কালুলুকে। তামাফুপার তোরণের কাছে সমবেত হওয়ার সময় ওদের প্রত্যেককে গম্ভীর, চিন্তামগ্ন মনে হলো, দূরের নীল জলের দিকে তাকিয়ে আছে।
নীরবতা ভাঙল তাই। আমাদের নীল মাতার উৎস।
দুনিয়ার শেষ বলল কালুলু। এই পানির ওধারে শূন্যতা আর মিথ্যা ছাড়া আর কিছু নেই।
তামাফুপার প্রতিরক্ষার দিকে তাকাল তাইতা। বৈরী গোত্রদের ঘেরাওয়ের ভেতর বিপজ্জনক এলাকায় আছি আমরা। আবার আগে বাড়ার আগ পর্যন্ত এটাকেই ঘাঁটি হিসাবে কাজে লাগাব আমরা, মেরেনকে বলল ও। হিলতো আর শাবাকোকে লোকজনকে দিয়ে যেকোনও হামলার বিরুদ্ধে দেয়ালগুলোকে আরও মজবুত করার কাজে লাগিয়ে দেব। ওরা কাজটা করার সময় আমাদের রহস্যময় লাল পাথরের ওখানে নিয়ে যাবে কালুলু।
সকালে রওয়ানা হয়ে গেল ওরা: প্রায় দুবছরেরও বেশি লেগে যাওয়া যাত্রার শেষ সংক্ষিপ্ত পর্যায়। নদীর তলদেশ অনুসরণ করে প্রশস্ত শুকনো ধারার মাঝখান দিয়ে এগোল ওরা। আরেকটা সহজ বাকের কাছে হাজির হলো। ওদের সামনে পানির ঘায়ে বিক্ষত ঢালু রোদেপোড়া পাথরের ধস নেমে গেছে। ওটার চারপাশে মহান শহরের সুরক্ষা প্রাচীরে মতো নিরেট লাল গ্রানিটের দেয়াল উঠে গেছে।
