কে তুমি, খুকী? আগুনের আলোয় তোমাকে দেখেছিলাম, তেনমাস ভাষায় বলল সে। না বোঝার ভান করে তাইতার দিকে তাকাল ফেন।
তুমি জবাব দিতে পারো, ওকে বলল তাইতা।ও সত্যের পক্ষের লোক।
আমি ফেন, ম্যাগাসের শিষ্যা।
তাইতার দিকে তাকাল কালুলু। আপনি ওর পক্ষে সাক্ষী দিচ্ছেন?
হ্যাঁ, জবাব দিল তাইতা, মাথা দোলাল বামন।
আমার পাশে বসো, ফেন, কারণ তুমি দেখতে খুবই সুন্দর। আস্থার সাথে খাটিয়ায় বসল ফেন। তীক্ষ্ণ কালো চোখে তাইতার দিকে তাকাল কালুলু। আমাকে কেন ডেকেছেন, ম্যাগাস? আমার কাছে কী সেবা আশা করছেন?
আমি চাই তুমি আমাকে নীলের জন্মস্থানে নিয়ে যাবে।
বিস্ময়ের কোনও ছাপ দেখা গেল না কালুলুর মাঝে। স্বপ্নে আমি আপনাকেই দেখেছি। আপনার জন্যেই অপেক্ষা করে আছি আমি। আপনাকে লাল জোড়া পাথরের কাছে নিয়ে যাব আমি। আজ রাতে হাওয়া পড়ে গেলে রওয়ানা হবো আমরা। আপনার দলে কতজন লোক আছে?
আটত্রিশ, ফেন আর আমিসহ, তবে আমাদের মালপত্র অনেক বেশি।
আরও পাঁচটা বড় ক্যানু আমাকে অনুসরণ করবে। রাত নামার আগেই এসে যাবে ওগুলো।
আমার সাথে অনেক ঘোড়া আছে, যোগ করল তাইতা।
হ্যাঁ। মাথা দোলাল ছোট বামন। ক্যানুর পেছন পেছন সাঁতরে আসবে ওগুলো। ওদের ভাসিয়ে রাখতে পশুর ব্লাডার নিয়ে এসেছি আমি।
সংক্ষিপ্ত আফ্রিকা গোধূলীতে বাতাসের ঝাপ্টা থেমে যেতেই সৈনিকদের কয়েকজন ঘোড়াগুলোকে তীর বরাবর নিচে এনে অগভীর পানিতে নামিয়ে দিল, তারপর জিনের পেটি দিয়ে দুপাশে ফোলানো ব্লাডার বেঁধে দিল। কাজটা চলার সময় অন্যরা ওদের সাজসরঞ্জাম ক্যানুতে বোঝাই করল। কালুলুর নারী দেহরক্ষীরা খাটিয়ায় করে সবচেয়ে বড় ক্যানুতে নিয়ে তুলে দিল ওকে। হ্রদের জল চকচকে স্থির হয়ে এলে তীর থেকে বের হয়ে এলো ওরা, অন্ধকারে দক্ষিণে আকাশের বুকে ঝুলে থাকা বিশাল তারার ক্রসের দিকে এগিয়ে চলল। প্রত্যেকটা ক্যানুর পেছনে দশটা করে ঘোড়া বেঁধে রাখা হয়েছে। পেছনে বসেছে ফেন, এখান থেকে পেছনে সাঁতরে আসা উইডম্মোক ও ওয়ার্লউইভকে সাহস যোগাতে পারছে ও। বৈঠা বেয়ে চলেছে মাঝিরা, গাঢ় ছুরির মতো পানি কেটে এগোচ্ছে দীর্ঘ সংকীর্ণ খোলসগুলো।
কালুলুর খাটিয়ার পাশে বসেছে তাইতা। কিছুক্ষণ নিচু কণ্ঠে কথা বলল ওরা। এই হ্রদের নাম কী?
সেমলিকি নিয়নযু। আরও অনেক নামের একটা এটা।
এর জল আসে কোত্থেকে?
আগে দুটো বিরাট নদী এসে মিশেছিল এটায়, একটা পশ্চিমে, ওটার নাম সেমলিকি; অন্যটা নীল। দুটোই এসেছে দক্ষিণ থেকে, সেমলিকি পাহাড় থেকে, আর নীল বিশাল জলাধার থেকে। সেখানেই আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি।
সেটা কি আরেকটা হ্রদ?
কেউ জানে না ওটা হ্রদ নাকি মহাশূন্যের সূচনা।
ওখানেই আমাদের মা নীলের জন্ম,?
এমনকি তাইতা, সায় দিল কালুলু।
এই বিশাল জলাধারকে কী নামে ডাক তোমরা?
আমরা একে ডাকি নালুবালে।
পথটা আমাদের বুঝিয়ে দাও, কালুলু।
সেমলিকির সৈকতে পৌঁছানোর পর নীলের দক্ষিণের শাখার দেখা পাব আমরা।
আমার মনে যে ছবি আছে তাতে নীলের দক্ষিণ শাখা এসে পড়েছে সেমিলিকি নিয়ানযুতে। উত্তরের শাখা হ্রদ থেকে বের হয়ে উত্তরে মহা জলাভূমির দিকে চলে গেছে। নীলের এই শাখাই আমাদের এতদূর পর্যন্ত নিয়ে এসেছে।
হ্যাঁ, তাই। এটাই ঠিক ছবি। অবশ্যই অন্যান্য ছোটখাট নদী, খাড়ি আর হ্রদ আছে, কারণ এটা অনেক জলধারার উৎস। কিন্তু ওগুলো সবই নীলে এসে পড়েছে, তারপর উত্তরে গেছে।
কিন্তু নীল এখন মরতে বসেছে, মৃদু কণ্ঠে বলল তাইতা।
কিছুক্ষণ চুপ রইল কালুলু, তারপর যখন মাথা দোলাল সে, বিশীর্ণ গালের উপর দিয়ে পড়িয়ে পড়ল একবিন্দু অশ্রু। হ্যাঁ, সায় দিয়ে বলল সে। তাকে জল বিলোত যেসব নদী, সেগুলো থেমে গেছে। আমাদের মা মরতে বসেছে।
কালুলু, ব্যাপারটা কেমন করে ঘটল খুলে বলো।
একে ব্যাখ্যা করার মতো কোনও কথা নেই। আমরা লাল পাথরের কাছে পৌঁছানোর পরে নিজের চোখে দেখতে পাবেন। আমি এসব বিষয় আপনার কাছে বর্ণনা করতে পারব না। সামান্য কথায় এই ধরনের কাজ করা যায় না।
আমি আমার ধৈর্য ধরে রাখছি।
অধৈর্য তরুণের খারাপ গুন, হাসল বামন। আধো আঁধারে চকচক করে উঠল তার দাঁত। আর বয়স্ক লোকের সান্ত্বনা হচ্ছে ঘুম। ক্যানুর নিচে পানির ছলাৎ শব্দ থামিয়ে দিল ওদের। খানিক পর ঘুমিয়ে পড়ল ওরা।
সামনের ক্যানু থেকে মৃদু চিৎকারের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল তাইতার। উঠে কিনারার উপর দিয়ে ঝুঁকে মুখে আঁজলা ভরে দুবার পানি ছিটাল। তারপর চোখ পিটপিট করে পানি ঝেড়ে ফেলল, তাকাল সামনের দিকে। সামনে জমিনের গাঢ় অবয়ব দেখতে পেল।
অবশেষে জমিনের কাছে এসে পৌঁছানোয় খোলের নিচে জমিনের টান অনুভব করল ওরা। মাঝিরা বৈঠা বাওয়া থামিয়ে লাফ দিয়ে তীরে নেমে ক্যানুগুলোকে আরও উঁচুতে তুলতে শুরু করল। পা রাখার মতো মাটি পেয়ে লাফ দিয়ে পানি কেটে তীরে উঠে এলো ঘোড়াগুলো। খাটিয়ায় তুলে কালুলুকে সৈকতে নিয়ে এলো মেয়েরা।
আপনার লোকজন এখন নিশ্চয়ই নাশতা করবে, তাইতাকে বলল কালুলু, যাতে প্রথম আলো ফুটে ওঠার সাথে সাথে আবার আমরা রওয়ানা হতে পারি। পাথরের কাছে যেতে লম্বা রাস্তা পাড়ি দিতে হবে আমাদের।
মাঝিদের আবার ক্যানুতে চেপে হ্রদে চলে যেতে দেখল ওরা। অন্ধকারে মিশে গেল দ্রুতযানগুলোর অবয়ব, এক সময় বৈঠার শাদা ঝলক ছাড়া আর চিহ্ন দেখা গেল না। অচিরেই অদৃশ্য হয়ে গেল তাও।
