দেখতে পাবে, ফেন। ওকে বুকের দুধ খাইয়েছ তুমি, নিজের হাতে ওর মাথায় মুকুট পরিয়ে দিয়েছ।
আবার নীরব হয়ে গেল ফেন। তারপর ফের বলল, অন্য জীবনে আমার সাথে তোমার পরিচয়ের দিনের চেহারা দেখাও আমাকে। সেটা পারবে, তাইতা? আমার জন্যে তোমার নিজের ছবি তৈরি করতে পারবে?
তেমন চেষ্টা করার সাহসই দেখাতে যাব না, চট করে জবাব দিল তাইতা।
কেন নয়? জানতে চাইল ফেন।
বিপজ্জনক হবে সেটা, জবাব দিল তাইতা। আমার কথা বিশ্বাস করতে হবে তোমাকে। সেটা কোনওভাবেই বেশি বিপজ্জনক হবে না।
তাইতা জানে ফেনকে ওর সে সময়ের রূপ দেখালে সেটা ওকে সময়ে সময়ে অসম্ভব স্বপ্নে তাড়া করে ফিরবে। ওর অসন্তোষের বীজ বপন করে বসবে ও। কারণ ওর অন্য জীবনে ওদের প্রথম পরিচয়ের সময় তাইতা ছিল দাস, মিশরের সবচেয়ে সুদর্শন যুবক। এটাই ছিল ওর পতনের কারণ। ওর মনিব লর্ড ইনতেফ ছিলেন কারনাকের নোমার্ক ও উচ্চ মিশরের বিশটা নোমের গভর্নর। তাছাড়া কিশোর-প্রেমী ও দাস ছেলেটির প্রতি প্রবলভাবে আসক্ত ছিলেন তিনি। মনিবের বাড়ির আলীদা নামের এক দাসীর প্রেমে পড়েছিল তাইতা। খবরটা লর্ড ইনতেফের কানে তোলার পর তিনি জল্লাদ রাসফারকে আলীদার খুলি ধীরে ধীরে থেঁতলে দেওয়ার হুকুম দেন। তাইতাকে তার মৃত্যু দেখতে বাধ্য করা হয়। এমনকি ব্যাপারটা শেষ করার পরেও সন্তষ্ট হতে পারেননি লর্ড ইনতেফ। কুমার তাইতাকে নির্বীজ করে দিতে বলেন তিনি রাসফারকে।
এই ভীষণ ঘটনার ভিন্ন দিকও রয়েছে। লর্ড ইনতেফই ছিলেন ছোট মেয়ে লখ্রিসের বাবা, অনেক বছর পরে যে মিশরের রানি হয়েছিল। তাঁর মেয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল না ওর, তাই নপুংসক তাইতাকে তার শিক্ষক ও পরামর্শক নিয়োগ দিয়েছিলেন। সেই বাচ্চাটি ফেন হয়ে ফিরে এসেছে এখন।
ব্যাপারটা এত জটিল যে তাইতার পক্ষে ফেনের কাছে ব্যাখ্যা করার উপযুক্ত ভাষা খুঁজে পেতে কষ্ট হলো। শিবিরের দিক থেকে ভেসে আসা জোরাল চিৎকারের কারণে আপাতত সেই বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি পেল ও। তীরের দিকে নৌকা আসছে! অস্ত্র তুলে নাও! মেরেনের কণ্ঠস্বর, এতদূর থেকেও পরিষ্কার চেনা যাচ্ছে। লাফ দিয়ে উঠে ভেজা শরীরে টিউনিক পরে নিল ওরা। তারপর দ্রুত পায়ে শিবিরের দিকে ছুটে গেল।
ওই যে! সবুজ জলের উপর দিয়ে হাতের ইশারা করল ফেন। ক্রমে বেড়ে ওঠা বাতাসের ভেতর ঠেলে আনা শাদা ঘোড়ার পালের পটভূমিতে গাঢ় ফুটকিগুলো বুঝতে খানিকটা সময় লাগল তাইতার।
স্থানীয় যুদ্ধ নৌকা! ফেন, মাঝির সংখ্যা গুনতে পারবে?
চোখের উপর হাত দিয়ে আড়াল করল ফেন। তারপর বলল, সামনের ক্যানুর দুপাশে রয়েছে রয়েছে বার জন করে। অন্যগুলোও সমান বড় মনে হচ্ছে। দাঁড়াও! দ্বিতীয় নৌকাটা বেশি বড়। এপাশে বিশ জন মাঝি রয়েছে।
প্রাচীরের তোরণে নিজের লোকদের দুই সারিতে দাঁড় করিয়ে ফেলেছে মেরেন। যে কোনও আকস্মিক জরুরি অবস্থা মোকাবিলার জন্যে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ওরা। ওদের নিচে ক্যানুগুলোকে তীরে ভিড়তে দেখল ওরা। মাঝি এল্লোরা নেমে বড় নৌকাটাকে ঘিরে দাঁড়াল। বাদকদের একটা দল লাফিয়ে তীরে নেমে বাজনা বাজাতে শুরু করল। এক ধরনের বুনো ছন্দ তৈরি করল ঢুলীরা। অন্যদিকে নাকাড়াঅলারা বুনো অ্যান্টিলোপের দীর্ঘ প্যাচানো শিং দিয়ে বানানো শিংগায় ফুঁ দিতে লাগল।
তোমার আভা আড়াল করো, ফেনের উদ্দেশে ফিসফিস করে বলল তাইতা। এদের সম্পর্কে কিছুই জানি না আমরা। আভা মিলিয়ে যেতে দেখল ও। বেশ ভালো। কালুলু মোহন্ত হয়ে থাকলে ওর আভা সম্পূর্ণ আড়াল করে ফেললে বরং আরও গভীর সন্দেহের সৃষ্টি করবে।
আটজন বাহক নৌকা থেকে একটা খাটিয়া নামিয়ে সৈকতে নিয়ে এলো। সুঠাম স্বাস্থ্যের মেয়ে ওরা; পেশীবহুল হাত পা। পরনে নেংটি, তাতে কাঁচের পুঁতির দরাজ নকশা। ওদের বুকে বিশেষ ধরনের চর্বি মাখানো, রোদ লেগে চকচক করছে। তাই যেখানে দাঁড়িয়েছিল সরাসরি সেখানে চলে এলো ওরা, তারপর খাটিয়া নামিয়ে রাখল ওর সামনে। এবার ওটার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। গভীর শ্রদ্ধার ভঙ্গি।
খাটিয়ার মাঝখানে বসে আছে এক বামন। আগুনের সেই ইমেজ থেকে তাকে চিনতে পারল ফেন। বড় বড় কান আর চকচকে টাকঅলা প্রাচীন শিম্পাঞ্জীর চেহারা। আমি কালুলু, তেনমাস ভাষায় বলল সে। আপনাকে দেখতে পাচ্ছি, গালালার তাইতা।
তোমাকে স্বাগত জানাই, সাড়া দিল তাইতা। নিমেষে বুঝে গেছে ও কালুলু মোহন্ত নয়। তবে শক্তিশালী নিবিড় আভা ছুঁড়ে দিচ্ছে সে। ওটা থেকেই বুঝতে পারছে তাইতা, লোকটা সত্যির অনুসারী ও জ্ঞানী। চলো একান্তে আরামে কথা বলা যাবে এমন কোথাও যাওয়া যাক।
হাতের উপর ভর দিয়ে খাড়া হলো কালুলু, কাটা পাদুটো আকাশের দিকে খাড়া হয়ে গেল। খাটিয়া থেকে নেমে এমনভাবে হাতের উপর ভর দিয়ে হাঁটতে লাগল যেন ওগুলোই পা। এক পাশে মাথা বাঁকা করে রেখেছে যাতে তাইতার মুখের দিকে তাকিয়ে ওর সাথে কথা বলতে পারে। আপনাকে আশা করছিলাম আমি, ম্যাগাস। ইথারে আপনার আগমন নিদারুণ গোলমাল সৃষ্টি করেছিল। নদী বরাবর এগিয়ে আসার সাথে সাথে আপনার উপস্থিতি প্রবলভাবে টের পাচ্ছিলাম। ওর পেছন পেছন এগিয়ে আসতে লাগল মেয়েরা, খালি খাটিয়া বইছে।
এই দিকে, কালুলু, আমন্ত্রণ জানাল তাই। ওরা ওর আবাসে আসার পর খাটিয়াটা নামিয়ে রাখল মেয়েরা, তারপর শ্রবণ সীমার বাইরে সরে গেল। লাফ দিয়ে আবার ওটায় উঠে বসল কালুলু, আবার তার স্বাভাবিক মাথা উঁচু করে রাখা অবস্থান গ্রহণ করল। কাটা পায়ের উপর ভর দিয়েছে। শিবিরের চারপাশে উজ্জ্বল চোখে নজর চালাল সে। কিন্তু ফেন যখন ওর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে এক বাটি মধুর সুরা বাড়িয়ে দিল, ওর দিকেই পূর্ণ মনোযোগ দিল।
