আমোদিত ভয়ে কেঁপে উঠল ফেন। সেটা কি ভিন্ন জীবনে? জানতে চাইল ও। আমাকে বললো সে কথা। কে ছিলাম আমি?
সবকিছু বলতে গেলে সারা জীবন লেগে যাবে আমার, বলল তাইতা, তবে এই বলে শুরু করতে দাও যে, তুমিই ছিলে আমার ভালোবাসার সেই নারী, ঠিক এখন যেভাবে তোমাকে ভালোবাসি। ওর হাতের দিকে হাত বাড়াল ফেন, চোখের অশ্রু ওকে অন্ধ করে দিচ্ছে।
আমার একটা কিছু তোমার কাছে আছে, ফিসফিস করে বলল ফেন। এবার তোমার একটা কিছু প্রয়োজন আমার। ওর দাড়ির দিকে হাত বাড়িয়ে আঙুলে পেঁচিয়ে নিল পুরু কগাছি দাড়ি। আমাদের দেখা হওয়ার সেই প্রথম দিন আমাকে ধাওয়া করার সময়ই তোমার দাড়ি চোখে লেগেছিল। খাঁটি রূপার মতো ঝলমলে। কোমরে ঝোলানো খাপ থেকে ছোট তীক্ষ্ণ ড্যাগার বের করল সে। চামড়ার বেশ কাছ থেকে কেটে নিল দাড়ির গোছাটা। নাকের কাছে তুলে গন্ধ শুকল, যেন সুবাসিত কোনও ফুল। এটা তোমার গন্ধ, তাইতা, তোমার নিজস্ব সত্তা।
ওটা রাখতে তোমাকে এবটা লকার বানিয়ে দেব।
খুশিতে হেসে উঠল ফেন। হ্যাঁ, খুবই ভালো হবে তাহলে। কিন্তু ওই মৃত বৃদ্ধার চুলের সাথে একটা জীবন্ত বাচ্চার চুলও রাখতে হবে তোমাকে। হাত তুলে নিজের মাথার কগাছি চুল কেটে ওকে বাড়িয়ে দিল। যত্নের সাথে ওগুলো পেঁচিয়ে মাদুলির ভেতরের খোপে সত্তর বছরের বেশি আগে রেখে দেওয়া চুলের গোছার উপর রাখল।
আমি কি সব সময়ই তোমাকে ডাক পাঠাতে পারব? জিজ্ঞেস করল ফেন।
হ্যাঁ। আমিও তোমাকে ডাকতে পারব, সায় দিল তাইতা। তবে তার আগে তোমাকে তার কায়দা শেখাতে হবে।
পরের দিনগুলোতে কায়দাটা রপ্ত করল ওরা। পরস্পরের কাছাকাছি কিন্তু শ্রবণসীমার বাইরে বসে শুরু করল। কয়েক ঘণ্টার ভেতর ওর মনে স্থাপন করা ইমেজ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়ে উঠল ফেন, তারপর নিজের ইমেজ দিয়ে সাড়া দিল। পুরোপুরি আয়ত্ত করার পর পরস্পরের দিকে পেছন ফিরে বসল ওরা, যাতে চোখাচোখি না হয়। সবশেষে ফেনকে শিবিরে এনে মেরেনকে সাথে নিয়ে হ্রদের কিনারা বরাবর বেশ কয়েক লীগ দুরে চলে এলো তাই। এখান থেকে প্রথম চেষ্টাতেই ফেনের কাছে পৌঁছতে পারল ও।
যখনই আহ্বান করছে, আগের চেয়ে অনেক দ্রুত সাড়া দিচ্ছে ফেন, ওর কাছে পাঠানো ইমেজগুলো আগে চেয়ে অনেক বেশি তরতাজা, আরও পূর্ণাঙ্গ হয়ে উঠতে লাগল। ওর সুবিধার জন্যে কপালে প্রতীক রেখেছে ফেন, অনেকগুলো প্রয়াসের পর ইচ্ছামতো শাপলার রঙ বদলাতে সক্ষম হয়ে উঠল ফেন, গোলাপি থেকে লাইলাক তারপর রক্তিম।
রাতে প্রতিরক্ষার জন্যে নিজের মাদুরে ওর কাছাকাছি ঘেঁষে গুলো ফেন। ঘুমে ঢলে পড়ার আগে ফিসফিস করে ওকে বলল, এবার আর বিচ্ছিন্ন হবো না আমরা, তুমি যেখানেই যাও আমি তোমাকে খুঁজে বের করতে পারব।
*
ভোরে হাওয়া খেলতে শুরু করার আগেই হ্রদে ম্লান করতে গেল ওরা। জলে নামার আগে কুমীর ও গভীর জলে ঘাপটি মেরে থাকতে পারে এমন যেকোনও দানো দূরে ঠেলে রাখতে প্রতিরক্ষা প্রাচীর তৈরি করার জন্যে মন্ত্র পড়ল তাইতা। তারপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ওরা। ভোদরের মতো সাবলীল ভঙ্গিতে সাঁতার কাটছে ফেন। পিছলে গভীরে চলে যাওয়ার সময় পলিশ করা আইভরির মতো বলসে উঠছে ওর নগ্ন দেহ। ফেনের পানির নিচে থাকা সময় নিয়ে একেবারেই অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেনি ও, তাই জলের উপর শুয়ে নিচের সবুজ জগতের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তলে তলে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল ও। তারপর যেন অনন্ত কাল পরে মেয়েটি ওর দিকে উঠে আসার সময় ওর দেহের মলিন ঝলক দেখতে পেল। ঠিক স্বপ্নে যেমন দেখেছিল। তারপর ছলাৎ করে ওর পাশে মাথা জাগাল ও। হাসছে, চুল থেকে পানি ঝরাচ্ছে। অন্য সময় ওর ফিরে আসা টের পায় না ও। গোড়ালী ধরে ওকে নিচে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করার সময় প্রথম বুঝতে পারে।
এভাবে সাঁতার কাটা শিখলে কোথায়? জানতে চায় তাই।
আমি জলের সন্তান, ওর দিকে চেয়ে হাসে ফেন। মনে নেই তোমার? আমার জন্মই হয়েছে সাঁতার কাটার জন্যে।হ্রদ ছেড়ে উঠে আসার পর সকালের সূর্যের আলোয় দেহ শুকোনার মতো একটা জায়গা খুঁজে পেল ওরা। ফেনের পেছনে বসে ওর চুলে বেণী বেঁধে দিল তাইতা। চুলের গোছর ভেতর শাপলা ফুল বানায়। এই সময় মিশরের রানি হিসাবে কাটানো ওর সেই জীবনের গল্প বলল। অন্য যারা ওকে ভালোবেসেছিল তাদের কথা, ওর বাচ্চাদের কথা বলল। প্রায়ই চিৎকার করে ওঠে ও। ও, হ্যাঁ! এখন মনে পড়ছে। একটা ছেলে থাকার কথা মনে আছে, কিন্তু ওর চেহারা দেখতে পাই না।
তোমার মন উন্মুক্ত করো, আমার স্মৃতি থেকে ওর ছবি তোমার মনে স্থাপন করব।
চোখ বুজল ফেন। হাতজোড়া কাপের মতো করে ওর মাথার দুপাশে কানসহ ঢেকে ফেলল। চেপে ধরল ও। কিছুক্ষণ চুপ রইল ওরা। অবশেষে ফিসফিস করে ফেন বলল, বাহ, কী সুন্দর বাচ্চা। ওর মাথার চুল সোনালি। ওর মাথার উপর কার্তুশে দেখতে পাচ্ছি। ওর নাম মেমনন।
এটা ওর ছোটবেলার নাম, বিড়বিড় করল তাইতা। সিংহাসনে বসে মিশরের দুই রাজ্যের শাসন ভার কাঁধে তুলে নেওয়ার পর তার নাম হয়েছে ফারাও তামোস, এই নামের প্রথম ফারাও। এই যে! সমস্ত ক্ষমতা ও আভিজাত্যসহ তাকে দেখ। ওর মনে ছবিটা স্থাপন করল তাইতা।
অনেকক্ষণ চুপ থাকল ফেন। তারপর বলল, কী সুদর্শন ও অভিজাত। ওহ, তাইতা, ছেলেটাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে।
