সেটা পারবে তুমি, তাইতা? জিজ্ঞেস করল ফেন।
পোতোর কথামতো এখানে থেকে খুব কাছে জলাভূমিতে থাকে সে, হয়তো আমরা এখন যেখানে আছি সেখান থেকে মাত্র কয়েক লীগ দূরে। সহজে ডাক পাঠানোর মতো দূরত্ব।
দূরত্ব কি গুরুত্বপূর্ণ?
মাথা দোলাল তাইতা। আমরা তার নাম জানি। শারীরিক গড়ন সম্পর্কে জানি। কেটে ফেলা পায়ের কথা জানি। ওর আত্মার নাম জানা থাকলে অবশ্যই আরও সহজ হতো কাজটা। কিংবা আমাদের কাছে যদি তার ব্যক্তিগত কোনও কিছু থাকত-এক গাছি চুল, নখের টুকরো, ঘাম, পেশাব বা মল। তবে, হাতে যা আছে তা দিয়েই কোনও কিছু খোঁজার কায়দা তোমাকে শেখাব আমি। থলে থেকে এক চিমটি ভেষজ বের করে আগুনে ছুঁড়ে দিল তাইতা। গন্ধময় ধোয়া তুলে ঝলসে উঠল সেটা। আশেপাশে ভেসে বোড়ানো যে কোনও অশুভ প্রভাব দূর করে দেবে এটা, ব্যাখ্যা করল ও। আগুনের দিকে তাকাও। কালুলু এলে ওখানে দেখতে পাবে তাকে।
হাত ধরে রেখেই তাইতার বুকের গভীর থেকে বের আনা এক ধরনের গুঞ্জন ধ্বনির সাথে তাল রেখে দুলতে শুরু করল ওরা। ওর শিক্ষা মতো ফের ওর মন পরিষ্কার করার পর শক্তির তিনটা প্রতীক তৈরি করল ওরা; নীরবে সেগুলোকে সংযুক্ত করল।
মেনসার!
কিদাশ!
নিউবে!
ওদের চারপাশের ইথারে গুঞ্জন উঠল। তাতে হাঁক ছাড়ল তাইতা।
কালুলু, হে, পা বিহীন পুরুষ, শোনো! তোমার কান উন্মুক্ত করো! সবিরতিতে আহ্বান পুনরাবৃত্তি করে চলল ও। এদিকে চাঁদ উঠে সর্বোচ্চ বিন্দুর দিকে অর্ধেকটা পথে এগিয়ে গেল।
সহসা আঘাতটা টের পেল ওরা। উত্তেজনায় ঢোক গিলল ফেন, ওর আঙুলের ডগা দিয়ে বের হয়ে গেল একটা বিচ্ছুরণ। আগুনের দিকে তাকাল ও। একটা চেহারার রেখা দেখতে পেল। চেহারাটা ওর কাছে প্রাচীন কিন্তু চিরন্তন জ্ঞানী হনুমানের মতো লাগল।
কে ডাকে? তেনমাস ভাষায় প্রশ্নটাকে আকার দিল আগুনের চেহারা। কে ডাকে কালুলুকে?
আমি গালালার তাইতা।
আপনি সত্যি হলে আমাকে আপনার আত্মার নাম দেখান। মাথার উপর ভাঙা ডানার বাজপাখীর প্রতীক হিসাবে ওটাকে আবির্ভূত হতে দিল তাইতা। বৈরী সত্তার হাতে আক্রান্ত হওয়ার আশংকা রয়েছে এমন একটা জায়গায় ইথারে ব্যাখ্যা করা ভীষণ বিপজ্জনক হতে পারে।
আমি আপনাকে চিনেছি, সত্যির ভাই, বলল কালুলু।
তোমার আত্মার নাম প্রকাশ করো, চ্যালেঞ্জ করল তাইতা। ধীরে ধীরে আগুনের উপর একটা ওত পাতা আফ্রিকান খরগোশের রেখা ফুটে উঠল। পৌরাণিক বিজ্ঞ ব্যক্তির চেহারা। কালুলু, খরগোশ, যার মাথা আর দীর্ঘ কান পূর্ণিমার পূর্ণ গোলকে আঁকা থাকে।
তোমাকে চিনতে পেরেছি, ডানদিকের পথের ভাই। তোমার সাহায্যের জন্যে তোমাকে আহবান করেছি, বলল তাইতা।
আপনি কোথায় জানি আমি, আমিও কাছেই আছি। তিনদিনের মধ্যে আপনার কাছে আসছি আমি, জবাব দিল কালুলু।
*
ইথারে কাউকে আহবান জানানোর এই কৌশলে বিমোহিত হলো ফেন। ওহ, হতাইতা, স্বপ্নেও কোনওদিন ভাবিনি এমনটা সম্ভব হতে পারে। দয়া করে আমাকে শিখিয়ে দাও।
সবার আগে নিজের আত্মার নাম শিখতে হবে তোমাকে।
মনে হয় আমি জানি, জবাব দিল ও। একবার ওই নামে আমাকে ডেকেছিলে তুমি, তাই না? নাকি সেটা স্বপ্ন ছিল, তাইতা?
অনেক সময়ই স্বপ্ন আর বাস্তব মিলে মিশে যায়, ফেন। কোন নামটা মনে করতে পার তুমি?
জলের সন্তান, পরিষ্কার কণ্ঠে জবাব দিল সে। লস্ত্রিস।
সবিস্ময়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইল তাইতা। অজান্তেই নিজের মনস্তাত্ত্বিক শক্তির পরিচয় দিচ্ছে ও, আগের মতোই কদাচিত। অন্য জীবনে ফিরে যেতে পেরেছে ও। উত্তেজনা ও খুশি ওর শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুততর করে তুলল। তোমার আত্মার নামের প্রতীক কী জানো, ফেন?
না। কখনও দেখিনি, ফিসফিস করে বলল ফেন। নাকি দেখেছি, তাইতা?
ভেবে দেখ, বলল তাইতা। তোমার মনের সামনের কাতারে নিয়ে এসো তাকে। চোখ বন্ধ করে সহজাত প্রবৃত্তির বশেই গলায় ঝোলানো মাদুলির দিকে হাত বাড়াল ও। আছে নামটা তোমার মনের ভেতর? আস্তে করে জানতে চাইল তাইতা।
আছে, ফিসফিস করে বলল ফেন। অন্তর্চক্ষু খুলল তাইতা। চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বল ওর আভা, আপাদমস্তক ঢেকে রেখেছে ওকে, মাথার উপর ঝুলছে সেই একই স্বর্গীয় আগুনে খোদাই করা ওর আত্মার প্রতীক।
জলজ ফুল, শাপলা আকৃতি, ভাবল তাইতা। পূর্ণাঙ্গ। পূর্ণ বয়স্ক হয়ে উঠেছে–ও। ওর আত্মার প্রতাঁকের মতোই। এমনকি ছোটবেলাতেই প্রথম জলের পণ্ডিত হয়ে উঠেছিল ও। মুখে ফেনকে ও বলল, ফেন, তোমার মন ও আত্মা সম্পূর্ণ তৈরি। সব কিছু শেখার জন্যে তুমি প্রস্তুত। তোমাকে শিক্ষা দিতে পারব আমি, হয়তো তার চেয়ে বেশি কিছু।
তাহলে ইথারে আহ্বান পাঠানো শেখাও আমাকে। অনেক দূরে থাকলেও যাতে তোমার কাছে পৌঁছুতে পারি তার কৌশল শেখাও।
এখুনি শুরু করছি আমরা, বলল তাইতা। তোমার একটা কিছু এরই মধ্যে পেয়ে গেছি।
কী সেটা? কোথায়? আগ্রহের সাথে জানতে চাইল ফেন। জবাবে গলায় ঝোলানো মাদুলিটা স্পর্শ করল তাইতা। আমাকে দেখাও, বলে উঠল ফেন। লকেট খুলে ভেতরের চুলের গোছা দেখাল তাই।
চুল, বলল ফেন। কিন্তু, আমার না। তর্জনী দিয়ে স্পর্শ করল সে। বয়স্কা মহিলার চুল এটা। দেখতে পাচ্ছ? সোনালির চুলের সাথে ধূসর চুল মিশে আছে।
তোমার মাথা থেকে কেটে নেওয়ার সময় বয়স হয়েছিল তোমার, মেনে নিল তাইতা। ততক্ষণে মরে গিয়েছিলে তুমি। মলমের টেবিলে নিথর শীতল পড়েছিলে।
